নিউইয়র্ক ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করায় হাসিনার পতন

  • আপডেটের সময় : ০৭:১৩:৪৭ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
  • ৬ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আগের রাতে, অর্থাৎ ৪ আগস্ট (রোববার) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার অধীনস্থ জেনারেলদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, দেশে জারি থাকা কারফিউ কার্যকর করতে সেনাসদস্যরা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাবেন না।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুজন কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ে অবহিত এক ভারতীয় কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

ভারতীয় ওই কর্মকর্তার মতে, বৈঠকের পরপরই সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ‘লকডাউন’ বা কারফিউ মানতে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করার জন্য সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগ করবে না। এই বার্তার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, দীর্ঘ ১৫ বছর দেশ শাসন করা শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পেছনে সেনাবাহিনীর এই সমর্থন প্রত্যাহারই যে প্রধান কারণ ছিল, রয়টার্সের প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। এর আগে দেশব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতায় অন্তত ৯১ জনের মৃত্যু হয়, যা জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।

সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী রয়টার্সকে রোববার সন্ধ্যার ওই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি এটিকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সেনাবাহিনীর ‘নিয়মিত বৈঠক’ বলে উল্লেখ করেন এবং বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

গত সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রয়টার্স চারজন সেনা কর্মকর্তাসহ ১০ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে। সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ এবং রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ২৪১ জনের প্রাণহানির পর ‘যে কোনো মূল্যে’ শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার বিষয়টি সেনাবাহিনীর জন্য অবাস্তব হয়ে পড়েছিল।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন রয়টার্সকে বলেন, ‘সেনাদের মাঝে অনেক অস্বস্তি কাজ করছিল। তারা মাঠে ছিল এবং দেখছিল কী ঘটছে। এ কারণে তারা হয়তো সেনাপ্রধানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।’

সে বছরের ৩ আগস্ট টাউন হল ভবনে হাজারো সেনাসদস্যের উদ্দেশে সেনাপ্রধান যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখানেও শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল বলে উপস্থিত সেনারা জানিয়েছেন। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র তখন জানিয়েছিলেন, সেনাপ্রধান নির্দেশ দিয়েছেন মানুষের জানমাল রক্ষা করতে হবে এবং সেনাদের চরম ধৈর্য ধারণ করতে হবে। মূলত ওই দিনই প্রথমবারের মতো আভাস পাওয়া যায় যে, সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করবে না, যা শেখ হাসিনাকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়।৫ আগস্ট কারফিউ ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছিলেন সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহেদুল আনাম খান। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘সেনারা আমাদের কোনো বাধা দেয়নি। তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।’ তবে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার সুযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতামত জানিয়ে বলেন, ‘তাকে নিরাপদে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি। এটা বোকামি হয়েছে।’

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করায় হাসিনার পতন

আপডেটের সময় : ০৭:১৩:৪৭ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আগের রাতে, অর্থাৎ ৪ আগস্ট (রোববার) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার অধীনস্থ জেনারেলদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, দেশে জারি থাকা কারফিউ কার্যকর করতে সেনাসদস্যরা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাবেন না।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুজন কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ে অবহিত এক ভারতীয় কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

ভারতীয় ওই কর্মকর্তার মতে, বৈঠকের পরপরই সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ‘লকডাউন’ বা কারফিউ মানতে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করার জন্য সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগ করবে না। এই বার্তার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, দীর্ঘ ১৫ বছর দেশ শাসন করা শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পেছনে সেনাবাহিনীর এই সমর্থন প্রত্যাহারই যে প্রধান কারণ ছিল, রয়টার্সের প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। এর আগে দেশব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতায় অন্তত ৯১ জনের মৃত্যু হয়, যা জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।

সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী রয়টার্সকে রোববার সন্ধ্যার ওই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি এটিকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সেনাবাহিনীর ‘নিয়মিত বৈঠক’ বলে উল্লেখ করেন এবং বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

গত সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রয়টার্স চারজন সেনা কর্মকর্তাসহ ১০ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে। সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ এবং রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ২৪১ জনের প্রাণহানির পর ‘যে কোনো মূল্যে’ শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার বিষয়টি সেনাবাহিনীর জন্য অবাস্তব হয়ে পড়েছিল।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন রয়টার্সকে বলেন, ‘সেনাদের মাঝে অনেক অস্বস্তি কাজ করছিল। তারা মাঠে ছিল এবং দেখছিল কী ঘটছে। এ কারণে তারা হয়তো সেনাপ্রধানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।’

সে বছরের ৩ আগস্ট টাউন হল ভবনে হাজারো সেনাসদস্যের উদ্দেশে সেনাপ্রধান যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখানেও শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল বলে উপস্থিত সেনারা জানিয়েছেন। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র তখন জানিয়েছিলেন, সেনাপ্রধান নির্দেশ দিয়েছেন মানুষের জানমাল রক্ষা করতে হবে এবং সেনাদের চরম ধৈর্য ধারণ করতে হবে। মূলত ওই দিনই প্রথমবারের মতো আভাস পাওয়া যায় যে, সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করবে না, যা শেখ হাসিনাকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়।৫ আগস্ট কারফিউ ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছিলেন সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহেদুল আনাম খান। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘সেনারা আমাদের কোনো বাধা দেয়নি। তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।’ তবে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার সুযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতামত জানিয়ে বলেন, ‘তাকে নিরাপদে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি। এটা বোকামি হয়েছে।’

Share this news as a Photo Card