নিউইয়র্ক ০২:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল

  • আপডেটের সময় : ০৬:২২:১০ অপরাহ্ণ, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
  • ১৪ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

একসময় বর্ষা এলেই দিগন্তজোড়া জলরাশিতে রূপ নিত চলনবিল। নদ-খালের প্রবাহে প্রাণ ফিরে পেত উত্তরাঞ্চলের এই বিশাল জলাভূমি। নৌকাই ছিল মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। জেলেদের জালে ধরা পড়ত দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ, আর শীতকালে হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত বিলাঞ্চল। সেই চিরচেনা চলনবিল এখন দ্রুত হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক রূপ।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদ-খালের নাব্য হ্রাস, জলাভূমি ভরাট, নির্বিচারে পুকুর খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বৃহত্তম এই জলাভূমি আজ অস্তিত্বের সংকটে। একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের দশটা উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে এ চলনবিল। ১০০০ বর্গ কিলোমিটারের বেশি থাকলেও, বর্তমানে পলিমাটি জমে তা কমে বর্ষাকালে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ বর্গ কিলোমিটারে।

চলনবিলের ৪৭টি ছোট-বড় নদী রয়েছে। তবে পলি জমে ভরাট এবং নাব্য সংকটের কারণে অনেক নদীই তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এসব নদনদী, খালে মাছ শিকারের সঙ্গে ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। চলনবিলের মিঠাপানির বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, দেশি পুঁটি, টেংরা, খলসা, চেলা, বাতাসি, মলা, জিয়ল, দেশি শিং, মাগুর, কই, টাকি, বাইন, কাঁকলা, আইড়, পাবদা খুব জনপ্রিয় ছিল।

অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদনদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় চলনবিল তার গৌরব হারিয়েছে। বিশেষ করে, অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করা। চলনবিলের ভিতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দিনে দিনে কমছে চলনবিলের পরিধি।
—মো. সাজ্জাদ হোসেন, নাটোর বিএডিসি নির্বাহী প্রকৌশলী

নদনদীর পানি বিলে পর্যাপ্ত প্রবেশ না করা, অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের ফলে দিনে দিনে বিলুপ্তির মুখে এসব দেশীয় মাছ। ফলে এ পেশা ছেড়ে অনেক জেলে অন্য পেশায় চলে গেছেন। জেলেদের উৎপাদিত দেশীয় শুঁটকি মাছ রপ্তানি হয় বিদেশেও। এ শুঁটকি তৈরির সঙ্গে হাজারো পরিবার সম্পৃক্ত। বর্ষায় মাছ বিক্রির টাকায় চলত জেলেদের সারা বছরে খোরাক। তবে মাছ কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদনও কমে গেছে।

১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এরপর ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণের ফলে বড় বাঁধা পড়ে চলনবিলের ওপর। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি ব্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে।

চলনবিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানির গতিপথ বন্ধ করে সিংড়া শেরকোল এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় হাইটেক পার্ক এবং আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। ফলে হাজার হাজার বিঘা জমি জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য উঁচু ঢালাই রাস্তা। অন্যদিকে, পুকুর খনন করে পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে বিস্তীর্ণ চলনবিলে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে।

সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ ও উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, পলি জমে নাব্যতা হ্রাস চলনবিলের আয়তন দিনে দিনে কমছে। অন্যদিকে অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে কমছে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। সরকারের উচিত চলনবিলকে রক্ষা করে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা। তা না হলে চলনবিল হারাবে তার ঐতিহ্য।

নাটোর বিএডিসি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের আয়তন কমার মূল কারণই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদনদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় চলনবিল তার গৌরব হারিয়েছে। বিশেষ করে, অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করা। চলনবিলের ভিতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দিনে দিনে কমছে চলনবিলের পরিধি।
 
চলনবিলের ভেতরে অসংখ্য খাল রয়েছে, সেই খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত পলি অপসারণ করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তাহলে এই বিলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল

