নিউইয়র্ক ০৮:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গভীর রাতে কলকাতার সেই হোটেলে যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে

  • আপডেটের সময় : ০৭:০১:৩২ অপরাহ্ণ, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
  • ৫ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন নিহত এবং ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। প্রাণ হারানো ব্যক্তিরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার (১৯ আগস্ট) কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে শিখা ইন হোটেলে রাত ২টার দিকে আগুন লাগে।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তৃতীয় তলার অন্তত চারটি কক্ষে। পরে ধোঁয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে এর মধ্যেই হোটেলের একটি অংশ পুড়ে যায় এবং প্রাণ হারান ৯ জন।

স্থানীয়রা জানান, আগুনের সময় হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে অনেকেই ঘুমিয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে আগুনের শিখা খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না, শুধু কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যাচ্ছিল। ফলে আগুনের বিষয়টি বুঝতে এবং নিরাপদে বের হয়ে আসতে অনেকেরই সময় লেগে যায়। ঘন ধোঁয়ার কারণে অনেকে বের হওয়ার পথও খুঁজে পাননি।

হোটেলটির ভবনটি পাঁচতলা এবং প্রতিটি তলাতেই বিভিন্ন হোটেল রয়েছে বলে জানা গেছে। ভবনের কোনো তলাতেই যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি হোটেলটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ বলে অভিযোগ উঠেছে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর এ কারণে হোটেলের ভেতরে হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বাইরে থাকা ডেকোরেশনের অংশ ভেঙে মই দিয়ে হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর একে একে আটকে পড়াদের উদ্ধারের কাজ শুরু হয়। একইসঙ্গে হোটেলের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া বের করে দেয়ার কাজও করা হয়। এখন পর্যন্ত ভবনটি থেকে প্রায় ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অনেকেই অসুস্থ ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

আহতদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এসএসএম হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। নিহতদের শরীরে পোড়ার চিহ্ন থাকলেও চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, আগুনের চেয়ে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রাথমিকভাবে হোটেলের একটি এসি থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।

ঘটনাস্থল মির্জা গালিব স্ট্রিট কলকাতার নিউ মার্কেটের একেবারে পাশেই অবস্থিত। নিউ মার্কেটের পেছনের অংশ এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি প্রধান গলি সরাসরি মির্জা গালিব স্ট্রিটের সঙ্গে যুক্ত। এ এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদেরও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।

ঘটনার পর পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। হোটেলের মালিক ও কর্মীদের অনেকে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। ফলে হোটেলে থাকা আবাসিকদের তালিকা সংগ্রহ এবং তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। 

ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হোটেলটির পাশের বিল্ডিংয়েই ফায়ার ব্রিগেডের একটি বড় অফিস রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের অফিসের এত কাছে থাকা সত্ত্বেও হোটেলগুলোতে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন ছিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


নিউ মার্কেট হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানায়, তারা প্রতিবছর হোটেলগুলোর নিরাপত্তা অডিট করে থাকে। তবে গত এক বছর ধরে নির্বাচনকালীন ব্যস্ততার কারণে সেই নিরাপত্তা অডিট সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়টিও এখন তদন্তের আওতায় আসছে।

জানা যায়, হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থানকারী বাংলাদেশি, বিদেশি ও স্থানীয় নাগরিকদের তথ্য থাকার কথা থাকলেও ঘটনার পর সেই তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সেক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, আগুনের সময় দ্রুত ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সরু গলি ও সংকীর্ণ সিঁড়ির কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছিল। আগুনের সময় অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের দাবি, আগুন লাগার পরেও হোটেল কর্তৃপক্ষের কারও দেখা পাওয়া যায়নি। এমনি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল না। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রারা হোটেল ছেড়ে বার হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোন রাস্তা দিয়ে বার হবেন, ধোঁয়ায় তা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। 

স্থানীয় একজন বলেন, ফায়ার সার্ভিস না এলে আমরাও হয়ত বাঁচতে পারতাম না!

