বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থার সফল অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে আগামী প্রাদেশিক নির্বাচনে ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং’ (ওসিভি) চালুর পরিকল্পনা করছে নেপাল। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত নেপালি নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ দেশের প্রবাসী নাগরিকদের ভোটের আওতায় আনার এই প্রক্রিয়ায় কারিগরি দিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করতে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে নেপালের নির্বাচন কমিশন।
জানা যায়, আগামী প্রায় দেড় বছর পর নেপালে অনুষ্ঠেয় প্রাদেশিক নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই ব্যাপক গবেষণা ও আগাম প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশে তৈরি এই প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগকে একটি চমৎকার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নেপালের নির্বাচন কমিশনার ড. রাজীব সুব্বা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নেপাল নিজেদের সম্ভাব্য ত্রুটি ও জটিলতা এড়িয়ে চলতে চায়।
ড. রাজীব সুব্বা বলেন, বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের ভোটাধিকার বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু দৃশ্যমান প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বলেও মনে করছে নেপাল নির্বাচন কমিশন। দেশটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য তথা উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বিপুলসংখ্যক নেপালি শ্রমিকের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা বা দক্ষতার ঘাটতি থাকতে পারে। সেই কারণে ভোটার নিবন্ধন, সঠিক পরিচয় যাচাইকরণ এবং নির্দিষ্ট মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারে সাধারণ প্রবাসীদের আগাম নির্বাচনী শিক্ষা ও যথাযথ প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি পোস্টাল ভোটিংয়ের অন্যতম একটি জটিলতা হলো- এক দেশ থেকে অন্য দেশে ডাকযোগে ব্যালট কাগজ পাঠানো এবং তা সময়মতো নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌঁছানো। পুরো ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সাইবার নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকিকেও অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে তাদের আইটি বিভাগ।
তিনি আরও বলেন, নেপাল নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে থাকা নেপালি নাগরিকদের বাইরে রাখলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ ভোটাধিকারপ্রাপ্ত নেপালি অবস্থান করছেন। এই বিশাল প্রবাসীদের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে কঠোর পরিশ্রম করছেন, আর একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বের নানা উন্নত দেশে বসবাস করছেন। এত বিপুল ও বিস্তৃত অঞ্চলের নাগরিকদের একই ব্যবস্থার অধীনে এনে স্বচ্ছ নির্বাচন পরিচালনা করা একটি কঠিন কাজ।
তবে বাংলাদেশের আইটি-সহায়তাপ্রাপ্ত পোস্টাল ভোটিং মডেলটি সরাসরি নেপালে প্রয়োগ করার বিষয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি দেশটি। বর্তমানে এই মডেলের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চলছে এবং বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে দফায় দফায় সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব তথ্য বিশ্লেষণ শেষে নেপালের আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার জন্য কোন বিশেষ পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রক্রিয়াটি সফল করতে বাংলাদেশের কাছ থেকে সরাসরি কারিগরি সাহায্য ও দক্ষতা বিনিময়ের বিষয়টিকেও যথেষ্ট ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নেপালের এই নির্বাচন কমিশনার এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক দল, ক্ষমতাসীন সরকার এবং সাধারণ জনগণের মতামত নিয়েই চূড়ান্ত পথ নকশা তৈরি করা হবে। বাংলাদেশের পথ প্রদর্শক অভিজ্ঞতা নেপালের প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও পরিপক্ব করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের মধ্যে তথ্য ও অভিজ্ঞতার এই আদান-প্রদান আগামী দিনে উভয় দেশের জন্যই প্রবাসীদের ভোটাধিকার সুসংহত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।


























