ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা বৈঠকের মাঝেই হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নিরাপত্তায় থাকা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার কথা জানিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন, মূল্যস্ফীতি এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠকে ব্যস্ত, তখনই ইরান এ হামলা চালায়।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, ‘নীতি অমান্যকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে…আঘাত করা হয়েছে এবং সেগুলোকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় আরও চারটি তেলবাহী ট্যাংকার দ্রুত তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে আগের জায়গায় ফিরে গেছে।’
আইআরজিসির দাবি, জাহাজগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর নিরাপত্তায় একটি ‘অঘোষিত রুট’ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করছিল।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পারাপারে দুটি পৃথক নৌপথ নির্ধারণ করা হয়েছে। ইরানের অভিযোগ, ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতে তারা হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ অমান্যকারী জাহাজ ও বন্দরকে লক্ষ্য করেই তাদের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
দুই সপ্তাহ আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার অতিক্রম করে।
শুক্রবারও উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ইরানি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে প্রাচীন বিউফোর্ট দুর্গসংলগ্ন এলাকায় রাতভর বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর টানেল ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দ দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় শোনা যায় এবং আশপাশের অঞ্চল ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
তবে লেবাননের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, এ হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। জবাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা এই অভিযান পরিচালনা করেছে।হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করলেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান হামলা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও বেড়েছে, যা আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে শুক্রবার মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট আগেই জানিয়েছিলেন, বৈঠকে মূল গুরুত্ব পাবে ইরান-সংকট।
যদিও ট্রাম্প শুরুতে বলেছিলেন যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, বাস্তবে তা পাঁচ মাসে গড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন আমেরিকানের মধ্যে মাত্র একজন এ যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যা সংঘাত শুরুর পর সর্বনিম্ন জনসমর্থন।
কংগ্রেসেও যুদ্ধ নিয়ে সমর্থন কমছে। প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে আনা একটি প্রস্তাব সিনেটে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে নাকচ হয়েছে। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৯টি এবং বিপক্ষে ৫০টি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতি ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তাদের আশা, এই ইস্যুকে সামনে রেখে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক্সনমবিলের মুনাফা দ্বিগুণ হয়েছে। আর শেভরন জানিয়েছে, তাদের মুনাফা পাঁচ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।




















