নিউইয়র্ক ০৬:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইএমএফের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে, অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থায় বাংলাদেশ

  • আপডেটের সময় : ০৩:০২:০২ অপরাহ্ণ, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে মন্দা ও ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিকে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করে সংকটের ভয়াবহতা স্বীকার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পানাম ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান।

মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্ট-এ প্রকাশিত ‘এ স্টেট অব ইকোনমিক ইমার্জেন্সি’ শীর্ষক এক নিবন্ধে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে ২০২৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। সংস্থাটির ধারণা, আগামী দশকেও বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে।

বিশ্বব্যাংকও ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে।

জ্যোতি রহমানের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দায়ী নয়। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট, বিনিয়োগ হ্রাস ও নীতিগত অনিশ্চয়তাও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ অর্থবছরের আগে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা নেই।

দেশে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপরও তা ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

জ্যোতি রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। একই সঙ্গে প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণও কমছে। ২০২২ সালে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। ২০২৭ ও ২০২৮ অর্থবছরে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ০ দশমিক ৩ ও ১ শতাংশ হতে পারে।

অন্যদিকে, জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার ২০২৫ অর্থবছরের ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০৩১ অর্থবছরে ২৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংস্থাটি এ হার প্রায় ৩৩ শতাংশে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করেছিল।

জ্যোতি রহমান বলেন, বিনিয়োগে মন্দা অব্যাহত থাকলে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব আয়—তিনটি ক্ষেত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা বাড়ায় ঋণ বিতরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ঋণের চাপে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমছে। শুধু মুদ্রানীতি শিথিল করা কিংবা সাময়িক ঋণসহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

দারিদ্র্য বাড়ছে, চাপে সরকারি অর্থব্যবস্থা

বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়েও পূর্বাভাস পরিবর্তন করেছে বিশ্বব্যাংক। এপ্রিলে সংস্থাটি ধারণা করেছিল, ২০২৫ অর্থবছরের ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৮ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়াবে। তবে সর্বশেষ পূর্বাভাসে ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

জ্যোতি রহমান বলেন, ২০২৬ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও তা দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়।

এদিকে, সরকারের রাজস্ব আয় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজস্ব আয় জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এর আগে সংস্থাটি এ হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি হবে বলে ধারণা করেছিল।

একই সঙ্গে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হলেও ২০৩১ অর্থবছরে তা প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

নিবন্ধে টাকার বিনিময় হার নিয়ে ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে জ্যোতি রহমানের হিসাব, ২০২৫ অর্থবছরে প্রতি ডলারের বিপরীতে প্রায় ১২০ টাকা থেকে কমতে কমতে ২০৩১ অর্থবছরে টাকার বিনিময় হার প্রায় ১৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে এটি আইএমএফের ঘোষিত কোনো লক্ষ্যমাত্রা নয়; বরং সংস্থাটির পূর্বাভাস থেকে পাওয়া একটি সম্ভাব্য হিসাব।

ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বিপুল অর্থ

ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে বিপুল সরকারি অর্থের প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন জ্যোতি রহমান। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের একটি হিসাব তুলে ধরে বলেন, ব্যাংকিং খাতকে সহায়তা দিতে কয়েক বছর ধরে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হতে পারে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টার বরাতে ব্যাংকিং খাতের পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর মেয়াদে ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের একটি হিসাবও উল্লেখ করেন তিনি।

জ্যোতি রহমানের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ এবং বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের নতুন কর্মসূচি নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ কর্মসূচির অর্থায়নের পরিমাণ ও সংস্কারসংক্রান্ত শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। জ্যোতি রহমান বলেন, নতুন কর্মসূচির সাফল্য কত অর্থায়ন পাওয়া গেল, তা দিয়ে নয়; বরং বিনিয়োগ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে এর কার্যকারিতা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।

তিনি ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, সতর্ক রাজস্বনীতি, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা, ভর্তুকি সংস্কার এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সুপারিশ করেন।

তার মতে, সংস্কার কার্যক্রম সফল হলেও দশকের শেষ হওয়ার আগে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। ফলে সরকারের ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রমেই অবাস্তব হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক সংকটের ব্যাপকতা প্রকাশ্যে স্বীকার করা, ব্যাংকিং খাতের ক্ষতির হিসাব প্রকাশ এবং ব্যয়সংকোচন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জ্যোতি রহমান।

তিনি সতর্ক করে বলেন, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল বিনিয়োগ, স্থবির প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে আটকে পড়তে পারে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা দিয়ে পর্যটক টানছে চীন

