নিউইয়র্ক ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ লাখ টাকা মুক্তিপণে ফিরলেন মোস্তাক, বাহারছড়া পাহাড়ে আতঙ্কে কেটেছে ৩ দিন

  • আপডেটের সময় : ০৪:৫৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
  • ১ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের টেকনাফে নিখোঁজের তিন দিন পর ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন মোস্তাক আহমদ (৩১) নামের এক দর্জি দোকানদার। পরিবারের দাবি, তাঁকে অপহরণ করে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে মুক্তিপণের টাকা পাওয়ার পর শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মোস্তাক আহমদ টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব পানখালী ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আব্দুস শুক্কুরের ছেলে। হ্নীলা বাজারে তাঁর একটি দর্জির দোকান রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৫ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে নিখোঁজ হন মোস্তাক। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিবারের কাছে ফোন করে জানানো হয়, মোস্তাককে অপহরণ করা হয়েছে। প্রথমে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হলেও পরে বিভিন্ন সময় ৫০ লাখ ও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকায় তাঁকে ছেড়ে দিতে রাজি হয় অপহরণকারীরা।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেলে মোস্তাকের বোন-জামাইসহ স্বজনরা অপহরণকারীদের নির্দেশনা অনুযায়ী বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় যান। সেখানে নির্দিষ্ট স্থানে ৫ লাখ টাকা রেখে আসার পর অপহরণকারীরা টাকা নিয়ে সরে যায়। পরে অন্য একটি স্থান থেকে মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, তিন দিন পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে মোস্তাককে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁকে উদ্ধারের আগের তিন দিন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটে পরিবারের সদস্যদের।

এ সময় অপহরণকারীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পরিবার। ফোনালাপে মোস্তাকের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপহরণকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি টাকা জোগাড় করে দিচ্ছি।’

পরিবারের দাবি, এ সময় অপহরণকারীরা ৫০ লাখ টাকা না দিলে মোস্তাককে হত্যা করার হুমকি দেয়। এমনকি তাঁকে হত্যার জন্য একজন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছে বলেও ফোনে জানানো হয়।

জবাবে মোস্তাকের স্ত্রী বলেন, ‘আমি যতটুকু পারি টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছি। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি এত টাকা কোথায় পাব?’

একপর্যায়ে সন্তানদের কথা উল্লেখ করে স্বামীকে জীবিত ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি। পরে অপহরণকারীরা মোস্তাককে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়। তখন মোস্তাক দ্রুত টাকা জোগাড় করে দিতে স্ত্রীকে অনুরোধ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জানান, তাঁকে হত্যার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করা হবে। স্বামীকে বাঁচাতে প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে হলেও টাকা জোগাড় করতে বলেন তিনি।

এ সময় বিষয়টি কাউকে জানানো হলে মোস্তাককে হত্যা করা হবে বলে অপহরণকারীরা হুমকি দেয় বলেও পরিবারের দাবি।

মোস্তাকের মা হাছান বানু বলেন, ‘ছেলেকে অপহরণের পর আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। অপহরণকারীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করেছে। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর আমার ছেলে বাড়িতে ফিরেছে।’

মোস্তাক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর শাশুড়ি নুর নাহার গত ৫ আগস্ট টেকনাফ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে মোস্তাক আহমদ নিখোঁজ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। জিডি নম্বর ২৭২।

মোস্তাককে উদ্ধারে পরিবারের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাওয়া এক ব্যক্তি জানান, তাঁর বন্ধু মোস্তাক পাওনা টাকা আদায়ের জন্য হ্নীলা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাহারছড়া এলাকার এক ব্যক্তির কাছে যান। পাওনা টাকা নিয়ে ফেরার পথে দুই ব্যক্তি সিএনজিতে থাকা মোস্তাকের মুখ চেপে ধরে তাঁকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায় বলে মোস্তাক জানিয়েছেন।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘শনিবার বিকেল ৫টার দিকে আমি তাঁর বোন-জামাইসহ ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে পাহাড়ি এলাকায় যাই। টাকা দেওয়ার পর রাত ৯টার দিকে মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি, তাঁকে পাহাড়ে আটকে রেখে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।’

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মোস্তাক নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। শনিবার তিনি অপহরণকারীদের কাছ থেকে ফিরে এসেছেন—এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মোস্তাককে কে বা কারা অপহরণ করেছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।’

তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর মুক্তিপণ দিয়ে মোস্তাক পরিবারের কাছে ফিরলেও তাঁকে কারা অপহরণ করেছিল এবং ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

৩৮ বছর পর ফোন করে নিজের দোষ স্বীকার করল খুনি, জট খুলছে রহস্যজনক খুনের

ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত পণ্য অবৈধভাবে ইউরোপে পাচার করছে ইসরায়েল

