নিউইয়র্ক ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন

  • আপডেটের সময় : ০৫:২১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
  • ৫ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার জানিয়েছে, চলতি বছরে তারা এক লাখ পঁচাত্তর হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। অভিযোগের তালিকায় আছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান পর্যন্ত নানা কারণ। পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ভিসার বেশিরভাগই এসেছে “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘটিত ঘটনা” থেকে। এটি অভিবাসন আইনজীবীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়েই সামান্য অভিযোগ বা এমনকি অপ্রমাণিত মামলার ভিত্তিতেও অনেকের ভিসা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

সংখ্যার হিসাবেও এবারের পরিসংখ্যান আগের চেয়ে বেশ চড়া। ২০২৫ সালে গোটা বছরে বাতিল হয়েছিল প্রায় আট হাজার ভিসা। সেখানে ২০২৬ সালে গড়ে প্রতি মাসে দশ হাজারেরও বেশি ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটছে। জানুয়ারি মাসেই প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছিল, আগের এক বছরে তারা এক লাখেরও বেশি ভিসা বাতিল করেছে। এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতিকে প্রশাসন অভিহিত করছে পররাষ্ট্র দপ্তরের “নিরবচ্ছিন্ন যাচাই-প্রক্রিয়া” হিসেবে। যার লক্ষ্য ভিসাধারীরা যেন শর্ত মেনে চলেন এবং আমেরিকানদের জন্য হুমকি হয়ে না ওঠেন।

পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি বলছে, বাতিল হওয়া ভিসার সিংহভাগের পেছনে আছে হামলা, মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি ও মাদক সংক্রান্ত অপরাধ। এর বাইরে বেপরোয়া গাড়িচালনা, যৌন নিপীড়ন, শিশু নির্যাতন, প্রতারণা ও তহবিল তছরুপের মতো অভিযোগও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছে। প্রশাসনের ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর নেতৃত্বে যেসব বিদেশি নাগরিক আমেরিকার জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ, তাঁদের চিহ্নিত করে ভিসা বাতিলের কাজ চলবে অব্যাহতভাবে।

তালিকায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে এমন কয়েকজনের প্রসঙ্গ, যাঁরা গত বছর নিহত রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী চার্লি কার্কের মৃত্যুতে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, এমন মন্তব্যকারীদের কারও কারও ভিসা কেবল এই কারণেই বাতিল হয়েছে যে তাঁরা কার্কের মৃত্যুকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন বা বলেছিলেন তাঁর মৃত্যু আরও আগে হওয়া উচিত ছিল।

এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম বিয়াল্লিশ বছর বয়সী তু লু ভাং-এর।ছয় সন্তানের জনক এই ব্যক্তিকে গত মাসে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ লাওসে ফেরত পাঠিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেই মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ তাঁকে ২০০৫ সালের এক শিশু যৌন নির্যাতন মামলায় ক্ষমা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র দপ্তর তাঁকে “পররাষ্ট্রনীতিগত কারণে” বহিষ্কারের আওতায় ফেলেছে।

“পররাষ্ট্রনীতিগত কারণে” বহিষ্কৃতদের তালিকায় আরও আছেন কমিউনিস্ট শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কিউবার কয়েকজন নাগরিক।ইরান সরকারের সঙ্গে সংযোগ থাকা ইরানি নাগরিকেরা, এবং কুয়েতের এক নাগরিক, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংসতা কামনা করেছিলেন এবং আমেরিকানদের নিজের “শত্রু” বলে অভিহিত করেছিলেন।

বাতিল হওয়া ভিসাগুলোর মধ্যে যৌন নিপীড়ন বা নাবালকদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, অপহরণ, মানব পাচার, মাদক বা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে। উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস আলাদাভাবে জানিয়েছে, তারা শতাধিক এমন অভিভাবকের ভিসা বাতিল করেছে।যাঁরা মূলত সন্তানের জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন—অভিবাসন বিতর্কে যা পরিচিত “জন্ম-পর্যটন” নামে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষায় সবশেষে যে কথাটি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তা হলো—মার্কিন ভিসা কোনো অধিকার নয়, বরং একটি সুবিধা, এবং এই সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে প্রশাসন হাতের সব উপায় কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর।

সংখ্যার এই উল্লম্ফন যতটা প্রশাসনিক কড়াকড়ির প্রমাণ বহন করে, ততটাই প্রশ্ন তুলে দেয় স্বচ্ছতা নিয়ে। “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘটিত ঘটনা” – এর আড়ালে ঠিক কতজনের বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, আর কতজন শুধু সন্দেহ বা সামান্য অভিযোগের ভিত্তিতে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন—সেই হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়। যারা বৈধ ভিসা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, প্রতিদিনকার অনিশ্চয়তার একটি নতুন মাত্রা এখন যোগ হয়েছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন

