নিউইয়র্ক ০৯:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবন ঘেঁষে ২৪ রিসোর্ট ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ

  • আপডেটের সময় : ০১:০৪:৪৯ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ১ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

সুন্দরবন ঘেঁষে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় নির্মিত ২৪টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় রিসোর্ট পরিচালনার অনুমতি না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কোনো রিসোর্ট পরিচালনা করা যায় না। আইন অনুযায়ী রিসোর্টগুলোর কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় তাদের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বন্ধের নির্দেশ পাওয়া রিসোর্টগুলোর মধ্যে খুলনায় ১৮টি, বাগেরহাটে দুটি এবং সাতক্ষীরায় চারটি রয়েছে।

পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন ঘেঁষে রিসোর্ট নির্মাণ এবং পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় বনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর বলেও মনে করছেন তারা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন সেন্টমার্টিনের চেয়েও বেশি স্পর্শকাতর ও জটিল বাস্তুসংস্থানের অধিকারী। বনঘেঁষে একের পর এক রিসোর্ট এবং পর্যটকদের অতিরিক্ত আনাগোনা ও শব্দে বনের বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বন্যপ্রাণীরা ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারে।

রিসোর্টের বর্জ্যও সুন্দরবনের জন্য উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য খালের মাধ্যমে বনের ভেতরে প্রবেশ করে পরিবেশের ক্ষতি করছে বলেও জানান তিনি।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, রিসোর্টগুলোর কারণে বনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। অনেক পর্যটক অনুমতি ছাড়াই বনে প্রবেশ করেন। অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং ফেলে যাওয়া বর্জ্যও বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।

তবে রিসোর্টগুলো সুন্দরবনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় বন বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত বলেও জানান তিনি। তার মতে, এগুলো নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয় রিসোর্ট মালিকদের সংগঠন ‘রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া হোসাইন শাওন বলেন, এসব রিসোর্ট সুন্দরবনের ভেতরে নয়, বনের বাইরে সংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় নির্মিত হয়েছে।

তিনি বলেন, রিসোর্টে আসা পর্যটকেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেন না। স্থানীয় জনপদে অবস্থান করে তারা মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন এবং দূর থেকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করেন। স্থানীয় বসতবাড়ি ও জনপদকে কেন্দ্র করেই তাদের উদ্যোগে কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে।

জাকারিয়া হোসাইন শাওনের দাবি, এসব উদ্যোগকে সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাবিবর্জিত ও একপাক্ষিক। এ খাতের জন্য সুস্পষ্ট, সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত সরকারি নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করেই এ খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবন ঘিরে পর্যটন ব্যবসার প্রসার প্রয়োজন হলেও তা বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

সুন্দরবনের ওপর রিসোর্ট নির্মাণের আগে ও পরে এর প্রভাব নিরূপণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রভাবের ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ খাত সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলামও রিসোর্টগুলোর নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি ইতিবাচক দিক রয়েছে বলে মনে করেন। তার মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামগুলোর অর্থনীতিও বড় হচ্ছে।

সুন্দরবন ঘেঁষা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে রিসোর্ট নির্মাণ শুরু হয় ২০০৯ সালে। ওই বছর বনজীবী, বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের থাকার জন্য সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে ‘টাইগার পয়েন্ট’ নামে একটি রিসোর্ট নির্মাণ করে এনজিও সুশীলন। এরপর বিভিন্ন সময়ে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় আরও বাণিজ্যিক রিসোর্ট গড়ে ওঠে।

সুন্দরবনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশের মধ্যে সমন্বয় রেখে এসব স্থাপনার জন্য কার্যকর ও সমন্বিত নীতিমালা কতটা জরুরি, পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

জোহরান মামদানি মেয়র হওয়ার বছরেই বিশ্বের এক নম্বর শহর নিউইয়র্ক

একইসঙ্গে পুতিনকে সমর্থন ও ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার

০৭ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

সুন্দরবন ঘেঁষে ২৪ রিসোর্ট ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ

আপডেটের সময় : ০১:০৪:৪৯ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

সুন্দরবন ঘেঁষে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় নির্মিত ২৪টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় রিসোর্ট পরিচালনার অনুমতি না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কোনো রিসোর্ট পরিচালনা করা যায় না। আইন অনুযায়ী রিসোর্টগুলোর কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় তাদের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বন্ধের নির্দেশ পাওয়া রিসোর্টগুলোর মধ্যে খুলনায় ১৮টি, বাগেরহাটে দুটি এবং সাতক্ষীরায় চারটি রয়েছে।

পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন ঘেঁষে রিসোর্ট নির্মাণ এবং পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় বনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর বলেও মনে করছেন তারা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন সেন্টমার্টিনের চেয়েও বেশি স্পর্শকাতর ও জটিল বাস্তুসংস্থানের অধিকারী। বনঘেঁষে একের পর এক রিসোর্ট এবং পর্যটকদের অতিরিক্ত আনাগোনা ও শব্দে বনের বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বন্যপ্রাণীরা ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারে।

রিসোর্টের বর্জ্যও সুন্দরবনের জন্য উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য খালের মাধ্যমে বনের ভেতরে প্রবেশ করে পরিবেশের ক্ষতি করছে বলেও জানান তিনি।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, রিসোর্টগুলোর কারণে বনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। অনেক পর্যটক অনুমতি ছাড়াই বনে প্রবেশ করেন। অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং ফেলে যাওয়া বর্জ্যও বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।

তবে রিসোর্টগুলো সুন্দরবনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় বন বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত বলেও জানান তিনি। তার মতে, এগুলো নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয় রিসোর্ট মালিকদের সংগঠন ‘রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া হোসাইন শাওন বলেন, এসব রিসোর্ট সুন্দরবনের ভেতরে নয়, বনের বাইরে সংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় নির্মিত হয়েছে।

তিনি বলেন, রিসোর্টে আসা পর্যটকেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেন না। স্থানীয় জনপদে অবস্থান করে তারা মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন এবং দূর থেকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করেন। স্থানীয় বসতবাড়ি ও জনপদকে কেন্দ্র করেই তাদের উদ্যোগে কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে।

জাকারিয়া হোসাইন শাওনের দাবি, এসব উদ্যোগকে সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাবিবর্জিত ও একপাক্ষিক। এ খাতের জন্য সুস্পষ্ট, সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত সরকারি নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করেই এ খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবন ঘিরে পর্যটন ব্যবসার প্রসার প্রয়োজন হলেও তা বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

সুন্দরবনের ওপর রিসোর্ট নির্মাণের আগে ও পরে এর প্রভাব নিরূপণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রভাবের ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ খাত সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলামও রিসোর্টগুলোর নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি ইতিবাচক দিক রয়েছে বলে মনে করেন। তার মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামগুলোর অর্থনীতিও বড় হচ্ছে।

সুন্দরবন ঘেঁষা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে রিসোর্ট নির্মাণ শুরু হয় ২০০৯ সালে। ওই বছর বনজীবী, বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের থাকার জন্য সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে ‘টাইগার পয়েন্ট’ নামে একটি রিসোর্ট নির্মাণ করে এনজিও সুশীলন। এরপর বিভিন্ন সময়ে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় আরও বাণিজ্যিক রিসোর্ট গড়ে ওঠে।

সুন্দরবনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশের মধ্যে সমন্বয় রেখে এসব স্থাপনার জন্য কার্যকর ও সমন্বিত নীতিমালা কতটা জরুরি, পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

Share this news as a Photo Card