নিউইয়র্ক ০৬:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘যমুনা নদীর পানির ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন, ভারতকে বিদ্যুৎ করিডোরে না বলুন’

  • আপডেটের সময় : ০৭:১২:৩৫ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
  • ৪ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

লোডশেডিং ঠেকাতে সরকার প্রতিটি ধাপেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সারাদেশজুড়ে এই অন্ধকার ও প্রতিনিয়ত লোডশেডিং অপরিহার্যই ছিল। প্রতিটি ধাপেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল এনসিপির আহ্বায়ক ও মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব নাহিদ ইসলাম স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তুলে ধরে বলেছেন, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট পরিকল্পনাহীনতা এবং জ্বালানি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতার ফল। সরকারের পক্ষ থেকে উত্তর এসেছে-হরমুজ প্রণালী, যুদ্ধ এবং এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারের তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, যুদ্ধ শুরু হলো। ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেল ৬০ ডলার থেকে ৮৫-৯০ ডলারে উঠলো। সরকার সঠিক সময়ে মূল্য সমন্বয় করল না, যুক্তি ছিল মূল্যস্ফীতি। কিন্তু পরে ঠিকই মূল্য বাড়ানো হল, ছোট শকের বদলে বড় শক দিল। মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় পাশাপাশি একটি অর্থায়ন পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল, ভর্তুকির বাড়তি চাপ কোথা থেকে আসবে? সেই পরিকল্পনা ছিল না। মার্চেই বিদ্যুৎ বিভাগ বাড়তি ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দেয়। অর্থাৎ আজ যে ‘অর্থের যোগান নেই’ বলা হচ্ছে সেটি বিশ্ববাজারের তৈরি নয়, সরকারের নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি।

সরকারের ভুল জায়গায় ভর্তুকি কাটছাঁট করেছে মন্তব্য করে সংসদ সদস্য বলেন, ভর্তুকির চাপ সামলাতে কাটছাঁট করা হলো ভুল জায়গায়। ক্যাপাসিটি চার্জে নয়। আইপিপির ফিক্সড পেমেন্টে নয়। কাটা হলো সেখানে, যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসে, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র, এবং আমদানিকৃত বিদ্যুৎে। ফল যা হওযার, তাই হলো। বকেয়ার কারণে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারল না। কয়লার সরবরাহ বিপর্যস্ত হলো। আমদানি নামল। এর নাম অর্থ সাশ্রয় নয়। এর নাম অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতা। যারা এক ইউনিটও বিদ্যুৎ দেয় না, তাদের টাকা অক্ষত রইল; আর যারা বিদ্যুৎ দেয়, তাদের টাকা বন্ধ।

সংকট উত্তরণে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুনে দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস বন্ধ হলো। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে কী হবে সেটাই তো পরিকল্পনা। দেখা গেল, কোনো ব্যাকআপ নেই। একই সময়ে ভারত থেকে ডিজেল অর্ধেকে, আদানি থেকে বিদ্যুৎ অর্ধেকে, কয়লাচালিত কেন্দ্রও কম উৎপাদনে।

এখানে একটি প্রশ্ন সরকারকে করতেই হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কয়লা আসে ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে। আদানির বিদ্যুৎ আসে ঝাড়খণ্ড থেকে। ডিজেল আসে নুমালীগড় থেকে। এগুলোর কোনোটি হরমুজ পার হয় না।তাহলে এগুলো কমল কেন? উত্তরটি যুদ্ধে নয়, বকেয়া ও ক্রয়-শিডিউলে, ফুয়েল প্ল্যান না থাকায়, ভুল ভর্তুকিতে। 

সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণেই দেশে সংকট তৈরি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মূল্য সমন্বয়ের আগে পাম্পে তেল মিলছিল না, লম্বা লাইন। দাম বাড়ার পরদিন থেকে লাইন উধাও। সংকট ছিল মজুদজনিত। মজুদদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেননা অধিকাংশই দলীয় লোক। অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের শিডিউল পিছাতে থাকল, এবং ঠিক সেই সময়ে একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর চিঠির পর চার দিনের মধ্যে বেসরকারি আমদানি নীতিমালার খসড়া চাওয়া হলো। বিতরণেও একই ছক, ভুতুড়ে বিলকে প্রশ্রয়, তারপর বেসরকারিকরণের যুক্তি। সংকট সামলানোর বদলে সংকটকে পুঁজি করা হচ্ছে। এখন, সংখ্যা তো মিথ্যা বলে না 
পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং (মেগাওয়াট-ঘণ্টা): এপ্রিল ২০২৬ রেকর্ড ৪১,০০০, জুলাই ২০২৬ রেকর্ড ৩২,০০০ এবং আগস্ট ২০২৬ রেকর্ড ৫৩,০০০ থেকে ৬২,০০০ মেগাওয়াট ঘণ্টা যা দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। ১০ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট, দেশের ইতিহাসে রেকর্ড। গ্রামে দিনে ১০-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই।

যুদ্ধ পরিস্থিতিকে খারাপ করেছে, এটা সত্য উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, কিন্তু যুদ্ধ সংকটটি শুরু করেনি, এবং যুদ্ধই এতটা খারাপ করেনি। করেছে সরকারের অব্যবস্থাপনা। যার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা নেই, তিনিই মন্ত্রণালয় চালান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তিনটি নথি থাকা বাধ্যতামূলক-১। ফুয়েল প্ল্যান, ২। কন্টিঞ্জেন্সি প্ল্যান ও ৩। ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান। ফুয়েল প্ল্যান বলে দেয় কোন মাসে কত পরিমাণ কোন জ্বালানি লাগবে, কোন সময় অর্ডার দিতে হবে, কত ডলার লাগবে। এটি রকেট সায়েন্স নয়, এটি রুটিন প্রশাসন। এই তিনটি নথির একটিও যদি হালনাগাদ থাকত, তবে মান্যবর মন্ত্রীকে বলতে হতো না যে তার ‘করার কিছু নেই’।
সোলার প্রশ্নেও তিনি ব্লান্ডার করেছেন। সোলার হোম প্রধানমন্ত্রীর শূন্য শুল্ক প্রতিশ্রুতি না মেনে সেখানে ১৭% বসিয়েছেন। বড় ও ছোট ব্যবসায় বৈষম্য করেছেন।   

বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের মে পর্যন্ত পুরো সাড়ে চার বছর বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, সেই সাড়ে চার বছর বাংলাদেশের মানুষ লোডশেডিং শব্দটি প্রতিদিন শিখেছে। উৎপাদন বাড়েনি, বিতরণ লাইন বেড়েছে। ২০০৬ সালের মে মাসে তাকে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে কৃষিতে দেওয়া হয়। বিশ বছর পর ঠিক একই মন্ত্রণালয়, এইবার পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে। এবং ছয় মাসেই দেশ ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ে। এটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এটি পারফরম্যান্সের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার যখন এমন অস্থির, তখন এই মন্ত্রণালয়ে দরকার দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক। 

প্রধানমন্ত্রীকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রমাণিতভাবে ব্যর্থ ও অযোগ্য লোক দিয়ে কৌশলগত খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান বলে না’। এটা হচ্ছে ‘আই হ্যাভ নো প্ল্যানের টেস্টিং’। টুকু সাহেব লোডশেডিংয়ের চেয়েও বড় ব্লান্ডার করেছেন।

এই অন্ধকারের মধ্যেই আরেকটি কাজ এগোচ্ছে, যা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতকে বিদ্যুৎ করিডোর দেওয়ার প্ল্যান শুরু করেছেন ১২ আগস্টে।  বিদ্যুৎ বিভাগ পুনরায় ৭৬৫ কেভি কাটিহার–পার্বতীপুর–বরনগর সঞ্চালন লাইন এবং ভারতের সঙ্গে “পাওয়ার কানেক্টিভিটি” নিয়ে সক্রিয় হয়েছে।