আপডেটের সময় : ০৬:২২:১০ অপরাহ্ণ, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

একসময় বর্ষা এলেই দিগন্তজোড়া জলরাশিতে রূপ নিত চলনবিল। নদ-খালের প্রবাহে প্রাণ ফিরে পেত উত্তরাঞ্চলের এই বিশাল জলাভূমি। নৌকাই ছিল মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। জেলেদের জালে ধরা পড়ত দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ, আর শীতকালে হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত বিলাঞ্চল। সেই চিরচেনা চলনবিল এখন দ্রুত হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক রূপ।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদ-খালের নাব্য হ্রাস, জলাভূমি ভরাট, নির্বিচারে পুকুর খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বৃহত্তম এই জলাভূমি আজ অস্তিত্বের সংকটে। একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের দশটা উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে এ চলনবিল। ১০০০ বর্গ কিলোমিটারের বেশি থাকলেও, বর্তমানে পলিমাটি জমে তা কমে বর্ষাকালে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ বর্গ কিলোমিটারে।

চলনবিলের ৪৭টি ছোট-বড় নদী রয়েছে। তবে পলি জমে ভরাট এবং নাব্য সংকটের কারণে অনেক নদীই তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এসব নদনদী, খালে মাছ শিকারের সঙ্গে ১ লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। চলনবিলের মিঠাপানির বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, দেশি পুঁটি, টেংরা, খলসা, চেলা, বাতাসি, মলা, জিয়ল, দেশি শিং, মাগুর, কই, টাকি, বাইন, কাঁকলা, আইড়, পাবদা খুব জনপ্রিয় ছিল।

অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদনদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় চলনবিল তার গৌরব হারিয়েছে। বিশেষ করে, অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করা। চলনবিলের ভিতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দিনে দিনে কমছে চলনবিলের পরিধি।
—মো. সাজ্জাদ হোসেন, নাটোর বিএডিসি নির্বাহী প্রকৌশলী

নদনদীর পানি বিলে পর্যাপ্ত প্রবেশ না করা, অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের ফলে দিনে দিনে বিলুপ্তির মুখে এসব দেশীয় মাছ। ফলে এ পেশা ছেড়ে অনেক জেলে অন্য পেশায় চলে গেছেন। জেলেদের উৎপাদিত দেশীয় শুঁটকি মাছ রপ্তানি হয় বিদেশেও। এ শুঁটকি তৈরির সঙ্গে হাজারো পরিবার সম্পৃক্ত। বর্ষায় মাছ বিক্রির টাকায় চলত জেলেদের সারা বছরে খোরাক। তবে মাছ কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদনও কমে গেছে।

১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এরপর ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণের ফলে বড় বাঁধা পড়ে চলনবিলের ওপর। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি ব্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে।

চলনবিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানির গতিপথ বন্ধ করে সিংড়া শেরকোল এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় হাইটেক পার্ক এবং আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। ফলে হাজার হাজার বিঘা জমি জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য উঁচু ঢালাই রাস্তা। অন্যদিকে, পুকুর খনন করে পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে বিস্তীর্ণ চলনবিলে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে।

সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ ও উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, পলি জমে নাব্যতা হ্রাস চলনবিলের আয়তন দিনে দিনে কমছে। অন্যদিকে অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে কমছে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। সরকারের উচিত চলনবিলকে রক্ষা করে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা। তা না হলে চলনবিল হারাবে তার ঐতিহ্য।

নাটোর বিএডিসি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের আয়তন কমার মূল কারণই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদনদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় চলনবিল তার গৌরব হারিয়েছে। বিশেষ করে, অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করা। চলনবিলের ভিতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দিনে দিনে কমছে চলনবিলের পরিধি।
 
চলনবিলের ভেতরে অসংখ্য খাল রয়েছে, সেই খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত পলি অপসারণ করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তাহলে এই বিলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

Share this news as a Photo Card