নিউইয়র্ক ০২:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোংলায় অতিবৃষ্টি ও ভাইরাসে বাগদা চিংড়িতে মড়ক, সর্বস্বান্ত চাষিরা

  • আপডেটের সময় : ০৪:৪৯:০৯ পূর্বাহ্ণ, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
  • ৬ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

টানা বৃষ্টি ও ভাইরাসের সংক্রমণে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় বাগদা চিংড়িতে ব্যাপক মড়ক (মরার প্রবণতা) দেখা দিয়েছে। গত এক মাস ধরে বিভিন্ন ঘেরে বিপুল পরিমাণ মাছ মরে ভেসে ওঠায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই বিপর্যয়ের কারণে চলতি মৌসুমে চিংড়ির উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে।

উপজেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লবণাক্ত পানির এই অঞ্চলে গত প্রায় চার দশক ধরে কৃষকরা ধানের বদলে বছরের আট মাসই চিংড়ির চাষ করে আসছেন। মোংলার মোট ১৪ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ১৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতেই বাগদা চাষ হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে এ উপজেলায় মোট ঘেরের সংখ্যা ৬ হাজার ৭০টি। স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই খাতটিই এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে।

উপজেলার চাঁদপাই, সুন্দরবন, মালগাজী ও হলদিবুনিয়া এলাকার চাষিরা জানান, গত জুন মাস থেকে টানা বৃষ্টি ও ভাইরাসের কারণে ঘেরে মাছ মারা যাচ্ছে। মরা চিংড়িগুলো লালচে রং ধারণ করে পাড়ে ভাসছে। যে সামান্য মাছ বেঁচে আছে, সেগুলোও অত্যন্ত দুর্বল হয়ে কাদার সঙ্গে মিশে থাকছে। ভরা মৌসুমে ঘেরগুলো এখন প্রায় মাছশূন্য।

সুন্দরবন ইউনিয়নের ঢালীরখন্ড গ্রামের চিংড়িচাষি আবুল কাসেম জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ঘেরে প্রায় সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এই সময়ে বিনিয়োগের সিংহভাগ টাকা উঠে আসার কথা থাকলেও মড়কের কারণে তিনি এ পর্যন্ত মাত্র এক লাখ টাকার মাছ পেয়েছেন।

চিংড়ির এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় আড়তগুলোতেও। উপজেলা চিংড়ি বণিক সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি ওলিয়ার খাঁ জানান, ২০২৫ সালে মোংলায় প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন বাগদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু এবার মড়কের কারণে আড়তগুলোতে মাছের সরবরাহ গতবারের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, চিংড়ি রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলেও তাদের সংকট নিরসনে মৎস্য অধিদপ্তরের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ঘেরে মাছ মারা যাওয়ার কারণ বা প্রতিকার সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি তাদের।

অভিযোগের বিষয়ে মোংলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মড়কের বিষয়টি স্বীকার করে এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন। তিনি জানান, হ্যাচারি থেকে আনা পোনায় আগে থেকেই জীবাণু থাকতে পারে। এছাড়া ঘেরে প্রয়োজনীয় তিন ফুট পানি না থাকা, মৌসুমের শুরুতে কাদা শোধন ও পর্যাপ্ত চুন ব্যবহার না করা এবং সুষম খাদ্যের অভাবেই মূলত মাছ দুর্বল হয়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি চলতি বছরের টানা বৃষ্টিপাতকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

মৎস্য দপ্তরের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করে এই কর্মকর্তা বলেন, চাষিদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। কোথাও মড়ক দেখা দিলে খবর পাওয়া মাত্রই সেখানে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

ইতালির বিমানবন্দরে দীর্ঘ ২৮ ঘন্টা আটকা ফ্লাইট, ওষুধ লাগেজে থাকায় অসুস্থ অনেক যাত্রী

ট্রাম্পের ৪০ কোটি ডলারের ‘বলরুম প্রকল্প’ আটকে দিলেন আদালত

০৮ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

মোংলায় অতিবৃষ্টি ও ভাইরাসে বাগদা চিংড়িতে মড়ক, সর্বস্বান্ত চাষিরা

আপডেটের সময় : ০৪:৪৯:০৯ পূর্বাহ্ণ, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬

টানা বৃষ্টি ও ভাইরাসের সংক্রমণে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় বাগদা চিংড়িতে ব্যাপক মড়ক (মরার প্রবণতা) দেখা দিয়েছে। গত এক মাস ধরে বিভিন্ন ঘেরে বিপুল পরিমাণ মাছ মরে ভেসে ওঠায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই বিপর্যয়ের কারণে চলতি মৌসুমে চিংড়ির উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে।

উপজেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লবণাক্ত পানির এই অঞ্চলে গত প্রায় চার দশক ধরে কৃষকরা ধানের বদলে বছরের আট মাসই চিংড়ির চাষ করে আসছেন। মোংলার মোট ১৪ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ১৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতেই বাগদা চাষ হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে এ উপজেলায় মোট ঘেরের সংখ্যা ৬ হাজার ৭০টি। স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই খাতটিই এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে।

উপজেলার চাঁদপাই, সুন্দরবন, মালগাজী ও হলদিবুনিয়া এলাকার চাষিরা জানান, গত জুন মাস থেকে টানা বৃষ্টি ও ভাইরাসের কারণে ঘেরে মাছ মারা যাচ্ছে। মরা চিংড়িগুলো লালচে রং ধারণ করে পাড়ে ভাসছে। যে সামান্য মাছ বেঁচে আছে, সেগুলোও অত্যন্ত দুর্বল হয়ে কাদার সঙ্গে মিশে থাকছে। ভরা মৌসুমে ঘেরগুলো এখন প্রায় মাছশূন্য।

সুন্দরবন ইউনিয়নের ঢালীরখন্ড গ্রামের চিংড়িচাষি আবুল কাসেম জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ঘেরে প্রায় সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এই সময়ে বিনিয়োগের সিংহভাগ টাকা উঠে আসার কথা থাকলেও মড়কের কারণে তিনি এ পর্যন্ত মাত্র এক লাখ টাকার মাছ পেয়েছেন।

চিংড়ির এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় আড়তগুলোতেও। উপজেলা চিংড়ি বণিক সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি ওলিয়ার খাঁ জানান, ২০২৫ সালে মোংলায় প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন বাগদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু এবার মড়কের কারণে আড়তগুলোতে মাছের সরবরাহ গতবারের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, চিংড়ি রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলেও তাদের সংকট নিরসনে মৎস্য অধিদপ্তরের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ঘেরে মাছ মারা যাওয়ার কারণ বা প্রতিকার সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি তাদের।

অভিযোগের বিষয়ে মোংলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মড়কের বিষয়টি স্বীকার করে এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন। তিনি জানান, হ্যাচারি থেকে আনা পোনায় আগে থেকেই জীবাণু থাকতে পারে। এছাড়া ঘেরে প্রয়োজনীয় তিন ফুট পানি না থাকা, মৌসুমের শুরুতে কাদা শোধন ও পর্যাপ্ত চুন ব্যবহার না করা এবং সুষম খাদ্যের অভাবেই মূলত মাছ দুর্বল হয়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি চলতি বছরের টানা বৃষ্টিপাতকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

মৎস্য দপ্তরের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করে এই কর্মকর্তা বলেন, চাষিদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। কোথাও মড়ক দেখা দিলে খবর পাওয়া মাত্রই সেখানে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Share this news as a Photo Card