নিউইয়র্ক ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘একটা ঘর আর তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা হলে মরেও শান্তি পাইতাম’

  • আপডেটের সময় : ০৫:৫৫:৪২ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • ৮ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

জন্ম থেকে ভূমিহীন। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে অন্যের জমিতে তৈরি জরাজীর্ণ একটি ছাপড়া। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন অনেক আগেই। অন্ধ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ৯৫ বছর বয়সী কবির উদ্দিন ভূঁইয়া (স্থানীয়ভাবে ভুঁসি নামে পরিচিত) এবং তার স্ত্রী নূর জাহান বেগমের জীবন এখন চরম মানবেতর অবস্থায় কাটছে। তাদের সম্বল বলতে রয়েছে শুধু দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। নেই নিজের জমি, নেই নিরাপদ বসতঘর, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌর শহরের মিয়াপাড়া এলাকায় দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছর ধরে অন্যের জমিতে একটি জরাজীর্ণ ছাপড়ায় বসবাস করছেন এই দম্পতি। চারপাশে নোংরা পরিবেশ, পাশে নর্দমা ও আবর্জনার স্তূপ। বৃষ্টির সময় ছাউনির ফুটো দিয়ে পানি পড়ে, আর সাপ-পোকামাকড়ের সঙ্গে একই ঘরে বসবাস করতে হয় তাদের।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কবির উদ্দিনের বয়স প্রায় ৯৫ বছর এবং স্ত্রী নূর জাহান বেগমের বয়স ৭০ বছর। তাদের একমাত্র মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর সংসারে চলে গেছেন। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে দুজনই কর্মক্ষম নন। কবির উদ্দিন দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি প্রায় হারিয়েছেন। অন্যের সহায়তা ছাড়া চলাফেরাও করতে পারেন না। স্ত্রী নূর জাহানও বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ ও কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।

তাদের বসবাসের ঘরে নেই বিদ্যুৎ, নিরাপদ টয়লেট কিংবা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও একজনের নামে শুধু একটি বয়স্ক ভাতা রয়েছে। অন্যজন এখনো কোনো সরকারি সহায়তার আওতায় আসেননি।

কবির উদ্দিন বলেন, এনআইডি কার্ড ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। মরার আগে যদি একটা ঘর আর তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা হতো, তাহলে মরেও শান্তি পাইতাম। কাফনের কাপড় কেনারও সামর্থ্য নেই। যার কেউ নেই, তার আল্লাহ আছেন।

তার স্ত্রী নূর জাহান বেগম বলেন, ৭০ বছর মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালিয়েছি। এখন আর কাজ করতে পারি না। ভিক্ষা করারও শক্তি নেই। নিজের কষ্টের চেয়ে বেশি কষ্ট লাগে, যখন বৃদ্ধ স্বামী ক্ষুধায় ছটফট করে। সরকারের অনেক সহায়তা আসে, কিন্তু আমাদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না। গত ঈদেও কোনো সহায়তা পাইনি।

স্থানীয় বাসিন্দা লিটন সিদ্দিকী বলেন, আমাদের জমিতে প্রায় ৭০ বছর ধরে তারা বসবাস করছেন। পাঁচটি ভাঙা টিনের একটি ছাপড়া ছাড়া তাদের কোনো সম্পদ নেই। সরকার যদি তাদের জন্য একটু জমি, একটি ঘর এবং খাবারের ব্যবস্থা করে, তাহলে জীবনের শেষ সময়টা অন্তত মানবিকভাবে কাটাতে পারবেন।

মিয়াপাড়ার বাসিন্দা ও সাবেক প্রধান শিক্ষক মাসুমুল হক সিদ্দিকী বলেন, জরাজীর্ণ ছাপড়াটির টিন ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। চারপাশে আবর্জনা থাকায় পোকামাকড় ও বিষধর সাপের উপদ্রব রয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই বৃদ্ধ দম্পতি সেখানে বসবাস করছেন।

এ বিষয়ে বকশীগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি আগে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের জানানো হয়নি। জানলে আগেই প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া যেত। এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পৌরসভার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহায়তার সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

