নিউইয়র্ক ০১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাগড়াছড়ির ভাইরাল ‘জুমপাহাড়’

  • আপডেটের সময় : ০৬:২১:০১ অপরাহ্ণ, শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
  • ১৪ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ, পাহাড়চূড়ায় ঝিরঝিরে বাতাস আর দিগন্তজোড়া সবুজ জুমধানের দোলা—প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ‘ভাইরাল জুমপাহাড়’ এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের নতুন আকর্ষণ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওর মাধ্যমে আলোচনায় আসে এই জুমপাহাড়। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন, কেউ আবার ক্যামেরাবন্দি করছেন পাহাড়ের অপরূপ রূপ।

পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের প্রধান জীবিকা জুমচাষ। প্রতি বছর মার্চ থেকে জুনের মধ্যে পাহাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে প্রথম বৃষ্টির সঙ্গে ধান, ভুট্টা, তুলা, তিলসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করা হয়। জুমচাষের পুরো প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষ সবাই অংশ নেন। ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত অনেক পরিবার পাহাড়ের ওপর বাঁশ ও ছনের তৈরি অস্থায়ী জুমঘরেই বসবাস করেন।

লক্ষ্মীছড়ির ভাইরাল জুমপাহাড়ও এমনই একটি জুমখেত। কয়েকটি পাহাড়ের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়জুড়ে বিস্তৃত সবুজ জুমধানের ক্ষেত। পাহাড়চূড়ায় রয়েছে ছোট্ট একটি বাঁশ-ছনের জুমঘর। পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত সবুজ ধানের চারা বাতাসে দুলতে থাকে, যা দূর থেকে দেখতে অনেকটা সবুজ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মনে হয়। আর মাথার ওপরে নীল আকাশ আর ভাসমান সাদা মেঘ যেন প্রকৃতির তৈরি এক বিশাল ছাদ।

সকাল কিংবা গোধূলির আলোয় এই পাহাড়ের সৌন্দর্য আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।

স্থানীয় তরুণ রুহুল আমীন নিজের ভালো লাগা থেকে মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেন। অল্প সময়েই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থেকেই অচেনা-অজানা এই পাহাড়ে বাড়তে থাকে পর্যটকদের আনাগোনা।

রুহুল আমীন বলেন, নিজের ভালো লাগা থেকেই ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। এটি এতটা জনপ্রিয় হবে ভাবিনি। এখন প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসছেন।

তিনি জানান, পর্যটকদের কারণে জুমখেত বা পরিবেশের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণদের নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। তারা জুমঘরের চারপাশে বেড়া দিয়েছেন এবং দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন। শুধু শুক্রবারই প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ পর্যটক সেখানে ঘুরতে আসেন।

লক্ষ্মীছড়ির জুর্গাছড়ি-বুক্কাছড়া এলাকায় অবস্থিত এই জুমপাহাড়ে যেতে হলে লক্ষ্মীছড়ি বাজার থেকে মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পশ্চিম জুর্গাছড়ি পর্যন্ত যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা, উঁচুনিচু ও বর্ষায় কর্দমাক্ত পথ হেঁটে পাহাড়ে পৌঁছাতে হয়।

চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসা আবীর মাসুম বলেন, কাদামাখা পথ পাড়ি দিতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রকৃতির যে সৌন্দর্য দেখেছি, তাতে সব কষ্ট ভুলে গেছি।

জুমপাহাড়ে প্রবেশে জনপ্রতি ৩০ টাকা করে ফি নেওয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যরা এই অর্থ সংগ্রহ করেন। রুহুল আমীন জানান, সংগৃহীত অর্থের অর্ধেক দেওয়া হয় জুমচাষি চাকমা পরিবারকে। বাকি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় করা হয়।

তবে পর্যটকের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুমপাহাড়কে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষের অভিযোগ, অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে জুমখেতের ক্ষতি হচ্ছে এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তারা সেখানে পর্যটকের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুমপাহাড়ের ভিডিও দেখেছি। জায়গাটি খুবই সুন্দর। তবে এখনো সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আগামী সপ্তাহে সরেজমিনে পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