ওমরাহ যাত্রীদের জন্য নতুন ডিজিটাল সেবা চালু করল সৌদি আরব

২১ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

আইএমএফের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে, অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থায় বাংলাদেশ

আপডেটের সময় : ০৩:০২:০২ অপরাহ্ণ, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে মন্দা ও ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিকে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করে সংকটের ভয়াবহতা স্বীকার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পানাম ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান।

মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্ট-এ প্রকাশিত ‘এ স্টেট অব ইকোনমিক ইমার্জেন্সি’ শীর্ষক এক নিবন্ধে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে ২০২৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। সংস্থাটির ধারণা, আগামী দশকেও বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে।

বিশ্বব্যাংকও ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে।

জ্যোতি রহমানের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দায়ী নয়। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট, বিনিয়োগ হ্রাস ও নীতিগত অনিশ্চয়তাও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ অর্থবছরের আগে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা নেই।

দেশে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপরও তা ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

জ্যোতি রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। একই সঙ্গে প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণও কমছে। ২০২২ সালে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। ২০২৭ ও ২০২৮ অর্থবছরে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ০ দশমিক ৩ ও ১ শতাংশ হতে পারে।

অন্যদিকে, জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার ২০২৫ অর্থবছরের ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০৩১ অর্থবছরে ২৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংস্থাটি এ হার প্রায় ৩৩ শতাংশে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করেছিল।

জ্যোতি রহমান বলেন, বিনিয়োগে মন্দা অব্যাহত থাকলে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব আয়—তিনটি ক্ষেত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা বাড়ায় ঋণ বিতরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ঋণের চাপে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমছে। শুধু মুদ্রানীতি শিথিল করা কিংবা সাময়িক ঋণসহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

দারিদ্র্য বাড়ছে, চাপে সরকারি অর্থব্যবস্থা

বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়েও পূর্বাভাস পরিবর্তন করেছে বিশ্বব্যাংক। এপ্রিলে সংস্থাটি ধারণা করেছিল, ২০২৫ অর্থবছরের ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৮ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়াবে। তবে সর্বশেষ পূর্বাভাসে ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

জ্যোতি রহমান বলেন, ২০২৬ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও তা দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়।

এদিকে, সরকারের রাজস্ব আয় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজস্ব আয় জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এর আগে সংস্থাটি এ হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি হবে বলে ধারণা করেছিল।

একই সঙ্গে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হলেও ২০৩১ অর্থবছরে তা প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

নিবন্ধে টাকার বিনিময় হার নিয়ে ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে জ্যোতি রহমানের হিসাব, ২০২৫ অর্থবছরে প্রতি ডলারের বিপরীতে প্রায় ১২০ টাকা থেকে কমতে কমতে ২০৩১ অর্থবছরে টাকার বিনিময় হার প্রায় ১৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে এটি আইএমএফের ঘোষিত কোনো লক্ষ্যমাত্রা নয়; বরং সংস্থাটির পূর্বাভাস থেকে পাওয়া একটি সম্ভাব্য হিসাব।

ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বিপুল অর্থ

ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে বিপুল সরকারি অর্থের প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন জ্যোতি রহমান। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের একটি হিসাব তুলে ধরে বলেন, ব্যাংকিং খাতকে সহায়তা দিতে কয়েক বছর ধরে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হতে পারে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টার বরাতে ব্যাংকিং খাতের পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর মেয়াদে ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের একটি হিসাবও উল্লেখ করেন তিনি।

জ্যোতি রহমানের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ এবং বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের নতুন কর্মসূচি নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ কর্মসূচির অর্থায়নের পরিমাণ ও সংস্কারসংক্রান্ত শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। জ্যোতি রহমান বলেন, নতুন কর্মসূচির সাফল্য কত অর্থায়ন পাওয়া গেল, তা দিয়ে নয়; বরং বিনিয়োগ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে এর কার্যকারিতা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।

তিনি ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, সতর্ক রাজস্বনীতি, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা, ভর্তুকি সংস্কার এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সুপারিশ করেন।

তার মতে, সংস্কার কার্যক্রম সফল হলেও দশকের শেষ হওয়ার আগে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। ফলে সরকারের ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রমেই অবাস্তব হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক সংকটের ব্যাপকতা প্রকাশ্যে স্বীকার করা, ব্যাংকিং খাতের ক্ষতির হিসাব প্রকাশ এবং ব্যয়সংকোচন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জ্যোতি রহমান।

তিনি সতর্ক করে বলেন, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল বিনিয়োগ, স্থবির প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে আটকে পড়তে পারে।

Share this news as a Photo Card