‘একটা ঘর আর তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা হলে মরেও শান্তি পাইতাম’

আপডেটের সময় : ০৫:৫৫:৪২ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

জন্ম থেকে ভূমিহীন। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে অন্যের জমিতে তৈরি জরাজীর্ণ একটি ছাপড়া। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন অনেক আগেই। অন্ধ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ৯৫ বছর বয়সী কবির উদ্দিন ভূঁইয়া (স্থানীয়ভাবে ভুঁসি নামে পরিচিত) এবং তার স্ত্রী নূর জাহান বেগমের জীবন এখন চরম মানবেতর অবস্থায় কাটছে। তাদের সম্বল বলতে রয়েছে শুধু দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। নেই নিজের জমি, নেই নিরাপদ বসতঘর, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌর শহরের মিয়াপাড়া এলাকায় দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছর ধরে অন্যের জমিতে একটি জরাজীর্ণ ছাপড়ায় বসবাস করছেন এই দম্পতি। চারপাশে নোংরা পরিবেশ, পাশে নর্দমা ও আবর্জনার স্তূপ। বৃষ্টির সময় ছাউনির ফুটো দিয়ে পানি পড়ে, আর সাপ-পোকামাকড়ের সঙ্গে একই ঘরে বসবাস করতে হয় তাদের।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কবির উদ্দিনের বয়স প্রায় ৯৫ বছর এবং স্ত্রী নূর জাহান বেগমের বয়স ৭০ বছর। তাদের একমাত্র মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর সংসারে চলে গেছেন। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে দুজনই কর্মক্ষম নন। কবির উদ্দিন দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি প্রায় হারিয়েছেন। অন্যের সহায়তা ছাড়া চলাফেরাও করতে পারেন না। স্ত্রী নূর জাহানও বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ ও কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।

তাদের বসবাসের ঘরে নেই বিদ্যুৎ, নিরাপদ টয়লেট কিংবা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও একজনের নামে শুধু একটি বয়স্ক ভাতা রয়েছে। অন্যজন এখনো কোনো সরকারি সহায়তার আওতায় আসেননি।

কবির উদ্দিন বলেন, এনআইডি কার্ড ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। মরার আগে যদি একটা ঘর আর তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা হতো, তাহলে মরেও শান্তি পাইতাম। কাফনের কাপড় কেনারও সামর্থ্য নেই। যার কেউ নেই, তার আল্লাহ আছেন।

তার স্ত্রী নূর জাহান বেগম বলেন, ৭০ বছর মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালিয়েছি। এখন আর কাজ করতে পারি না। ভিক্ষা করারও শক্তি নেই। নিজের কষ্টের চেয়ে বেশি কষ্ট লাগে, যখন বৃদ্ধ স্বামী ক্ষুধায় ছটফট করে। সরকারের অনেক সহায়তা আসে, কিন্তু আমাদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না। গত ঈদেও কোনো সহায়তা পাইনি।

স্থানীয় বাসিন্দা লিটন সিদ্দিকী বলেন, আমাদের জমিতে প্রায় ৭০ বছর ধরে তারা বসবাস করছেন। পাঁচটি ভাঙা টিনের একটি ছাপড়া ছাড়া তাদের কোনো সম্পদ নেই। সরকার যদি তাদের জন্য একটু জমি, একটি ঘর এবং খাবারের ব্যবস্থা করে, তাহলে জীবনের শেষ সময়টা অন্তত মানবিকভাবে কাটাতে পারবেন।

মিয়াপাড়ার বাসিন্দা ও সাবেক প্রধান শিক্ষক মাসুমুল হক সিদ্দিকী বলেন, জরাজীর্ণ ছাপড়াটির টিন ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। চারপাশে আবর্জনা থাকায় পোকামাকড় ও বিষধর সাপের উপদ্রব রয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই বৃদ্ধ দম্পতি সেখানে বসবাস করছেন।

এ বিষয়ে বকশীগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি আগে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের জানানো হয়নি। জানলে আগেই প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া যেত। এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পৌরসভার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহায়তার সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share this news as a Photo Card