নিউইয়র্ক ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোতে হতাশা

  • আপডেটের সময় : ০৭:১৪:২৮ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
  • ৬ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও অনেক শহীদ পরিবারের অভিযোগ, রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কিছু কিছু এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমআইএস তথ্য অনুযায়ী জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সারা দেশে সরকারি গেজেটে শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন। এসব শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার চিত্র।

জুলাইয়ের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল দ্রুত বিচার। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির। তিনি বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে জীবন দিলেও এখনো সেই বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা এখনো রয়ে গেছে।

রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে ১৮ জুলাই গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল (বিইউপি) এমবিএর শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে মুগ্ধের শহীদ হওয়ার ঘটনা আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়ে। ‘পানি লাগবে পানি’—এই স্লোগান মুখে মুখে।

গতকাল মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, শহীদ মুগ্ধের রক্ত ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার, যেখানে থাকবে না কোনো দলাদলি, থাকবে না চাঁদাবাজি, থাকবে না দখলবাজি। অন্যায় ও অত্যাচার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচারের রায় বাস্তবায়ন না হলে শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে। 

ঢাকায় ধানমন্ডির ৩ নম্বর রোডে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আছাদুজ্জামান খান কামালের সরকারি ভবনের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলি করলে সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয় নিহত হয়। গতকাল তাহির জামান প্রিয়র বাবা আবু হেনা মোস্তফা জামান বলেন, ‘আমি একজন একমাত্র সন্তানহারা বিপত্নীক বাবা। পাঁচ বছর বয়স থেকে প্রিয়কে কোলেপিঠে করে একাই মানুষ করেছি। জুলাই আন্দোলনে সন্তান শহীদ হওয়ায় এই বৃদ্ধ বয়সে আমাকে দেখার কেউ রইল না। সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে মোস্তফা জামান বলেন, ছেলে হারিয়ে আমি মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। এর মধ্যে প্রিয়র মা কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। পরে আমার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আমাকে ১ লাখ টাকা এককালীন ও মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা দেয়। এই ৫ হাজার টাকায় আমি এখন রংপুরের বাসায় দিন যাপন করছি। 

গুলিতে নিহত প্রথম নারী শহীদ নাঈমা সুলতানার বাবা-মাও বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার ভিডিও ও বিভিন্ন আলামত থাকার পরও বিচার দৃশ্যমান হয়নি। সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তার কিছু অংশের প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে। অন্যদিকে, শাহবাগে গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী গোলাম নাফিজের বাবা গোলাম রহমান বলেন, তার ছেলে এমন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেয়নি যেখানে এখনো মানুষ খুন হবে, চাঁদাবাজি চলবে।

১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে কর্তব্যরত অবস্থায় ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক মেহেদি হাসান নিহত হয়। গতকাল তার ভাই জাহিদ হাসান আশিক বলেন, মেহেদির দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা শঙ্কিত। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে মেহেদীর পরিবার কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি।

শনির আখড়ায় নিহত ইউসুফ সানোয়ারের বোন বিউটি বেগম অভিযোগ করেন, শুরুতে অনেকে পাশে থাকলেও এখন তাদের খোঁজ নেন না। বিচার হবে কি না, তা নিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। শহীদ পরিবারের অনেকের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে শহীদদের জন্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বাস্তবায়নের গতি ধীর।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘এক দফা’ অসহযোগ কর্মসূচির দিনে সিলেটের গোলাপগঞ্জ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেদিনের এই হামলায় শহীদ হন নাজমুল, সানি, তাজউদ্দীন, মিনহাজ, গৌছ উদ্দীন, জয় আহমদ, কামরুল ইসলাম পাভেল। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ার বিষয়ে শহীদ কামরুল ইসলাম পাভেলের বাবা রফিক উদ্দিন জানান, তার ছেলে পবিত্র কুরআনের হাফেজ ও অত্যন্ত নিরহ ছিল। তিনি মামলা করলেও এখনো কোনো বিচার দেখতে পাননি এবং অনেক আসামি ইতিমধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছে।

একই চিত্র বগুড়ায়। জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে নিহত বগুড়ার সুলতানগঞ্জ পাড়ার উপশহর পথ পাবলিক স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী এবং মুদি দোকানি জিয়াউর রহমান ও রোকেয়া বেগমের ছোট ছেলে শহীদ জুনাইদ ইসলাম রাতুল (১৩)-এর পরিবারও দিন কাটাচ্ছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তায়। শহীদ পরিবারগুলোর বক্তব্য, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন করতে হবে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