তথ্য সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

গভীর রাতে কলকাতার সেই হোটেলে যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে

১৯ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

গভীর রাতে কলকাতার সেই হোটেলে যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে

আপডেটের সময় : ০৭:০১:৩২ অপরাহ্ণ, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন নিহত এবং ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। প্রাণ হারানো ব্যক্তিরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার (১৯ আগস্ট) কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে শিখা ইন হোটেলে রাত ২টার দিকে আগুন লাগে।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তৃতীয় তলার অন্তত চারটি কক্ষে। পরে ধোঁয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে এর মধ্যেই হোটেলের একটি অংশ পুড়ে যায় এবং প্রাণ হারান ৯ জন।

স্থানীয়রা জানান, আগুনের সময় হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে অনেকেই ঘুমিয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে আগুনের শিখা খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না, শুধু কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যাচ্ছিল। ফলে আগুনের বিষয়টি বুঝতে এবং নিরাপদে বের হয়ে আসতে অনেকেরই সময় লেগে যায়। ঘন ধোঁয়ার কারণে অনেকে বের হওয়ার পথও খুঁজে পাননি।

হোটেলটির ভবনটি পাঁচতলা এবং প্রতিটি তলাতেই বিভিন্ন হোটেল রয়েছে বলে জানা গেছে। ভবনের কোনো তলাতেই যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি হোটেলটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ বলে অভিযোগ উঠেছে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর এ কারণে হোটেলের ভেতরে হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বাইরে থাকা ডেকোরেশনের অংশ ভেঙে মই দিয়ে হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর একে একে আটকে পড়াদের উদ্ধারের কাজ শুরু হয়। একইসঙ্গে হোটেলের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া বের করে দেয়ার কাজও করা হয়। এখন পর্যন্ত ভবনটি থেকে প্রায় ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অনেকেই অসুস্থ ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

আহতদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এসএসএম হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। নিহতদের শরীরে পোড়ার চিহ্ন থাকলেও চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, আগুনের চেয়ে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রাথমিকভাবে হোটেলের একটি এসি থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।

ঘটনাস্থল মির্জা গালিব স্ট্রিট কলকাতার নিউ মার্কেটের একেবারে পাশেই অবস্থিত। নিউ মার্কেটের পেছনের অংশ এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি প্রধান গলি সরাসরি মির্জা গালিব স্ট্রিটের সঙ্গে যুক্ত। এ এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদেরও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।

ঘটনার পর পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। হোটেলের মালিক ও কর্মীদের অনেকে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। ফলে হোটেলে থাকা আবাসিকদের তালিকা সংগ্রহ এবং তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। 

ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হোটেলটির পাশের বিল্ডিংয়েই ফায়ার ব্রিগেডের একটি বড় অফিস রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের অফিসের এত কাছে থাকা সত্ত্বেও হোটেলগুলোতে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন ছিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


নিউ মার্কেট হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানায়, তারা প্রতিবছর হোটেলগুলোর নিরাপত্তা অডিট করে থাকে। তবে গত এক বছর ধরে নির্বাচনকালীন ব্যস্ততার কারণে সেই নিরাপত্তা অডিট সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়টিও এখন তদন্তের আওতায় আসছে।

জানা যায়, হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থানকারী বাংলাদেশি, বিদেশি ও স্থানীয় নাগরিকদের তথ্য থাকার কথা থাকলেও ঘটনার পর সেই তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সেক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, আগুনের সময় দ্রুত ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সরু গলি ও সংকীর্ণ সিঁড়ির কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছিল। আগুনের সময় অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের দাবি, আগুন লাগার পরেও হোটেল কর্তৃপক্ষের কারও দেখা পাওয়া যায়নি। এমনি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল না। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রারা হোটেল ছেড়ে বার হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোন রাস্তা দিয়ে বার হবেন, ধোঁয়ায় তা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। 

স্থানীয় একজন বলেন, ফায়ার সার্ভিস না এলে আমরাও হয়ত বাঁচতে পারতাম না!

তথ্য সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

Share this news as a Photo Card