নিউইয়র্ক ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন টানাপোড়েনে পড়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

  • আপডেটের সময় : ০৪:৪০:৪০ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬
  • ৬ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছে। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া এ ঘোষণার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন, তিস্তা ইস্যু এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া অনলাইন বক্তব্যে শেখ হাসিনা জানান, সম্ভাব্য কারাবরণ বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলেও দেশের মানুষের সেবার লক্ষ্যেই তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন।

এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এমন একটি আয়োজন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে—এ বিষয়ে ভারতকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তবুও অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের মতো একটি প্রতীকী দিনে এ আয়োজনকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি অবমাননা বলেও উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে ভারত দাবি করেছে, ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল না। তবে ভারতের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি বাংলাদেশ।

আশ্রয় থেকে প্রত্যর্পণ দাবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি আরও জোরালো হয়।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার নয়াদিল্লিকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা এবং তাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছে। তবে ভারত এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ধারণা, জোরপূর্বক তাকে বাংলাদেশে পাঠানো বাস্তবসম্মত নয়। যদিও তার স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত বর্তমান উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়ায়।

তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নয়াদিল্লি সফর, জ্বালানি সহায়তা, নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ এবং ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপকে আস্থা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তারপরও পাকিস্তান, চীন ও তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ ভারতের কৌশলগত পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে রয়েছে।

গঙ্গা ও তিস্তা চুক্তি হতে পারে নতুন পরীক্ষা

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এ চুক্তি নবায়নের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। নদীর পরিবর্তিত প্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির অগ্রগতির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এদিকে ভারতের পার্লামেন্টারি কমিটি অন এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের আস্থা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

নতুন টানাপোড়েনে পড়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

আপডেটের সময় : ০৪:৪০:৪০ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছে। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া এ ঘোষণার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন, তিস্তা ইস্যু এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া অনলাইন বক্তব্যে শেখ হাসিনা জানান, সম্ভাব্য কারাবরণ বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলেও দেশের মানুষের সেবার লক্ষ্যেই তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন।

এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এমন একটি আয়োজন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে—এ বিষয়ে ভারতকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তবুও অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের মতো একটি প্রতীকী দিনে এ আয়োজনকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি অবমাননা বলেও উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে ভারত দাবি করেছে, ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল না। তবে ভারতের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি বাংলাদেশ।

আশ্রয় থেকে প্রত্যর্পণ দাবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি আরও জোরালো হয়।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার নয়াদিল্লিকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা এবং তাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছে। তবে ভারত এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ধারণা, জোরপূর্বক তাকে বাংলাদেশে পাঠানো বাস্তবসম্মত নয়। যদিও তার স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত বর্তমান উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়ায়।

তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নয়াদিল্লি সফর, জ্বালানি সহায়তা, নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ এবং ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপকে আস্থা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তারপরও পাকিস্তান, চীন ও তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ ভারতের কৌশলগত পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে রয়েছে।

গঙ্গা ও তিস্তা চুক্তি হতে পারে নতুন পরীক্ষা

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এ চুক্তি নবায়নের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। নদীর পরিবর্তিত প্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির অগ্রগতির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এদিকে ভারতের পার্লামেন্টারি কমিটি অন এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের আস্থা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Share this news as a Photo Card