নিউইয়র্ক ০৬:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুল্কের চাপে দুর্বল দেশকে পণ্য কিনতে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র: রেহমান সোবহান

  • আপডেটের সময় : ০২:০৩:২৫ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব বাণিজ্য আবার ঔপনিবেশিক যুগের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তার মতে, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো শুল্ক ও রাজনৈতিক চাপ ব্যবহার করে দুর্বল দেশগুলোকে নিজেদের পণ্য কিনতে বাধ্য করছে।

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।

রেহমান সোবহান বলেন, বাণিজ্যে ঔপনিবেশিক মডেলে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শুল্কের চাপে অনেক দেশকে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো দেশকে নিজের পণ্য কিনতে বাধ্য করার অর্থ হলো, সেই দেশ আর প্রতিযোগিতামূলকভাবে পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও শুল্ক ব্যবহার করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করায় ব্রাজিল, কানাডা, চীন এবং এমনকি ভারতকেও তারা চাপের মধ্যে রাখছে। তার মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা করে পণ্য বিক্রির বদলে রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে বাজার তৈরি করার চেষ্টা চলছে।

রেহমান সোবহানের মতে, এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানের বিপরীতে এটি পাশ্চাত্যের এক ধরনের বিকৃত প্রতিক্রিয়া। উপনিবেশবাদের সময়ে দেশ দখলের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন সরাসরি দখলের বদলে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতির মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এশিয়ার উত্থান ঘটেছে মূলত বাজারের নিয়মে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এশিয়া এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ ও মূলধনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর পশ্চিমা বিশ্বের ওপর আগের মতো নির্ভর করতে হচ্ছে না।

উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলির সুরক্ষাবাদী নীতির প্রসঙ্গ টেনে রেহমান সোবহান বলেন, বাজার সুরক্ষার মাধ্যমে শিল্প পুনরুজ্জীবনের এমন কৌশল বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির জন্য এখন অচল। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তবে এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান থামানো কঠিন বলে মনে করেন তিনি। ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে চীন এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে চলতি মূল্যের জিডিপির হিসাবেও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এই পরিবর্তনে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। চীন ও ভারতের মতো দুটি বড় অর্থনীতির প্রতিবেশী বাংলাদেশ। ফলে ভৌগোলিক অবস্থানও দেশের জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু সেই সুযোগ এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আমদানি পণ্যের বড় অংশ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এলেও রপ্তানি কয়েকটি বাজারের মধ্যে সীমিত। দেশের উৎপাদন খাত এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এসব দেশে তৈরি হওয়া নতুন বাজার ও রপ্তানি সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি।

এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন রেহমান সোবহান। তার মতে, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। ভবিষ্যতের সুযোগ কাজে লাগাতে কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন– দুই ক্ষেত্রেই দক্ষতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরে নয়, দেশের স্থলভৌগোলিক অবস্থানেও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান। পদ্মা ও যমুনা সেতু ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। একসময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এশিয়ার ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে। বাংলাদেশও তাদের বাজার, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে উল্লেখ করেন রেহমান সোবহান। এ সংঘাতের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে সমালোচনাও করেন তিনি।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর পঞ্চম আসরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনের এ আন্তর্জাতিক আয়োজনে শতাধিক দেশ থেকে প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি ও এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

যুক্তরাষ্ট্রে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার, নিখোঁজ ৬

নিউইয়র্ক থেকে ইরানের দুই কূটনীতিককে বহিষ্কার করল যুক্তরাষ্ট্র

০৪ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

শুল্কের চাপে দুর্বল দেশকে পণ্য কিনতে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র: রেহমান সোবহান

আপডেটের সময় : ০২:০৩:২৫ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্ব বাণিজ্য আবার ঔপনিবেশিক যুগের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তার মতে, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো শুল্ক ও রাজনৈতিক চাপ ব্যবহার করে দুর্বল দেশগুলোকে নিজেদের পণ্য কিনতে বাধ্য করছে।

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।

রেহমান সোবহান বলেন, বাণিজ্যে ঔপনিবেশিক মডেলে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শুল্কের চাপে অনেক দেশকে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো দেশকে নিজের পণ্য কিনতে বাধ্য করার অর্থ হলো, সেই দেশ আর প্রতিযোগিতামূলকভাবে পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও শুল্ক ব্যবহার করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করায় ব্রাজিল, কানাডা, চীন এবং এমনকি ভারতকেও তারা চাপের মধ্যে রাখছে। তার মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা করে পণ্য বিক্রির বদলে রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে বাজার তৈরি করার চেষ্টা চলছে।

রেহমান সোবহানের মতে, এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানের বিপরীতে এটি পাশ্চাত্যের এক ধরনের বিকৃত প্রতিক্রিয়া। উপনিবেশবাদের সময়ে দেশ দখলের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন সরাসরি দখলের বদলে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতির মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এশিয়ার উত্থান ঘটেছে মূলত বাজারের নিয়মে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এশিয়া এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ ও মূলধনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর পশ্চিমা বিশ্বের ওপর আগের মতো নির্ভর করতে হচ্ছে না।

উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলির সুরক্ষাবাদী নীতির প্রসঙ্গ টেনে রেহমান সোবহান বলেন, বাজার সুরক্ষার মাধ্যমে শিল্প পুনরুজ্জীবনের এমন কৌশল বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির জন্য এখন অচল। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তবে এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান থামানো কঠিন বলে মনে করেন তিনি। ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে চীন এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে চলতি মূল্যের জিডিপির হিসাবেও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এই পরিবর্তনে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। চীন ও ভারতের মতো দুটি বড় অর্থনীতির প্রতিবেশী বাংলাদেশ। ফলে ভৌগোলিক অবস্থানও দেশের জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু সেই সুযোগ এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আমদানি পণ্যের বড় অংশ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এলেও রপ্তানি কয়েকটি বাজারের মধ্যে সীমিত। দেশের উৎপাদন খাত এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এসব দেশে তৈরি হওয়া নতুন বাজার ও রপ্তানি সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি।

এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন রেহমান সোবহান। তার মতে, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। ভবিষ্যতের সুযোগ কাজে লাগাতে কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন– দুই ক্ষেত্রেই দক্ষতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরে নয়, দেশের স্থলভৌগোলিক অবস্থানেও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান। পদ্মা ও যমুনা সেতু ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। একসময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এশিয়ার ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে। বাংলাদেশও তাদের বাজার, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে উল্লেখ করেন রেহমান সোবহান। এ সংঘাতের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে সমালোচনাও করেন তিনি।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর পঞ্চম আসরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনের এ আন্তর্জাতিক আয়োজনে শতাধিক দেশ থেকে প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি ও এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।

Share this news as a Photo Card