নিউইয়র্ক ০৮:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে না ফেরার দেশে নারী মুক্তিযোদ্ধা ফুলমতি

  • আপডেটের সময় : ১২:৩৭:৪৭ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা গাইবান্ধার রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় শয্যাশায়ী থাকার পর সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতির বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের উত্তরপাড়ায়। তিনি মৃত কুশিরাম সরকার ফসিয়ার স্ত্রী। স্বামী-সন্তান নিয়ে অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় জীবন কাটিয়েছেন তিনি।

দাম্পত্য জীবনে চার ছেলে ও এক মেয়ের মা ছিলেন ফুলমতি। ১৯৮৮ সালে তার স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া মারা যান। এরপর সন্তানদের নিয়ে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন কাটান তিনি।

ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার জানান, তার মা দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তার ডান হাত-পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি অনেকটা শয্যাশায়ী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়। শুক্রবার বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে।

পরিবারের সদস্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে প্রবেশ করে তাকে ঘর থেকে বের করে নির্যাতন করে। মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি বুকে নিয়েই দীর্ঘ জীবন পার করেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে ফুলমতিকে দীর্ঘ ৪৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরনা দেওয়ার পর ২০১৬ সালের মার্চে বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান তিনি। স্বীকৃতি পাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল তাঁর জীবনে।

ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তার স্বীকৃতি মেলে।

বার্ধক্যজনিত কারণে বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, তার চিকিৎসার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী।

এদিকে, ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা ও জেলার মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুলমতি শুধু একজন নারী নন, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার জীবনের নির্যাতন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে প্রশাসনিক তদন্ত সাজানো হতো’

নিরাপদ পানির নিশ্চয়তায় ২৫ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার

০৮ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে না ফেরার দেশে নারী মুক্তিযোদ্ধা ফুলমতি

আপডেটের সময় : ১২:৩৭:৪৭ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা গাইবান্ধার রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় শয্যাশায়ী থাকার পর সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতির বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের উত্তরপাড়ায়। তিনি মৃত কুশিরাম সরকার ফসিয়ার স্ত্রী। স্বামী-সন্তান নিয়ে অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় জীবন কাটিয়েছেন তিনি।

দাম্পত্য জীবনে চার ছেলে ও এক মেয়ের মা ছিলেন ফুলমতি। ১৯৮৮ সালে তার স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া মারা যান। এরপর সন্তানদের নিয়ে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন কাটান তিনি।

ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার জানান, তার মা দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তার ডান হাত-পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি অনেকটা শয্যাশায়ী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়। শুক্রবার বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে।

পরিবারের সদস্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে প্রবেশ করে তাকে ঘর থেকে বের করে নির্যাতন করে। মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি বুকে নিয়েই দীর্ঘ জীবন পার করেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে ফুলমতিকে দীর্ঘ ৪৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরনা দেওয়ার পর ২০১৬ সালের মার্চে বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান তিনি। স্বীকৃতি পাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল তাঁর জীবনে।

ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তার স্বীকৃতি মেলে।

বার্ধক্যজনিত কারণে বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, তার চিকিৎসার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী।

এদিকে, ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা ও জেলার মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুলমতি শুধু একজন নারী নন, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার জীবনের নির্যাতন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Share this news as a Photo Card