এলপিজি ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানো, সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক হয়রানি ও অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এই দুই দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে পরবর্তী সময়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।
গতকাল সোমবার রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টানা দুই দিন সারা দেশের সব এলপি গ্যাস বিক্রির দোকান বন্ধ থাকবে। দাবি পূরণ না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এমন সময়ে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো, যখন বাজারে সরকার নির্ধারিত বর্ধিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে। গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। তবে বাজারে এই সিলিন্ডার কিনতে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে বলে ক্রেতাদের অভিযোগ। বিভিন্ন জেলা প্রশাসকরাও বেশি দামে এলপিজি বিক্রির তথ্য জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে।
পরিবেশকদের বক্তব্য, কমিশন না বাড়ালে তাদের পক্ষে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
কমিশন বাড়ানোর দাবি :সেলিম খান বলেন, পাঁচ বছর আগে বিইআরসি পরিবেশকদের জন্য সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন খরচ, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানোর খরচ, গুদামভাড়া ও লাইসেন্স ফি বেড়েছে। অলস পড়ে থাকা সিলিন্ডারের কারণেও ব্যবসায়ীদের লোকসান হচ্ছে। এসব খরচ বিবেচনায় সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর কমিশন বাড়ানোর দাবিতে বিইআরসিতে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি। ঐ চিঠিতে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার আনতে ৫০ টাকা খরচ হয়। সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে আরো ৩৫ টাকা লাগে। কর্মচারীর বেতন, গুদামভাড়া, বিদ্যুত্ বিল ও অন্যান্য খরচ বাবদ লাগে ২৫ টাকা। এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা ধরে সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ টাকা কমিশন দাবি করা হয়েছে।
মাসে একাধিকবার দাম পরিবর্তনের অভিযোগ :সমিতির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম একবার নির্ধারণ করে দিলেও কিছু কোম্পানি পাঁচ থেকে সাত দিন পর আবার নিজেদের ইচ্ছামতো দাম পরিবর্তন করে। এতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েন। তাদের দাবি, কোনো কোম্পানি এক মাসে একাধিকবার মূল্য সমন্বয় করতে চাইলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে করতে হবে। কোম্পানির চালানেও প্রকৃত দাম উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি যেসব কোম্পানি পরিবেশকের গুদামে সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না, তাদের ন্যায্য পরিবহনভাড়া দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সরবরাহে সংকট, পড়ে আছে খালি সিলিন্ডার :সাংবাদিক সম্মেলনে এলপিজির সরবরাহসংকট ও ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতার কথাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা। সেলিম খানের দাবি, বর্তমানে ছয় থেকে সাতটি কোম্পানি ছাড়া বেশির ভাগ কোম্পানি গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। অনেক কোম্পানি ঋণপত্র খুলতে না পারায় সারা দেশে কয়েক লাখ সিলিন্ডার অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহে অক্ষম কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডারে সরকারি উদ্যোগে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে পুনরায় গ্যাস ভরে বাজারে সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়। এসব খালি সিলিন্ডার ব্যবহার করে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ব্যবসায়ী নেতারা।
ব্যবসায়ীদের সাত দফা :ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত সাত দফা দাবি হলো—জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি বৃদ্ধি, লোড-আনলোডের খরচ ও অলস সিলিন্ডারের লোকসানসহ বিভিন্ন ব্যয় বিবেচনায় সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণ; কোনো কোম্পানি মাসে একাধিকবার মূল্য সমন্বয় করতে চাইলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে করা; দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহে অক্ষম কোম্পানির সিলিন্ডারে সরকারিভাবে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে পুনরায় গ্যাস ভরার ব্যবস্থা; কোম্পানির চালানে প্রকৃত দাম লেখা; যেসব কোম্পানি পরিবেশকের গুদামে সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না, তাদের ন্যায্য পরিবহনভাড়া দেওয়া; সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও কেবল রেলিংয়ের কারণে সিলিন্ডার বহনকারী পিকআপ বা ট্রাকের বিরুদ্ধে মামলা না দেওয়া; এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘অনৈতিক ও অযৌক্তিক’ জরিমানা আরোপ বন্ধ করা।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার প্রতিবাদে দেশ জুড়ে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা। পরে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক এবং দাবি পূরণের আশ্বাসে ঐ দিন বিকালে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এবার দুই দিনের দোকান বন্ধের ঘোষণা এমন এক পরিস্থিতিতে এলো, যখন দাম ও সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারকদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা সরবরাহসংকট ও বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের কথা বললেও লোয়াব আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি করেছে। এর মধ্যেই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে প্রায় সব গ্রাহককে।


