দুই বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোতে হতাশা

আপডেটের সময় : ০৭:১৪:২৮ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও অনেক শহীদ পরিবারের অভিযোগ, রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কিছু কিছু এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমআইএস তথ্য অনুযায়ী জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সারা দেশে সরকারি গেজেটে শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন। এসব শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার চিত্র।

জুলাইয়ের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল দ্রুত বিচার। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির। তিনি বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে জীবন দিলেও এখনো সেই বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা এখনো রয়ে গেছে।

রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে ১৮ জুলাই গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল (বিইউপি) এমবিএর শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে মুগ্ধের শহীদ হওয়ার ঘটনা আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়ে। ‘পানি লাগবে পানি’—এই স্লোগান মুখে মুখে।

গতকাল মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, শহীদ মুগ্ধের রক্ত ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার, যেখানে থাকবে না কোনো দলাদলি, থাকবে না চাঁদাবাজি, থাকবে না দখলবাজি। অন্যায় ও অত্যাচার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচারের রায় বাস্তবায়ন না হলে শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে। 

ঢাকায় ধানমন্ডির ৩ নম্বর রোডে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আছাদুজ্জামান খান কামালের সরকারি ভবনের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলি করলে সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয় নিহত হয়। গতকাল তাহির জামান প্রিয়র বাবা আবু হেনা মোস্তফা জামান বলেন, ‘আমি একজন একমাত্র সন্তানহারা বিপত্নীক বাবা। পাঁচ বছর বয়স থেকে প্রিয়কে কোলেপিঠে করে একাই মানুষ করেছি। জুলাই আন্দোলনে সন্তান শহীদ হওয়ায় এই বৃদ্ধ বয়সে আমাকে দেখার কেউ রইল না। সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে মোস্তফা জামান বলেন, ছেলে হারিয়ে আমি মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। এর মধ্যে প্রিয়র মা কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। পরে আমার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আমাকে ১ লাখ টাকা এককালীন ও মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা দেয়। এই ৫ হাজার টাকায় আমি এখন রংপুরের বাসায় দিন যাপন করছি। 

গুলিতে নিহত প্রথম নারী শহীদ নাঈমা সুলতানার বাবা-মাও বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার ভিডিও ও বিভিন্ন আলামত থাকার পরও বিচার দৃশ্যমান হয়নি। সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তার কিছু অংশের প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে। অন্যদিকে, শাহবাগে গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী গোলাম নাফিজের বাবা গোলাম রহমান বলেন, তার ছেলে এমন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেয়নি যেখানে এখনো মানুষ খুন হবে, চাঁদাবাজি চলবে।

১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে কর্তব্যরত অবস্থায় ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক মেহেদি হাসান নিহত হয়। গতকাল তার ভাই জাহিদ হাসান আশিক বলেন, মেহেদির দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা শঙ্কিত। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে মেহেদীর পরিবার কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি।

শনির আখড়ায় নিহত ইউসুফ সানোয়ারের বোন বিউটি বেগম অভিযোগ করেন, শুরুতে অনেকে পাশে থাকলেও এখন তাদের খোঁজ নেন না। বিচার হবে কি না, তা নিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। শহীদ পরিবারের অনেকের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে শহীদদের জন্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বাস্তবায়নের গতি ধীর।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘এক দফা’ অসহযোগ কর্মসূচির দিনে সিলেটের গোলাপগঞ্জ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেদিনের এই হামলায় শহীদ হন নাজমুল, সানি, তাজউদ্দীন, মিনহাজ, গৌছ উদ্দীন, জয় আহমদ, কামরুল ইসলাম পাভেল। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ার বিষয়ে শহীদ কামরুল ইসলাম পাভেলের বাবা রফিক উদ্দিন জানান, তার ছেলে পবিত্র কুরআনের হাফেজ ও অত্যন্ত নিরহ ছিল। তিনি মামলা করলেও এখনো কোনো বিচার দেখতে পাননি এবং অনেক আসামি ইতিমধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছে।

একই চিত্র বগুড়ায়। জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে নিহত বগুড়ার সুলতানগঞ্জ পাড়ার উপশহর পথ পাবলিক স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী এবং মুদি দোকানি জিয়াউর রহমান ও রোকেয়া বেগমের ছোট ছেলে শহীদ জুনাইদ ইসলাম রাতুল (১৩)-এর পরিবারও দিন কাটাচ্ছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তায়। শহীদ পরিবারগুলোর বক্তব্য, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন করতে হবে।

Share this news as a Photo Card