নিউইয়র্ক ০৬:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মন্ত্রণালয়-শিক্ষা ভবনে প্রতিদিন সহস্রাধিক শিক্ষকের ভিড়

  • আপডেটের সময় : ০৬:০৭:০৪ অপরাহ্ণ, শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
  • ৫ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পাঠদান বাদ দিয়ে পদোন্নতি, বদলি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, এমপিওভুক্তকরণ, বকেয়া বেতন ছাড়, অনুদানসহ নানা ধরনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক তদবিরে শিক্ষকদের ব্যস্ত থাকার প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থাকে মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৬-১৮ তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আব্দুল গনি রোডের শিক্ষা ভবনে গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিনই সহস্রাধিক শিক্ষকের ভিড় দেখা গেছে।

মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী যেদিকে যান, সেদিকে শিক্ষকদের ঢল নামে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘সব শিক্ষকই ঢাকায় বদলি হতে চান। বদলির অনুরোধ নিয়ে শিক্ষকরা এত বেশি আসেন যে মন্ত্রণালয়ে অফিস কক্ষেও সহজে প্রবেশ করতে পারি না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পদোন্নতি, বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ঘিরে শিক্ষাভবনে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক শ্রেণির কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় গঠিত এই সিন্ডিকেটে যুক্ত রয়েছে শতাধিক দালাল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা ভবনের ফ্লোরে ফ্লোরে এসব দালালদের পদচারণা। একশ্রেণির অসত্ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বেশ সখ্যতা রয়েছে।জানা গেছে, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা সাধারণত পাঠদানের পাশাপাশি মাউশি মহাপরিচালক ও পরিচালক, আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর উপপরিচালক এবং সহকারী পরিচালক, সরকারি কলেজ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং সরকারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদ, জেলার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক প্রধান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরিদর্শক, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডসহ (এনসিটিবি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রকল্প ও পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক বা প্রকল্প পরিচালক পদের দায়িত্ব পালন করেন। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে এক শ্রেণির শিক্ষা ক্যাডার শিক্ষা ভবন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছেন। পদ ফাঁকা নেই, তারপরও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দায়িত্বরতকে সরিয়ে ঐ পদে বসতে চান অনেকে। এছাড়া, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ঢাকায় বদলি হয়ে আসার প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। মাউশির দালাল চক্র কোন পদের জন্য কত টাকা সেই রেটও নির্ধারণ করে দিয়েছে। ঢাকা শহরে প্রধান শিক্ষক স্কুলভেদে ৫-১০ লাখ টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসার জেলার গুরুত্ব অনুসারে ৫-১০ লাখ, উপপরিচালক ২০-৩০ লাখ টাকা। কলেজ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যে কোনো দপ্তরের চেয়ারম্যান পদে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা, ডিজি পর্যায়ের দুই কোটি বা তদুর্ধ্ব পরিমাণ, পরিচালক পর্যায়ের পদ এক কোটি, বড় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ ৩০-৫০ লাখ ও আঞ্চলিক পরিচালক পদ ৩০-৪০ লাখ টাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ঘুষের এই রেট ছিল। এদিকে ঘুষের রেট কমবেশির কারণে অগ্রিম টাকা নিয়েও বদলির কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে না। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একটি পদের জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। ফলে সবার কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, ঘুষের টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না দালাল চক্র ও মাউশির ঐ শীর্ষ কর্মকর্তা। এ নিয়ে তদবিরকারী গ্রুপগুলোর সঙ্গে মাউশির শীর্ষ ঐ কর্মকর্তার মনোমালিন্য, বাগবিতণ্ডাও হয়েছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত অভিযোগ গেছে।

২০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েও ডিআইএ থেকে বদলির আদেশ বাতিল হয়নি :পদায়ন না হওয়ায় অতি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে এ রকমের গুরুতর এক অভিযোগ দিয়েছেন মাগুরার যুবদলের এক নেতা। নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের একজন শিক্ষা পরিদর্শককে ইতিপূর্বে অন্যত্র বদলি করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বদলির আদেশটি জারি হয়। পরবর্তী সময় এই বদলির আদেশ বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাউশির একজন কর্মকর্তা ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেন। এক দালালের মাধ্যমে ঘুষের লেনদেনটি হয়। অভিযোগটি উঠেছে, বড় অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ঐ জায়গায় অন্য আরেক জন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। ঐ কর্মকর্তাকে সরানো যায়নি, তাই শিক্ষা পরিদর্শক পদে আগের কর্মকর্তার বদলির আদেশ বাতিল করা যায়নি। তবে ঐ কর্মকর্তার কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের ২০ লাখ টাকাও ফেরত দেননি মাউশির ঐ কর্মকর্তা।  এ নিয়ে অনেক চেষ্টা-তদবির করে সুরাহা না হওয়ায় নিজের মাগুরা এলাকার যুবদল এক নেতার সহায়তা চান। ঐ যুবদল নেতা নয়ন এ বিষয়ে মাউশির ঐ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন একাধিক বার। তাতে ব্যর্থ হয়ে শেষে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেন।

অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করে দেওয়ার নামে ঘুষ-বাণিজ্য যেন ‘ওপেন সিক্রেট’:এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন অবকাঠামো অনুমোদন করানোর নামেও চলে তদবির। এই তদবিরে যুক্ত হন রাজনৈতিক দলের এক শ্রেণির নেতাও। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করে দেওয়ার নামে ঘুষ-বাণিজ্য যেন ‘ওপেন সিক্রেট’। ডিআইএর একজন কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৬-১৮ তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই দুটি তলার করিডরগুলোতে এখন সক্রিয় শতাধিক দালাল চক্র।স্কুলের ফাইল আটকে ঘুষ আদায়, বোর্ডে লিখিত অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের :এদিকে ঘুষ-বাণিজ্য চলছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও। সম্প্রতি স্কুলের ফাইল আটকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের হিসাব শাখার একজন উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। এছাড়া, নতুন স্কুলের অনুমোদন, ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন, বদলি বাণিজ্যসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি রাজধানীর কল্যাণপুরে লরিয়াল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে ঐ উপপরিচালকসহ বোর্ডের এক বিদ্যালয় পরিদর্শক ও তার অফিস সহকারীর দুর্নীতির বিষয়টি সামনে এনেছেন। লিখিত অভিযোগে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমার স্কুলের বিভিন্ন কাজের জন্য আমার বোর্ডের স্কুল শাখায় যেতে হয়। আমি বোর্ডে স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজকর্ম করতে পারছি না। বিদ্যালয় পরিদর্শক অত্র শাখার এক কর্মচারীকে নিয়ে দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। ঐ কর্মচারীকে টাকা না দিলে স্কুলের কোনো ফাইল অনুমোদন হয় না। স্কুলের কাজের জন্য বোর্ডে আবেদন করলে ঐ কর্মচারী প্রত্যেক স্কুলের প্রধান শিক্ষক অথবা কমিটির লোকদের ফোন দিয়ে বলেন, ‘বোর্ডে আবেদন করেছেন টাকা দিয়ে যান, বিদ্যালয় পরিদর্শকে টাকা দিতে হবে, হিসাব শাখার উপপরিচালককে টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে আপনাদের কাজ হবে না।’ প্রধান শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেনের ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগের অনুলিপি শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসচিব, মাউশির মহাপরিচালক ও দুদকের সচিব বরাবর জমা দিয়েছেন। ইত্তেফাকের কাছেও চিঠির একটি কপি এসেছে। এই ব্যাপারে জানতে অভিযুক্তদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কেউই ফোন রিসিভ করেননি।

পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে এবারও ‘সিন্ডিকেট দর’, সরকারের গচ্ছা যাচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা :জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে দরপত্রে এবারও ‘সিন্ডিকেট দর’ দিয়েছেন ছাপাখানার মালিকরা। শুধু তাই নয়, এবার পাঠ্যবইয়ের ই-টেন্ডারে প্রাক্কলিত দর প্রতি ফর্মায় বাড়ানো হয়েছে ৩০ পয়সা থেকে ৪৫ পয়সা। এতে সরকারের ৩০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। এছাড়া, ‘সিন্ডিকেট দরে’ অধিক মূল্য দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা ইত্তেফাককে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গতবার পাঠ্যবই ছাপানোর টেন্ডারে প্রাক্কলিত দর কিছুটা কম ছিল। এবার পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশে দর সামান্য বেড়েছে।’

পদোন্নতি, বদলিসহ কোনো বাণিজ্যের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই :ডিজি, মাউশি :মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গতকাল বলেন, মাউশির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

কঙ্গোতে ইবোলা আক্রান্ত সাড়ে ৩ হাজার ছাড়াল, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাদুর্ভাব