খাগড়াছড়ির ভাইরাল ‘জুমপাহাড়’

আপডেটের সময় : ০৬:২১:০১ অপরাহ্ণ, শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬

নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ, পাহাড়চূড়ায় ঝিরঝিরে বাতাস আর দিগন্তজোড়া সবুজ জুমধানের দোলা—প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ‘ভাইরাল জুমপাহাড়’ এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের নতুন আকর্ষণ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওর মাধ্যমে আলোচনায় আসে এই জুমপাহাড়। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন, কেউ আবার ক্যামেরাবন্দি করছেন পাহাড়ের অপরূপ রূপ।

পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের প্রধান জীবিকা জুমচাষ। প্রতি বছর মার্চ থেকে জুনের মধ্যে পাহাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে প্রথম বৃষ্টির সঙ্গে ধান, ভুট্টা, তুলা, তিলসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করা হয়। জুমচাষের পুরো প্রক্রিয়ায় নারী-পুরুষ সবাই অংশ নেন। ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত অনেক পরিবার পাহাড়ের ওপর বাঁশ ও ছনের তৈরি অস্থায়ী জুমঘরেই বসবাস করেন।

লক্ষ্মীছড়ির ভাইরাল জুমপাহাড়ও এমনই একটি জুমখেত। কয়েকটি পাহাড়ের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়জুড়ে বিস্তৃত সবুজ জুমধানের ক্ষেত। পাহাড়চূড়ায় রয়েছে ছোট্ট একটি বাঁশ-ছনের জুমঘর। পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত সবুজ ধানের চারা বাতাসে দুলতে থাকে, যা দূর থেকে দেখতে অনেকটা সবুজ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মনে হয়। আর মাথার ওপরে নীল আকাশ আর ভাসমান সাদা মেঘ যেন প্রকৃতির তৈরি এক বিশাল ছাদ।

সকাল কিংবা গোধূলির আলোয় এই পাহাড়ের সৌন্দর্য আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।

স্থানীয় তরুণ রুহুল আমীন নিজের ভালো লাগা থেকে মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেন। অল্প সময়েই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থেকেই অচেনা-অজানা এই পাহাড়ে বাড়তে থাকে পর্যটকদের আনাগোনা।

রুহুল আমীন বলেন, নিজের ভালো লাগা থেকেই ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। এটি এতটা জনপ্রিয় হবে ভাবিনি। এখন প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসছেন।

তিনি জানান, পর্যটকদের কারণে জুমখেত বা পরিবেশের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণদের নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। তারা জুমঘরের চারপাশে বেড়া দিয়েছেন এবং দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন। শুধু শুক্রবারই প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ পর্যটক সেখানে ঘুরতে আসেন।

লক্ষ্মীছড়ির জুর্গাছড়ি-বুক্কাছড়া এলাকায় অবস্থিত এই জুমপাহাড়ে যেতে হলে লক্ষ্মীছড়ি বাজার থেকে মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পশ্চিম জুর্গাছড়ি পর্যন্ত যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা, উঁচুনিচু ও বর্ষায় কর্দমাক্ত পথ হেঁটে পাহাড়ে পৌঁছাতে হয়।

চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসা আবীর মাসুম বলেন, কাদামাখা পথ পাড়ি দিতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রকৃতির যে সৌন্দর্য দেখেছি, তাতে সব কষ্ট ভুলে গেছি।

জুমপাহাড়ে প্রবেশে জনপ্রতি ৩০ টাকা করে ফি নেওয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যরা এই অর্থ সংগ্রহ করেন। রুহুল আমীন জানান, সংগৃহীত অর্থের অর্ধেক দেওয়া হয় জুমচাষি চাকমা পরিবারকে। বাকি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় করা হয়।

তবে পর্যটকের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুমপাহাড়কে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষের অভিযোগ, অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে জুমখেতের ক্ষতি হচ্ছে এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তারা সেখানে পর্যটকের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুমপাহাড়ের ভিডিও দেখেছি। জায়গাটি খুবই সুন্দর। তবে এখনো সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আগামী সপ্তাহে সরেজমিনে পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share this news as a Photo Card