তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের অনবরত ইসরায়েল-বিরোধী বিবৃতির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সরাসরি ‘নালিশ’ জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে আঙ্কারার বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে ব্যবহার হতে পারে— এমন কোনো উন্নত সামরিক প্রযুক্তি বা আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র তুরস্কের কাছে বিক্রি না করার জন্য তিনি মার্কিন প্রশাসনকে অনুরোধ করেছেন।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সূত্র ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে শুক্রবার (৩ জুলাই) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক জরুরি ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজের এই গভীর উদ্বেগের কথা জানান। চলতি সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পের আঙ্কারা সফরের কথা রয়েছে, যেখানে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে তার একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিগত দুই বছর ধরে গাজা উপত্যকা এবং ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের জেরে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গেই ব্যক্তিগতভাবে একটি সুদৃঢ় ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখে চলছেন, কারণ ন্যাটোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুরস্ক ওয়াশিংটনের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক পরিস্থিতির কারণে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহলে নেতানিয়াহুর আগের সেই একচ্ছত্র প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই যুদ্ধ মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক জোটের মধ্যেও নানা মতভেদের জন্ম দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের চমৎকার ব্যক্তিগত সখ্য এবং তুরস্কে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিশাল আর্থিক মুনাফার বিষয়টিকে সরিয়ে ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহু কতটা প্রভাব খাটাতে পারবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে সংশয় রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট সোমবার ন্যাটো নেতাদের সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কে যাচ্ছেন, যেখানে তুর্কি বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানের জন্য প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ চুক্তি এবং দেশটিকে পুনরায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার এজেন্ডা রয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে ওয়াশিংটন তুরস্ককে এই সংবেদনশীল এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কার করেছিল।
আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আঙ্কারার হাতে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে পুনরায় তাদের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ বিক্রি করা সম্ভব, তা মার্কিন পেন্টাগন বর্তমানে খতিয়ে দেখছে। তিনি জানান যে মার্কিন আইন মেনে এই ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হয়েছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে প্রতিরক্ষা দপ্তরকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আমেরিকার এই সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্তটি তুর্কি সরকারের ক্রমাগত ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান জায়নবাদকে ‘গণহত্যার মতাদর্শ’ বলে অভিহিত করে দাবি করেছিলেন যে এটি তুরস্কের জাতীয় অস্তিত্বের জন্যও এক বড় হুমকি। এর পরপরই তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ইসরায়েল সরকারকে ‘মানবজাতির জন্য অসহনীয় বোঝা’ আখ্যা দিয়ে দেশটির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জোর দাবি জানান।
শুক্রবারের ফোনালাপে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেছেন যাতে তিনি এরদোয়ানকে কিছুটা ‘সংযম’ প্রদর্শনের বার্তা দেন। এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে নেতানিয়াহুর দাবিটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং তিনি হয়তো তুর্কি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করে তাকে কিছুটা সংযত হতে বলতে পারেন। তবে এই স্পর্শকাতর ফোনালাপের বিষয়ে হোয়াইট হাউস কিংবা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অফিশিয়াল কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সংঘাতের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের নেওয়া কিছু স্বাধীন কূটনৈতিক উদ্যোগের কারণে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও এক ধরনের অদৃশ্য টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অতীতে যেসব ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তার বেশিরভাগই বাস্তবে মেলেনি। তবে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে চলতি মাসের শেষের দিকে নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউস সফরে যাওয়ার একটি সূচি নির্ধারিত রয়েছে।
এদিকে গতকাল সোমবার মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও এরদোয়ানের তীব্র সমালোচনা করেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ করেন যে তুরস্কের শীর্ষ নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্যের ‘খারাপ পক্ষকে’ সব ধরনের মদদ যোগাচ্ছে।
নেতানিয়াহু তার সাক্ষাৎকারে সরাসরি বলেন, ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো আমেরিকা-বিরোধী চরমপন্থী আদর্শে প্রভাবিত একটি সরকারকে কোনোভাবেই এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বা উন্নত ইঞ্জিন দেওয়া উচিত হবে না। এতে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হবে, যা বর্তমানে ইসরায়েলের আকাশসামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং আমেরিকার কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে সুসংহত রয়েছে’।
সূত্র: অ্যাক্সিওস


