আপডেটের সময় : ০৫:২১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার জানিয়েছে, চলতি বছরে তারা এক লাখ পঁচাত্তর হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। অভিযোগের তালিকায় আছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান পর্যন্ত নানা কারণ। পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ভিসার বেশিরভাগই এসেছে “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘটিত ঘটনা” থেকে। এটি অভিবাসন আইনজীবীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়েই সামান্য অভিযোগ বা এমনকি অপ্রমাণিত মামলার ভিত্তিতেও অনেকের ভিসা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

সংখ্যার হিসাবেও এবারের পরিসংখ্যান আগের চেয়ে বেশ চড়া। ২০২৫ সালে গোটা বছরে বাতিল হয়েছিল প্রায় আট হাজার ভিসা। সেখানে ২০২৬ সালে গড়ে প্রতি মাসে দশ হাজারেরও বেশি ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটছে। জানুয়ারি মাসেই প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছিল, আগের এক বছরে তারা এক লাখেরও বেশি ভিসা বাতিল করেছে। এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতিকে প্রশাসন অভিহিত করছে পররাষ্ট্র দপ্তরের “নিরবচ্ছিন্ন যাচাই-প্রক্রিয়া” হিসেবে। যার লক্ষ্য ভিসাধারীরা যেন শর্ত মেনে চলেন এবং আমেরিকানদের জন্য হুমকি হয়ে না ওঠেন।

পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি বলছে, বাতিল হওয়া ভিসার সিংহভাগের পেছনে আছে হামলা, মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি ও মাদক সংক্রান্ত অপরাধ। এর বাইরে বেপরোয়া গাড়িচালনা, যৌন নিপীড়ন, শিশু নির্যাতন, প্রতারণা ও তহবিল তছরুপের মতো অভিযোগও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছে। প্রশাসনের ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর নেতৃত্বে যেসব বিদেশি নাগরিক আমেরিকার জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ, তাঁদের চিহ্নিত করে ভিসা বাতিলের কাজ চলবে অব্যাহতভাবে।

তালিকায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে এমন কয়েকজনের প্রসঙ্গ, যাঁরা গত বছর নিহত রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী চার্লি কার্কের মৃত্যুতে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, এমন মন্তব্যকারীদের কারও কারও ভিসা কেবল এই কারণেই বাতিল হয়েছে যে তাঁরা কার্কের মৃত্যুকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন বা বলেছিলেন তাঁর মৃত্যু আরও আগে হওয়া উচিত ছিল।

এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম বিয়াল্লিশ বছর বয়সী তু লু ভাং-এর।ছয় সন্তানের জনক এই ব্যক্তিকে গত মাসে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ লাওসে ফেরত পাঠিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেই মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ তাঁকে ২০০৫ সালের এক শিশু যৌন নির্যাতন মামলায় ক্ষমা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র দপ্তর তাঁকে “পররাষ্ট্রনীতিগত কারণে” বহিষ্কারের আওতায় ফেলেছে।

“পররাষ্ট্রনীতিগত কারণে” বহিষ্কৃতদের তালিকায় আরও আছেন কমিউনিস্ট শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কিউবার কয়েকজন নাগরিক।ইরান সরকারের সঙ্গে সংযোগ থাকা ইরানি নাগরিকেরা, এবং কুয়েতের এক নাগরিক, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংসতা কামনা করেছিলেন এবং আমেরিকানদের নিজের “শত্রু” বলে অভিহিত করেছিলেন।

বাতিল হওয়া ভিসাগুলোর মধ্যে যৌন নিপীড়ন বা নাবালকদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, অপহরণ, মানব পাচার, মাদক বা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে। উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস আলাদাভাবে জানিয়েছে, তারা শতাধিক এমন অভিভাবকের ভিসা বাতিল করেছে।যাঁরা মূলত সন্তানের জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন—অভিবাসন বিতর্কে যা পরিচিত “জন্ম-পর্যটন” নামে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষায় সবশেষে যে কথাটি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তা হলো—মার্কিন ভিসা কোনো অধিকার নয়, বরং একটি সুবিধা, এবং এই সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে প্রশাসন হাতের সব উপায় কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর।

সংখ্যার এই উল্লম্ফন যতটা প্রশাসনিক কড়াকড়ির প্রমাণ বহন করে, ততটাই প্রশ্ন তুলে দেয় স্বচ্ছতা নিয়ে। “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘটিত ঘটনা” – এর আড়ালে ঠিক কতজনের বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, আর কতজন শুধু সন্দেহ বা সামান্য অভিযোগের ভিত্তিতে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন—সেই হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়। যারা বৈধ ভিসা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, প্রতিদিনকার অনিশ্চয়তার একটি নতুন মাত্রা এখন যোগ হয়েছে।

Share this news as a Photo Card