১১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

৫ লাখ টাকা মুক্তিপণে ফিরলেন মোস্তাক, বাহারছড়া পাহাড়ে আতঙ্কে কেটেছে ৩ দিন

আপডেটের সময় : ০৪:৫৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

কক্সবাজারের টেকনাফে নিখোঁজের তিন দিন পর ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন মোস্তাক আহমদ (৩১) নামের এক দর্জি দোকানদার। পরিবারের দাবি, তাঁকে অপহরণ করে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে মুক্তিপণের টাকা পাওয়ার পর শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মোস্তাক আহমদ টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব পানখালী ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আব্দুস শুক্কুরের ছেলে। হ্নীলা বাজারে তাঁর একটি দর্জির দোকান রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৫ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে নিখোঁজ হন মোস্তাক। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিবারের কাছে ফোন করে জানানো হয়, মোস্তাককে অপহরণ করা হয়েছে। প্রথমে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হলেও পরে বিভিন্ন সময় ৫০ লাখ ও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকায় তাঁকে ছেড়ে দিতে রাজি হয় অপহরণকারীরা।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেলে মোস্তাকের বোন-জামাইসহ স্বজনরা অপহরণকারীদের নির্দেশনা অনুযায়ী বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় যান। সেখানে নির্দিষ্ট স্থানে ৫ লাখ টাকা রেখে আসার পর অপহরণকারীরা টাকা নিয়ে সরে যায়। পরে অন্য একটি স্থান থেকে মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, তিন দিন পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে মোস্তাককে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁকে উদ্ধারের আগের তিন দিন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটে পরিবারের সদস্যদের।

এ সময় অপহরণকারীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পরিবার। ফোনালাপে মোস্তাকের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপহরণকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি টাকা জোগাড় করে দিচ্ছি।’

পরিবারের দাবি, এ সময় অপহরণকারীরা ৫০ লাখ টাকা না দিলে মোস্তাককে হত্যা করার হুমকি দেয়। এমনকি তাঁকে হত্যার জন্য একজন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছে বলেও ফোনে জানানো হয়।

জবাবে মোস্তাকের স্ত্রী বলেন, ‘আমি যতটুকু পারি টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছি। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি এত টাকা কোথায় পাব?’

একপর্যায়ে সন্তানদের কথা উল্লেখ করে স্বামীকে জীবিত ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি। পরে অপহরণকারীরা মোস্তাককে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়। তখন মোস্তাক দ্রুত টাকা জোগাড় করে দিতে স্ত্রীকে অনুরোধ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জানান, তাঁকে হত্যার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করা হবে। স্বামীকে বাঁচাতে প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে হলেও টাকা জোগাড় করতে বলেন তিনি।

এ সময় বিষয়টি কাউকে জানানো হলে মোস্তাককে হত্যা করা হবে বলে অপহরণকারীরা হুমকি দেয় বলেও পরিবারের দাবি।

মোস্তাকের মা হাছান বানু বলেন, ‘ছেলেকে অপহরণের পর আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। অপহরণকারীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করেছে। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর আমার ছেলে বাড়িতে ফিরেছে।’

মোস্তাক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর শাশুড়ি নুর নাহার গত ৫ আগস্ট টেকনাফ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে মোস্তাক আহমদ নিখোঁজ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। জিডি নম্বর ২৭২।

মোস্তাককে উদ্ধারে পরিবারের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাওয়া এক ব্যক্তি জানান, তাঁর বন্ধু মোস্তাক পাওনা টাকা আদায়ের জন্য হ্নীলা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাহারছড়া এলাকার এক ব্যক্তির কাছে যান। পাওনা টাকা নিয়ে ফেরার পথে দুই ব্যক্তি সিএনজিতে থাকা মোস্তাকের মুখ চেপে ধরে তাঁকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায় বলে মোস্তাক জানিয়েছেন।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘শনিবার বিকেল ৫টার দিকে আমি তাঁর বোন-জামাইসহ ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে পাহাড়ি এলাকায় যাই। টাকা দেওয়ার পর রাত ৯টার দিকে মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি, তাঁকে পাহাড়ে আটকে রেখে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।’

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মোস্তাক নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। শনিবার তিনি অপহরণকারীদের কাছ থেকে ফিরে এসেছেন—এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মোস্তাককে কে বা কারা অপহরণ করেছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।’

তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর মুক্তিপণ দিয়ে মোস্তাক পরিবারের কাছে ফিরলেও তাঁকে কারা অপহরণ করেছিল এবং ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

Share this news as a Photo Card