দায়িত্ব ছাড়লেন ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা বিষয়ক উপদেষ্টা ক্লেভার-ক্যারন

০২ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

মন্ত্রণালয়-শিক্ষা ভবনে প্রতিদিন সহস্রাধিক শিক্ষকের ভিড়

আপডেটের সময় : ০৬:০৭:০৪ অপরাহ্ণ, শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬

শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পাঠদান বাদ দিয়ে পদোন্নতি, বদলি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, এমপিওভুক্তকরণ, বকেয়া বেতন ছাড়, অনুদানসহ নানা ধরনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক তদবিরে শিক্ষকদের ব্যস্ত থাকার প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থাকে মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৬-১৮ তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আব্দুল গনি রোডের শিক্ষা ভবনে গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিনই সহস্রাধিক শিক্ষকের ভিড় দেখা গেছে।

মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী যেদিকে যান, সেদিকে শিক্ষকদের ঢল নামে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘সব শিক্ষকই ঢাকায় বদলি হতে চান। বদলির অনুরোধ নিয়ে শিক্ষকরা এত বেশি আসেন যে মন্ত্রণালয়ে অফিস কক্ষেও সহজে প্রবেশ করতে পারি না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পদোন্নতি, বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ঘিরে শিক্ষাভবনে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক শ্রেণির কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় গঠিত এই সিন্ডিকেটে যুক্ত রয়েছে শতাধিক দালাল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা ভবনের ফ্লোরে ফ্লোরে এসব দালালদের পদচারণা। একশ্রেণির অসত্ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বেশ সখ্যতা রয়েছে।জানা গেছে, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা সাধারণত পাঠদানের পাশাপাশি মাউশি মহাপরিচালক ও পরিচালক, আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর উপপরিচালক এবং সহকারী পরিচালক, সরকারি কলেজ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং সরকারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদ, জেলার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক প্রধান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরিদর্শক, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডসহ (এনসিটিবি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রকল্প ও পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক বা প্রকল্প পরিচালক পদের দায়িত্ব পালন করেন। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে এক শ্রেণির শিক্ষা ক্যাডার শিক্ষা ভবন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছেন। পদ ফাঁকা নেই, তারপরও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দায়িত্বরতকে সরিয়ে ঐ পদে বসতে চান অনেকে। এছাড়া, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ঢাকায় বদলি হয়ে আসার প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। মাউশির দালাল চক্র কোন পদের জন্য কত টাকা সেই রেটও নির্ধারণ করে দিয়েছে। ঢাকা শহরে প্রধান শিক্ষক স্কুলভেদে ৫-১০ লাখ টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসার জেলার গুরুত্ব অনুসারে ৫-১০ লাখ, উপপরিচালক ২০-৩০ লাখ টাকা। কলেজ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যে কোনো দপ্তরের চেয়ারম্যান পদে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা, ডিজি পর্যায়ের দুই কোটি বা তদুর্ধ্ব পরিমাণ, পরিচালক পর্যায়ের পদ এক কোটি, বড় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ ৩০-৫০ লাখ ও আঞ্চলিক পরিচালক পদ ৩০-৪০ লাখ টাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ঘুষের এই রেট ছিল। এদিকে ঘুষের রেট কমবেশির কারণে অগ্রিম টাকা নিয়েও বদলির কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে না। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একটি পদের জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। ফলে সবার কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, ঘুষের টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না দালাল চক্র ও মাউশির ঐ শীর্ষ কর্মকর্তা। এ নিয়ে তদবিরকারী গ্রুপগুলোর সঙ্গে মাউশির শীর্ষ ঐ কর্মকর্তার মনোমালিন্য, বাগবিতণ্ডাও হয়েছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত অভিযোগ গেছে।