এই করিডোরের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে বিদ্যুৎ দেওয়া নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, উদ্দেশ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া। আর সেই বিদ্যুৎ আসবে অরুণাচলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পরিকল্পিত শতাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বাংলাদেশের স্বাদু পানির প্রধান বাহক। গঙ্গায় ফারাক্কা, তিস্তায় গজলডোবা। যমুনার উজানে একই পরিণতি বাংলাদেশ বহন করতে পারবে না। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। ভারত, নেপাল বা ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করেন সমস্যা নাই। ডিজেল, ক্রুড, এলএনজি, এলপিজি আমদানিতেও হ্যাঁ। কিন্তু আমাদের নদীর ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে বিদ্যুৎ করিডোর বাস্তবায়ন চলবে না। এই প্রকল্পের প্রশ্নে হাসিনা সরকারের আমলে যে সমালোচনা হয়েছিল, তা কোনো দলীয় বিরোধিতা ছিল না। ছিল নদী ও পানির প্রশ্নে জাতীয় অবস্থান। 

সরকার বদলালে নদীর প্রশ্ন বদলায় না জানিয়ে হাসনাত বলেন, বিএনপি যদি মনে করে জাতীয় সংকটের আড়ালে এই সিদ্ধান্ত নিরবে এগিয়ে নেওয়া যাবে, ভুল ভাবছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালনি সংকট সব সেক্টরকে প্রভাবিত করে। গত ২ সপ্তাহ ধরে বরগুনা ও কক্সবাজারের জেলে পল্লীর মাছ ধরা ট্রলার গুলা সাগরে যেতে পারছে না, অধিকাংশ বরফকল বন্ধ। বিদ্যুৎ থাকলে কারখানা চলে, সেচ চলে, পরীক্ষার পড়া চলে, হাসপাতালের অপারেশন চলে। এটি সুবিধা নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। বাকওয়াজ না করে, ব্যর্থ মন্ত্রী না পুষে, এনসিপি’র দেওয়া সমাধান প্রস্তাবনা মেনে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করুন। 

সবশেষ তিনি বলেন, যমুনা নদীর পানির ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন। ভারতকে বিদ্যুৎ করিডোরে না বলুন।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: রণধীর জয়সোয়াল

অলাভজনক সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করবে ইন্দোনেশিয়া

১৫ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

‘যমুনা নদীর পানির ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন, ভারতকে বিদ্যুৎ করিডোরে না বলুন’

আপডেটের সময় : ০৭:১২:৩৫ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

লোডশেডিং ঠেকাতে সরকার প্রতিটি ধাপেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সারাদেশজুড়ে এই অন্ধকার ও প্রতিনিয়ত লোডশেডিং অপরিহার্যই ছিল। প্রতিটি ধাপেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল এনসিপির আহ্বায়ক ও মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব নাহিদ ইসলাম স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তুলে ধরে বলেছেন, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট পরিকল্পনাহীনতা এবং জ্বালানি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতার ফল। সরকারের পক্ষ থেকে উত্তর এসেছে-হরমুজ প্রণালী, যুদ্ধ এবং এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারের তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, যুদ্ধ শুরু হলো। ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেল ৬০ ডলার থেকে ৮৫-৯০ ডলারে উঠলো। সরকার সঠিক সময়ে মূল্য সমন্বয় করল না, যুক্তি ছিল মূল্যস্ফীতি। কিন্তু পরে ঠিকই মূল্য বাড়ানো হল, ছোট শকের বদলে বড় শক দিল। মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় পাশাপাশি একটি অর্থায়ন পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল, ভর্তুকির বাড়তি চাপ কোথা থেকে আসবে? সেই পরিকল্পনা ছিল না। মার্চেই বিদ্যুৎ বিভাগ বাড়তি ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দেয়। অর্থাৎ আজ যে ‘অর্থের যোগান নেই’ বলা হচ্ছে সেটি বিশ্ববাজারের তৈরি নয়, সরকারের নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি।

