নিউইয়র্ক ০৮:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়

  • আপডেটের সময় : ১১:৪৫:০৬ পূর্বাহ্ণ, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
  • ০ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

‘ওরা যা চায়, দিয়ে দাও, না হলে আমাকে মেরে ফেলবে’—লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় ছোট ভাই আরিফুল ইসলামের এমন আকুতি শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার উজ্জ্বল হোসেন। ইতালিতে পাঠানো ও মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আরিফুলকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় স্বপ্নের গল্প। তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। 

নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। ভাইকে বাঁচাতে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ১০ লাখ টাকা দেন উজ্জ্বল। পরিবারের অভিযোগ, পরে তাদের বাবা ইজাল উদ্দিনকেও অপহরণ করা হয়। তাকে ছাড়িয়ে আনতে আরও ১০ লাখ টাকা দিতে হয়।

আরিফুলের পরিবারের এই অভিজ্ঞতা লিবিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পর অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। নির্যাতনের ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায় করছে পাচারকারী চক্র। লাখ লাখ টাকা দিয়েও মিলছে না মুক্তি, নিশ্চিত হচ্ছে না ইউরোপে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা। কেউ জিম্মিদশা থেকে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন, কেউ ইউরোপের পথে ভূমধ্যসাগরে হারিয়ে যাচ্ছেন চিরতরে।

ইউরোপে পৌঁছানোর এই যাত্রায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন বাংলাদেশিরা। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ এ জন্য ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টাকায়ও পৌঁছাচ্ছে। এত বিপুল অর্থ খরচ করেও গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকছে না। বরং অনেকে পথে জিম্মি হয়ে পড়ছেন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কিংবা সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন।

২০২৬ সালের দুটি ঘটনা: ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছেছেন। ২০২৫ সালে এ পথে পৌঁছান ২০ হাজার ২৫৯ জন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে ৩ হাজার ৬০৮ জন। এসব সংখ্যা ইউরোপে পৌঁছানো মানুষের হিসাব; যাত্রাপথে প্রাণ হারানো, নিখোঁজ হওয়া কিংবা দেশে ফিরে আসা মানুষের মোট সংখ্যা নয়। তবে এই যাত্রার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, তা স্পষ্ট হয়েছে ২০২৬ সালের দুটি ঘটনায়। 

মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসের পথে একটি নৌযানে ছয় দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এরপর আগস্টে লিবিয়া থেকে ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিককে নিয়ে আরেকটি নৌযান যাত্রা করে। প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ঐ ঘটনায় অন্তত ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। উদ্ধার হন ২৯ বাংলাদেশি। এ দুটি ঘটনায় অন্তত ২৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও এ পথে বিভিন্ন সময়ে নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশির পূর্ণাঙ্গ নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।

কঠিন বাস্তবতা: লিবিয়ায় আটকে পড়া ও বিপদে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগও চলছে। ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট, ১ সেপ্টেম্বর ও ১৫ সেপ্টেম্বর তিন দফায় মোট ৫১৬ জন দেশে ফিরেছেন। এই সংখ্যা গত ছয় বছরে লিবিয়া থেকে ফিরে আসা প্রায় ১৫ হাজার মানুষের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। দেশে ফিরলেও অনেকের সামনে থাকে ঋণের বোঝা, বিক্রি করা জমি বা হারানো সঞ্চয় ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতা।

লিবিয়া থেকে ফিরে আসা অভিবাসীদের নিয়ে ব্র্যাকের এক গবেষণায় তাদের অভিজ্ঞতার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন শিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং ৬৯ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না। তবে এসব পরিসংখ্যান গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি; লিবিয়া থেকে ফিরে আসা সব অভিবাসীর ক্ষেত্রে একই চিত্র ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

সারাদেশে দুই দিন এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণা

১২ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়

আপডেটের সময় : ১১:৪৫:০৬ পূর্বাহ্ণ, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

‘ওরা যা চায়, দিয়ে দাও, না হলে আমাকে মেরে ফেলবে’—লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় ছোট ভাই আরিফুল ইসলামের এমন আকুতি শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার উজ্জ্বল হোসেন। ইতালিতে পাঠানো ও মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আরিফুলকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় স্বপ্নের গল্প। তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। 

নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। ভাইকে বাঁচাতে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ১০ লাখ টাকা দেন উজ্জ্বল। পরিবারের অভিযোগ, পরে তাদের বাবা ইজাল উদ্দিনকেও অপহরণ করা হয়। তাকে ছাড়িয়ে আনতে আরও ১০ লাখ টাকা দিতে হয়।

আরিফুলের পরিবারের এই অভিজ্ঞতা লিবিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পর অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। নির্যাতনের ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায় করছে পাচারকারী চক্র। লাখ লাখ টাকা দিয়েও মিলছে না মুক্তি, নিশ্চিত হচ্ছে না ইউরোপে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা। কেউ জিম্মিদশা থেকে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন, কেউ ইউরোপের পথে ভূমধ্যসাগরে হারিয়ে যাচ্ছেন চিরতরে।

ইউরোপে পৌঁছানোর এই যাত্রায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন বাংলাদেশিরা। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ এ জন্য ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টাকায়ও পৌঁছাচ্ছে। এত বিপুল অর্থ খরচ করেও গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকছে না। বরং অনেকে পথে জিম্মি হয়ে পড়ছেন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কিংবা সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন।

২০২৬ সালের দুটি ঘটনা: ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছেছেন। ২০২৫ সালে এ পথে পৌঁছান ২০ হাজার ২৫৯ জন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে ৩ হাজার ৬০৮ জন। এসব সংখ্যা ইউরোপে পৌঁছানো মানুষের হিসাব; যাত্রাপথে প্রাণ হারানো, নিখোঁজ হওয়া কিংবা দেশে ফিরে আসা মানুষের মোট সংখ্যা নয়। তবে এই যাত্রার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, তা স্পষ্ট হয়েছে ২০২৬ সালের দুটি ঘটনায়। 

মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসের পথে একটি নৌযানে ছয় দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এরপর আগস্টে লিবিয়া থেকে ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিককে নিয়ে আরেকটি নৌযান যাত্রা করে। প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ঐ ঘটনায় অন্তত ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। উদ্ধার হন ২৯ বাংলাদেশি। এ দুটি ঘটনায় অন্তত ২৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও এ পথে বিভিন্ন সময়ে নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশির পূর্ণাঙ্গ নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।

কঠিন বাস্তবতা: লিবিয়ায় আটকে পড়া ও বিপদে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগও চলছে। ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট, ১ সেপ্টেম্বর ও ১৫ সেপ্টেম্বর তিন দফায় মোট ৫১৬ জন দেশে ফিরেছেন। এই সংখ্যা গত ছয় বছরে লিবিয়া থেকে ফিরে আসা প্রায় ১৫ হাজার মানুষের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। দেশে ফিরলেও অনেকের সামনে থাকে ঋণের বোঝা, বিক্রি করা জমি বা হারানো সঞ্চয় ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতা।

লিবিয়া থেকে ফিরে আসা অভিবাসীদের নিয়ে ব্র্যাকের এক গবেষণায় তাদের অভিজ্ঞতার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন শিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং ৬৯ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না। তবে এসব পরিসংখ্যান গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি; লিবিয়া থেকে ফিরে আসা সব অভিবাসীর ক্ষেত্রে একই চিত্র ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

Share this news as a Photo Card