২০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েও ডিআইএ থেকে বদলির আদেশ বাতিল হয়নি :পদায়ন না হওয়ায় অতি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে এ রকমের গুরুতর এক অভিযোগ দিয়েছেন মাগুরার যুবদলের এক নেতা। নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের একজন শিক্ষা পরিদর্শককে ইতিপূর্বে অন্যত্র বদলি করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বদলির আদেশটি জারি হয়। পরবর্তী সময় এই বদলির আদেশ বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাউশির একজন কর্মকর্তা ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেন। এক দালালের মাধ্যমে ঘুষের লেনদেনটি হয়। অভিযোগটি উঠেছে, বড় অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ঐ জায়গায় অন্য আরেক জন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। ঐ কর্মকর্তাকে সরানো যায়নি, তাই শিক্ষা পরিদর্শক পদে আগের কর্মকর্তার বদলির আদেশ বাতিল করা যায়নি। তবে ঐ কর্মকর্তার কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের ২০ লাখ টাকাও ফেরত দেননি মাউশির ঐ কর্মকর্তা।  এ নিয়ে অনেক চেষ্টা-তদবির করে সুরাহা না হওয়ায় নিজের মাগুরা এলাকার যুবদল এক নেতার সহায়তা চান। ঐ যুবদল নেতা নয়ন এ বিষয়ে মাউশির ঐ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন একাধিক বার। তাতে ব্যর্থ হয়ে শেষে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেন।

অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করে দেওয়ার নামে ঘুষ-বাণিজ্য যেন ‘ওপেন সিক্রেট’:এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন অবকাঠামো অনুমোদন করানোর নামেও চলে তদবির। এই তদবিরে যুক্ত হন রাজনৈতিক দলের এক শ্রেণির নেতাও। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করে দেওয়ার নামে ঘুষ-বাণিজ্য যেন ‘ওপেন সিক্রেট’। ডিআইএর একজন কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৬-১৮ তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই দুটি তলার করিডরগুলোতে এখন সক্রিয় শতাধিক দালাল চক্র।স্কুলের ফাইল আটকে ঘুষ আদায়, বোর্ডে লিখিত অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের :এদিকে ঘুষ-বাণিজ্য চলছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও। সম্প্রতি স্কুলের ফাইল আটকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের হিসাব শাখার একজন উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। এছাড়া, নতুন স্কুলের অনুমোদন, ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন, বদলি বাণিজ্যসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি রাজধানীর কল্যাণপুরে লরিয়াল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে ঐ উপপরিচালকসহ বোর্ডের এক বিদ্যালয় পরিদর্শক ও তার অফিস সহকারীর দুর্নীতির বিষয়টি সামনে এনেছেন। লিখিত অভিযোগে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমার স্কুলের বিভিন্ন কাজের জন্য আমার বোর্ডের স্কুল শাখায় যেতে হয়। আমি বোর্ডে স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজকর্ম করতে পারছি না। বিদ্যালয় পরিদর্শক অত্র শাখার এক কর্মচারীকে নিয়ে দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। ঐ কর্মচারীকে টাকা না দিলে স্কুলের কোনো ফাইল অনুমোদন হয় না। স্কুলের কাজের জন্য বোর্ডে আবেদন করলে ঐ কর্মচারী প্রত্যেক স্কুলের প্রধান শিক্ষক অথবা কমিটির লোকদের ফোন দিয়ে বলেন, ‘বোর্ডে আবেদন করেছেন টাকা দিয়ে যান, বিদ্যালয় পরিদর্শকে টাকা দিতে হবে, হিসাব শাখার উপপরিচালককে টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে আপনাদের কাজ হবে না।’ প্রধান শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেনের ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগের অনুলিপি শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসচিব, মাউশির মহাপরিচালক ও দুদকের সচিব বরাবর জমা দিয়েছেন। ইত্তেফাকের কাছেও চিঠির একটি কপি এসেছে। এই ব্যাপারে জানতে অভিযুক্তদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কেউই ফোন রিসিভ করেননি।

পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে এবারও ‘সিন্ডিকেট দর’, সরকারের গচ্ছা যাচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা :জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে দরপত্রে এবারও ‘সিন্ডিকেট দর’ দিয়েছেন ছাপাখানার মালিকরা। শুধু তাই নয়, এবার পাঠ্যবইয়ের ই-টেন্ডারে প্রাক্কলিত দর প্রতি ফর্মায় বাড়ানো হয়েছে ৩০ পয়সা থেকে ৪৫ পয়সা। এতে সরকারের ৩০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। এছাড়া, ‘সিন্ডিকেট দরে’ অধিক মূল্য দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা ইত্তেফাককে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গতবার পাঠ্যবই ছাপানোর টেন্ডারে প্রাক্কলিত দর কিছুটা কম ছিল। এবার পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশে দর সামান্য বেড়েছে।’

পদোন্নতি, বদলিসহ কোনো বাণিজ্যের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই :ডিজি, মাউশি :মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গতকাল বলেন, মাউশির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।

Share this news as a Photo Card