সরকারের ভুল জায়গায় ভর্তুকি কাটছাঁট করেছে মন্তব্য করে সংসদ সদস্য বলেন, ভর্তুকির চাপ সামলাতে কাটছাঁট করা হলো ভুল জায়গায়। ক্যাপাসিটি চার্জে নয়। আইপিপির ফিক্সড পেমেন্টে নয়। কাটা হলো সেখানে, যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসে, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র, এবং আমদানিকৃত বিদ্যুৎে। ফল যা হওযার, তাই হলো। বকেয়ার কারণে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারল না। কয়লার সরবরাহ বিপর্যস্ত হলো। আমদানি নামল। এর নাম অর্থ সাশ্রয় নয়। এর নাম অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতা। যারা এক ইউনিটও বিদ্যুৎ দেয় না, তাদের টাকা অক্ষত রইল; আর যারা বিদ্যুৎ দেয়, তাদের টাকা বন্ধ।

সংকট উত্তরণে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুনে দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস বন্ধ হলো। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে কী হবে সেটাই তো পরিকল্পনা। দেখা গেল, কোনো ব্যাকআপ নেই। একই সময়ে ভারত থেকে ডিজেল অর্ধেকে, আদানি থেকে বিদ্যুৎ অর্ধেকে, কয়লাচালিত কেন্দ্রও কম উৎপাদনে।

এখানে একটি প্রশ্ন সরকারকে করতেই হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কয়লা আসে ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে। আদানির বিদ্যুৎ আসে ঝাড়খণ্ড থেকে। ডিজেল আসে নুমালীগড় থেকে। এগুলোর কোনোটি হরমুজ পার হয় না।তাহলে এগুলো কমল কেন? উত্তরটি যুদ্ধে নয়, বকেয়া ও ক্রয়-শিডিউলে, ফুয়েল প্ল্যান না থাকায়, ভুল ভর্তুকিতে। 

সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণেই দেশে সংকট তৈরি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মূল্য সমন্বয়ের আগে পাম্পে তেল মিলছিল না, লম্বা লাইন। দাম বাড়ার পরদিন থেকে লাইন উধাও। সংকট ছিল মজুদজনিত। মজুদদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেননা অধিকাংশই দলীয় লোক। অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের শিডিউল পিছাতে থাকল, এবং ঠিক সেই সময়ে একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর চিঠির পর চার দিনের মধ্যে বেসরকারি আমদানি নীতিমালার খসড়া চাওয়া হলো। বিতরণেও একই ছক, ভুতুড়ে বিলকে প্রশ্রয়, তারপর বেসরকারিকরণের যুক্তি। সংকট সামলানোর বদলে সংকটকে পুঁজি করা হচ্ছে। এখন, সংখ্যা তো মিথ্যা বলে না 
পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং (মেগাওয়াট-ঘণ্টা): এপ্রিল ২০২৬ রেকর্ড ৪১,০০০, জুলাই ২০২৬ রেকর্ড ৩২,০০০ এবং আগস্ট ২০২৬ রেকর্ড ৫৩,০০০ থেকে ৬২,০০০ মেগাওয়াট ঘণ্টা যা দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। ১০ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট, দেশের ইতিহাসে রেকর্ড। গ্রামে দিনে ১০-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই।

যুদ্ধ পরিস্থিতিকে খারাপ করেছে, এটা সত্য উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, কিন্তু যুদ্ধ সংকটটি শুরু করেনি, এবং যুদ্ধই এতটা খারাপ করেনি। করেছে সরকারের অব্যবস্থাপনা। যার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা নেই, তিনিই মন্ত্রণালয় চালান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তিনটি নথি থাকা বাধ্যতামূলক-১। ফুয়েল প্ল্যান, ২। কন্টিঞ্জেন্সি প্ল্যান ও ৩। ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান। ফুয়েল প্ল্যান বলে দেয় কোন মাসে কত পরিমাণ কোন জ্বালানি লাগবে, কোন সময় অর্ডার দিতে হবে, কত ডলার লাগবে। এটি রকেট সায়েন্স নয়, এটি রুটিন প্রশাসন। এই তিনটি নথির একটিও যদি হালনাগাদ থাকত, তবে মান্যবর মন্ত্রীকে বলতে হতো না যে তার ‘করার কিছু নেই’।
সোলার প্রশ্নেও তিনি ব্লান্ডার করেছেন। সোলার হোম প্রধানমন্ত্রীর শূন্য শুল্ক প্রতিশ্রুতি না মেনে সেখানে ১৭% বসিয়েছেন। বড় ও ছোট ব্যবসায় বৈষম্য করেছেন।   

বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের মে পর্যন্ত পুরো সাড়ে চার বছর বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, সেই সাড়ে চার বছর বাংলাদেশের মানুষ লোডশেডিং শব্দটি প্রতিদিন শিখেছে। উৎপাদন বাড়েনি, বিতরণ লাইন বেড়েছে। ২০০৬ সালের মে মাসে তাকে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে কৃষিতে দেওয়া হয়। বিশ বছর পর ঠিক একই মন্ত্রণালয়, এইবার পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে। এবং ছয় মাসেই দেশ ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ে। এটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এটি পারফরম্যান্সের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার যখন এমন অস্থির, তখন এই মন্ত্রণালয়ে দরকার দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক। 

প্রধানমন্ত্রীকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রমাণিতভাবে ব্যর্থ ও অযোগ্য লোক দিয়ে কৌশলগত খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান বলে না’। এটা হচ্ছে ‘আই হ্যাভ নো প্ল্যানের টেস্টিং’। টুকু সাহেব লোডশেডিংয়ের চেয়েও বড় ব্লান্ডার করেছেন।

এই অন্ধকারের মধ্যেই আরেকটি কাজ এগোচ্ছে, যা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতকে বিদ্যুৎ করিডোর দেওয়ার প্ল্যান শুরু করেছেন ১২ আগস্টে।  বিদ্যুৎ বিভাগ পুনরায় ৭৬৫ কেভি কাটিহার–পার্বতীপুর–বরনগর সঞ্চালন লাইন এবং ভারতের সঙ্গে “পাওয়ার কানেক্টিভিটি” নিয়ে সক্রিয় হয়েছে।

এই করিডোরের উদ্দেশ্য বাংলাদেশে বিদ্যুৎ দেওয়া নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, উদ্দেশ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া। আর সেই বিদ্যুৎ আসবে অরুণাচলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পরিকল্পিত শতাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বাংলাদেশের স্বাদু পানির প্রধান বাহক। গঙ্গায় ফারাক্কা, তিস্তায় গজলডোবা। যমুনার উজানে একই পরিণতি বাংলাদেশ বহন করতে পারবে না। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। ভারত, নেপাল বা ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করেন সমস্যা নাই। ডিজেল, ক্রুড, এলএনজি, এলপিজি আমদানিতেও হ্যাঁ। কিন্তু আমাদের নদীর ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে বিদ্যুৎ করিডোর বাস্তবায়ন চলবে না। এই প্রকল্পের প্রশ্নে হাসিনা সরকারের আমলে যে সমালোচনা হয়েছিল, তা কোনো দলীয় বিরোধিতা ছিল না। ছিল নদী ও পানির প্রশ্নে জাতীয় অবস্থান। 

সরকার বদলালে নদীর প্রশ্ন বদলায় না জানিয়ে হাসনাত বলেন, বিএনপি যদি মনে করে জাতীয় সংকটের আড়ালে এই সিদ্ধান্ত নিরবে এগিয়ে নেওয়া যাবে, ভুল ভাবছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালনি সংকট সব সেক্টরকে প্রভাবিত করে। গত ২ সপ্তাহ ধরে বরগুনা ও কক্সবাজারের জেলে পল্লীর মাছ ধরা ট্রলার গুলা সাগরে যেতে পারছে না, অধিকাংশ বরফকল বন্ধ। বিদ্যুৎ থাকলে কারখানা চলে, সেচ চলে, পরীক্ষার পড়া চলে, হাসপাতালের অপারেশন চলে। এটি সুবিধা নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। বাকওয়াজ না করে, ব্যর্থ মন্ত্রী না পুষে, এনসিপি’র দেওয়া সমাধান প্রস্তাবনা মেনে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করুন। 

সবশেষ তিনি বলেন, যমুনা নদীর পানির ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন। ভারতকে বিদ্যুৎ করিডোরে না বলুন।

Share this news as a Photo Card