নিউইয়র্ক ০৭:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

  • আপডেটের সময় : ০২:৩০:০৩ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ৪ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও দেশটির সম্ভাব্য সামরিক হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ঝুঁকি খুব কম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া সরকারের দায়িত্ব।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে কার্নি বলেন, এটি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার বারবার মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।

২০২৫ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলেছিলেন। চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউসও বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কানাডার জনগণের সুরক্ষায় ট্রাম্প অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি করেছেন।

তবে কানাডার সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্য এবং উত্তর আমেরিকার আকাশ ও আর্কটিক অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের (নোরাড) আওতায় দুই দেশ যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্যও বিনিময় করে।

রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে ৩৪ বছর দায়িত্ব পালন করা সাবেক লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, তাঁর পুরো সামরিক জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার ওপর হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হয়নি। তাঁর মতে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে এমন যুদ্ধ অত্যন্ত জটিল ও প্রায় অকল্পনীয়।

তবে কোটসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কখনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিলে তা সরাসরি সামরিক হামলা দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। সাইবার হামলা বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ইতিহাসে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক সবসময় এতটা ঘনিষ্ঠ ছিল না। ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বাহিনী মন্ট্রিয়েল দখল করেছিল এবং কুইবেক সিটি দখলেরও চেষ্টা করেছিল। পরে ১৮১২ সালের যুদ্ধে তৎকালীন কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী হামলা চালায়। ওই যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী পাল্টা আক্রমণে ওয়াশিংটনে গিয়ে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কানাডা সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল। কানাডার সামরিক কর্মকর্তারা তখন পর্যটকের ছদ্মবেশে সীমান্তবর্তী মার্কিন শহরগুলো ঘুরে সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও কানাডা সামরিক প্রস্তুতির ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। একটি সামরিক মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো এক সপ্তাহের মধ্যেই দখলে চলে যেতে পারে। এরপর কানাডীয় বাহিনীকে গেরিলা-ধাঁচের প্রতিরোধে যেতে হতে পারে এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো মিত্রদের সহায়তা চাইতে হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এমন যুদ্ধ সহজ হবে না। কানাডার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের সেনাদের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যেও এমন অভিযানের রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিটের মতে, যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার তেল ও খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত অচল করার দিকে নজর দিতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, কানাডার সেনারা সংখ্যাগত ও সামরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকলেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে লেজার পরিচালিত এক জরিপে ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় জানিয়েছিলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা করছেন।

কানাডার জন্য এমন প্রস্তুতি তাই সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে সামরিক পরিকল্পনার আওতায় আনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

যুক্তরাষ্ট্রে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার, নিখোঁজ ৬

নিউইয়র্ক থেকে ইরানের দুই কূটনীতিককে বহিষ্কার করল যুক্তরাষ্ট্র

০৪ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

আপডেটের সময় : ০২:৩০:০৩ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও দেশটির সম্ভাব্য সামরিক হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ঝুঁকি খুব কম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া সরকারের দায়িত্ব।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে কার্নি বলেন, এটি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার বারবার মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।

২০২৫ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলেছিলেন। চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউসও বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কানাডার জনগণের সুরক্ষায় ট্রাম্প অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি করেছেন।

তবে কানাডার সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্য এবং উত্তর আমেরিকার আকাশ ও আর্কটিক অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের (নোরাড) আওতায় দুই দেশ যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্যও বিনিময় করে।

রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে ৩৪ বছর দায়িত্ব পালন করা সাবেক লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, তাঁর পুরো সামরিক জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার ওপর হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হয়নি। তাঁর মতে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে এমন যুদ্ধ অত্যন্ত জটিল ও প্রায় অকল্পনীয়।

তবে কোটসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কখনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিলে তা সরাসরি সামরিক হামলা দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। সাইবার হামলা বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ইতিহাসে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক সবসময় এতটা ঘনিষ্ঠ ছিল না। ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বাহিনী মন্ট্রিয়েল দখল করেছিল এবং কুইবেক সিটি দখলেরও চেষ্টা করেছিল। পরে ১৮১২ সালের যুদ্ধে তৎকালীন কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী হামলা চালায়। ওই যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী পাল্টা আক্রমণে ওয়াশিংটনে গিয়ে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কানাডা সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল। কানাডার সামরিক কর্মকর্তারা তখন পর্যটকের ছদ্মবেশে সীমান্তবর্তী মার্কিন শহরগুলো ঘুরে সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও কানাডা সামরিক প্রস্তুতির ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। একটি সামরিক মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো এক সপ্তাহের মধ্যেই দখলে চলে যেতে পারে। এরপর কানাডীয় বাহিনীকে গেরিলা-ধাঁচের প্রতিরোধে যেতে হতে পারে এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো মিত্রদের সহায়তা চাইতে হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এমন যুদ্ধ সহজ হবে না। কানাডার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের সেনাদের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যেও এমন অভিযানের রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিটের মতে, যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার তেল ও খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত অচল করার দিকে নজর দিতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, কানাডার সেনারা সংখ্যাগত ও সামরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকলেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে লেজার পরিচালিত এক জরিপে ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় জানিয়েছিলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা করছেন।

কানাডার জন্য এমন প্রস্তুতি তাই সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে সামরিক পরিকল্পনার আওতায় আনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Share this news as a Photo Card