নিউইয়র্ক ০৯:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্দিনেও শতবর্ষের নৌকা তৈরির পেশা আঁকড়ে চাপাতলীর কারিগররা

  • আপডেটের সময় : ০২:১৫:৫০ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ০ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা এলেই পাল্টে যায় কুমিল্লার দাউদকান্দির চাপাতলী গ্রামের দৃশ্যপট। রাতভর শোনা যায় হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ। গ্রামের বাড়ির উঠানে উঠানে চলে নৌকা তৈরির কাজ। বছরের তিন মাস—আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র—চাপাতলী যেন হয়ে ওঠে অন্য রকম এক জনপদ। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই গ্রামে। কেউ আসেন তৈরি নৌকা কিনতে, কেউ দেন নৌকা তৈরির অর্ডার। আবার কেউ আসেন ‘নৌকার গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত চাপাতলীর ঐতিহ্য দেখতে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মালিগাঁও ইউনিয়নের একটি গ্রাম চাপাতলী। এই গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবার বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত। এ কারণে স্থানীয়ভাবে গ্রামটি ‘নৌকার গ্রাম চাপাতলী’ নামে পরিচিত।

বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে শুরু হয় নৌকা তৈরির কর্মযজ্ঞ। বাড়ির উঠানে রাত পর্যন্ত চলে কাজ। পুরুষরা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন, আর নারীরা রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন। এখানে কোষা নৌকা, ডিঙি, পাতাতোলা কোষা, দুথপা নৌকা ও দিগাইল্যা কোষাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা তৈরি করা হয়। এসব নৌকা আশপাশের হাটবাজারে বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি প্লাবনভূমির মাছের খামারেও এসব নৌকা ব্যবহার করা হয়।

তবে আধুনিকতার ছোঁয়া ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি বাজারে ফাইবারের নৌকা আসায় কাঠের নৌকার চাহিদা কমেছে। অন্যদিকে নৌকা তৈরির উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন পূর্বপুরুষের পেশা।

একসময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল নৌকা তৈরি। কিন্তু বর্তমানে কাঠের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, আর্থিক সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে সংকটে পড়েছে শতবর্ষী এই শিল্প।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে চাপাতলী গ্রামের বলাই চন্দ্র সরকার নামে এক ব্যক্তি নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেন। তাঁর কাছ থেকে কাজ শিখে গ্রামের অন্যরাও ধীরে ধীরে এ পেশায় যুক্ত হন।

চাপাতলী গ্রামের প্রায় ২৫০ পরিবারের মধ্যে একসময় শতাধিক পরিবার বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রায় এক শতাব্দী ধরে তারা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন। বর্তমানে গ্রামে ১৮টি পরিবার নৌকা তৈরির কাজ করছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নিতাই সরকার, হরেন সরকার, রনজিত, সুকুমার, অভিনাস, রাজেন্দ্র, সুরেশ, নরেশ, দিলেশ, স্বপন, নিখিল, সনিল, শৈকেন, কৃষ্ণ, মানিক, আশু ও স্বপনসহ অন্যরা।

এ পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগররা নৌকা তৈরির পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে গিয়ে কাঠের ঘর, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন ধরনের কাঠের আসবাবপত্রও তৈরি করেন।

চাপাতলী গ্রামের মানিক বলেন, ‘আগে একটি মাঝারি আকারের নৌকা ২০ হাজার টাকায় তৈরি করা যেত। এখন শুধু কাঠ ও লোহার দামেই এর দ্বিগুণ খরচ হয়। সেগুন, গামারি, কড়ইসহ বিভিন্ন কাঠও আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমে এ গ্রামে প্রায় তিন থেকে চারটি নৌকা তৈরি করা হতো, যা উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা হয়। তবে মৌসুম ছাড়াও সারা বছরই এ গ্রামে নৌকা তৈরির কাজ চলে।’

চাপাতলী গ্রামের অমূল্য চন্দ্র সূত্রধর জানান, ১০-১২ বছর আগেও গ্রামের শতাধিক পরিবার নৌকা তৈরির পেশায় জড়িত ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ১০ থেকে ১২টি পরিবারে দাঁড়িয়েছে। বাকিরা অন্য পেশায় চলে গেছেন।

গ্রামের আশু মিস্ত্রি বলেন, ‘একটা সময় বছরের অর্ধেক সময় নৌকা তৈরির কাজ চলত। এখন মাসের পর মাস বসে থাকতে হয়। তৈরি করা নৌকা অনেক কষ্ট করে অন্য হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হয়। এতে আমাদের লাভের পরিমাণ কমে যায়।’

নৌকা তৈরির মিস্ত্রি চন্দন সরকার বলেন, ‘শত বছর আগে থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা নৌকা বানাতেন। মৌসুম এলেই পুরো গ্রামের উঠানগুলো নতুন নতুন নৌকার ঝলকে মুখরিত হয়ে উঠত। এখন আর সেই রূপ নেই।’সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ পেশায়ও পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন পূর্বপুরুষের পেশা। কেউ কেউ এখনো ঐতিহ্যটি আঁকড়ে ধরে আছেন। কয়েক বছর আগেও নৌকার চাহিদা ছিল বেশ ভালো। কিন্তু এখন সেই চাহিদা নেই। দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকতার কারণে নৌকার ব্যবহার কমেছে। পাশাপাশি কাঠসহ নৌকা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। সব মিলিয়ে চাপাতলী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরির পেশা এখন টিকে থাকার সংগ্রামে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

জোহরান মামদানি মেয়র হওয়ার বছরেই বিশ্বের এক নম্বর শহর নিউইয়র্ক

একইসঙ্গে পুতিনকে সমর্থন ও ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার

০৭ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

দুর্দিনেও শতবর্ষের নৌকা তৈরির পেশা আঁকড়ে চাপাতলীর কারিগররা

আপডেটের সময় : ০২:১৫:৫০ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

বর্ষা এলেই পাল্টে যায় কুমিল্লার দাউদকান্দির চাপাতলী গ্রামের দৃশ্যপট। রাতভর শোনা যায় হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ। গ্রামের বাড়ির উঠানে উঠানে চলে নৌকা তৈরির কাজ। বছরের তিন মাস—আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র—চাপাতলী যেন হয়ে ওঠে অন্য রকম এক জনপদ। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই গ্রামে। কেউ আসেন তৈরি নৌকা কিনতে, কেউ দেন নৌকা তৈরির অর্ডার। আবার কেউ আসেন ‘নৌকার গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত চাপাতলীর ঐতিহ্য দেখতে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মালিগাঁও ইউনিয়নের একটি গ্রাম চাপাতলী। এই গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবার বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত। এ কারণে স্থানীয়ভাবে গ্রামটি ‘নৌকার গ্রাম চাপাতলী’ নামে পরিচিত।

বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে শুরু হয় নৌকা তৈরির কর্মযজ্ঞ। বাড়ির উঠানে রাত পর্যন্ত চলে কাজ। পুরুষরা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন, আর নারীরা রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন। এখানে কোষা নৌকা, ডিঙি, পাতাতোলা কোষা, দুথপা নৌকা ও দিগাইল্যা কোষাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা তৈরি করা হয়। এসব নৌকা আশপাশের হাটবাজারে বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি প্লাবনভূমির মাছের খামারেও এসব নৌকা ব্যবহার করা হয়।

তবে আধুনিকতার ছোঁয়া ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি বাজারে ফাইবারের নৌকা আসায় কাঠের নৌকার চাহিদা কমেছে। অন্যদিকে নৌকা তৈরির উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন পূর্বপুরুষের পেশা।

একসময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল নৌকা তৈরি। কিন্তু বর্তমানে কাঠের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, আর্থিক সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে সংকটে পড়েছে শতবর্ষী এই শিল্প।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে চাপাতলী গ্রামের বলাই চন্দ্র সরকার নামে এক ব্যক্তি নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেন। তাঁর কাছ থেকে কাজ শিখে গ্রামের অন্যরাও ধীরে ধীরে এ পেশায় যুক্ত হন।

চাপাতলী গ্রামের প্রায় ২৫০ পরিবারের মধ্যে একসময় শতাধিক পরিবার বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রায় এক শতাব্দী ধরে তারা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন। বর্তমানে গ্রামে ১৮টি পরিবার নৌকা তৈরির কাজ করছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নিতাই সরকার, হরেন সরকার, রনজিত, সুকুমার, অভিনাস, রাজেন্দ্র, সুরেশ, নরেশ, দিলেশ, স্বপন, নিখিল, সনিল, শৈকেন, কৃষ্ণ, মানিক, আশু ও স্বপনসহ অন্যরা।

এ পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগররা নৌকা তৈরির পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে গিয়ে কাঠের ঘর, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন ধরনের কাঠের আসবাবপত্রও তৈরি করেন।

চাপাতলী গ্রামের মানিক বলেন, ‘আগে একটি মাঝারি আকারের নৌকা ২০ হাজার টাকায় তৈরি করা যেত। এখন শুধু কাঠ ও লোহার দামেই এর দ্বিগুণ খরচ হয়। সেগুন, গামারি, কড়ইসহ বিভিন্ন কাঠও আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমে এ গ্রামে প্রায় তিন থেকে চারটি নৌকা তৈরি করা হতো, যা উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা হয়। তবে মৌসুম ছাড়াও সারা বছরই এ গ্রামে নৌকা তৈরির কাজ চলে।’

চাপাতলী গ্রামের অমূল্য চন্দ্র সূত্রধর জানান, ১০-১২ বছর আগেও গ্রামের শতাধিক পরিবার নৌকা তৈরির পেশায় জড়িত ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ১০ থেকে ১২টি পরিবারে দাঁড়িয়েছে। বাকিরা অন্য পেশায় চলে গেছেন।

গ্রামের আশু মিস্ত্রি বলেন, ‘একটা সময় বছরের অর্ধেক সময় নৌকা তৈরির কাজ চলত। এখন মাসের পর মাস বসে থাকতে হয়। তৈরি করা নৌকা অনেক কষ্ট করে অন্য হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হয়। এতে আমাদের লাভের পরিমাণ কমে যায়।’

নৌকা তৈরির মিস্ত্রি চন্দন সরকার বলেন, ‘শত বছর আগে থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা নৌকা বানাতেন। মৌসুম এলেই পুরো গ্রামের উঠানগুলো নতুন নতুন নৌকার ঝলকে মুখরিত হয়ে উঠত। এখন আর সেই রূপ নেই।’সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ পেশায়ও পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন পূর্বপুরুষের পেশা। কেউ কেউ এখনো ঐতিহ্যটি আঁকড়ে ধরে আছেন। কয়েক বছর আগেও নৌকার চাহিদা ছিল বেশ ভালো। কিন্তু এখন সেই চাহিদা নেই। দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকতার কারণে নৌকার ব্যবহার কমেছে। পাশাপাশি কাঠসহ নৌকা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। সব মিলিয়ে চাপাতলী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরির পেশা এখন টিকে থাকার সংগ্রামে।

Share this news as a Photo Card