নিউইয়র্ক ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজা যুদ্ধের তিন বছর: হারিয়ে গেছে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ

  • আপডেটের সময় : ০১:২০:০৬ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ১ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর গাজায় শুরু হয় ব্যাপক ইসরায়েলি সামরিক অভিযান। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে চলা বিমান ও স্থল হামলায় অবরুদ্ধ উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িঘর, সড়ক, হাসপাতাল ও অন্যান্য অবকাঠামোর বড় অংশই আজ নিশ্চিহ্ন। এদিকে ইসরায়েলে নির্বাচনের তোড়জোড়ের মধ্যেই গতকাল হামলার তৃতীয় বার্ষিকী পালন করা হয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় গত তিন বছরে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ১ হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ফলে প্রায় ২০ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ডে স্বাভাবিক জীবনযাপন এখন বহু দূরের বিষয়। যুদ্ধ গাজার মানুষের জীবনযাপনের মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। অনেকরই আর স্থায়ী কোনো বাড়ি নেই। নেই নির্ভরযোগ্য পানি, বিদ্যুৎ বা যাতায়াতব্যবস্থা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষ জরুরি আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্ৰায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল। এসব আশ্রয়স্থল বৃষ্টি, তীব্র গরম কিংবা অন্য প্রাকৃতিক পরিস্থিতি থেকে খুব বেশি সুরক্ষা দিতে পারে না। বিছানা, আলো, রান্নার সরঞ্জাম ও স্যানিটেশন সুবিধারও সংকট রয়েছে বহু পরিবারের। পানির সংকটও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, আগস্টের শুরুতে ৯১ শতাংশ মূল্যায়ন করা পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার পানির নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।

হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক শিশু তাঁবু ও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করছে। বর্তমানে দুই লাখ শিশু কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। দীর্ঘ সময়ের এই শিক্ষাবিরতিতে শিশুদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ শিক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সব কয়টিই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল চালু আছে। তবে কোনো হাসপাতালই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষার উপকরণ ও জ্বালানির তীব্র সংকট রয়েছে। ক্যানসারের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসাও এতে ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর মাত্র ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আরো কয়েক হাজার রোগীর বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন।

যুদ্ধ শুধু গাজার অবকাঠামো নয়, এর ভৌগোলিক বাস্তবতাও বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে গাজার বিভিন্ন এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষকে ক্রমেই ছোট এলাকায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ গাজার মিশরের সীমান্তবর্তী রাফাহ এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। যুদ্ধের সময় গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ সেখানে গাজায় কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড নেই।

ফলে হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু জ্বালানি, ইঞ্জিন তেল ও যন্ত্রাংশের সংকট পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে মানুষের চলাচলও কঠিন হয়েছে। ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নানা বাধা তৈরি হয়েছে। পানি সংগ্রহ, ফোন চার্জ দেওয়া, রান্না করা কিংবা গোসলের মতো সাধারণ কাজও এখন পরিকল্পনা ও সীমিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের বড় ধাক্কা এসেছে গাজার অর্থনীতিতে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হওয়ায় বহু মানুষ আয় হারিয়েছেন।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ শতাংশে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি কমে দাঁড়ায় মাত্র ২১২ মার্কিন ডলার, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ। কৃষি ও শিল্প উৎপাদনও ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ছয় শতাংশে নেমে এসেছে। নির্মাণ খাতের উৎপাদন নেমেছে মাত্র এক শতাংশে। আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও পণ্যের দাম ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি ছিল। ফলে পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা আরো কমেছে। অনেক পরিবার এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। নগদ অর্থের সংকটও তৈরি হয়েছে। এ কারণে অনেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-ওয়ালেট ব্যবহার করছেন। যুদ্ধ গাজার শিক্ষাব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করেছে। ইউনিসেফের হিসাবে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করতে পারেনি। অনেক স্কুল এখন আশ্রয়কেন্দ্র আশ্রয় নিয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হলে জাতিসংঘের হিসাবে আট লাখের বেশি মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হয়। বর্তমানে রাফাহর পশ্চিমাঞ্চলের মাওয়াসি রাফাহ ছাড়া প্রায় পুরো এলাকাই ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। ফলে সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষদের অনেকেই নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে হামাস গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছিল। তবে সেই প্রক্রিয়া এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পুলিশের ওপর অন্তত ১২টি হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৫ জন ছিলেন পুলিশ সদস্য। জাতিসংঘ বলেছে, বেসামরিক প্রশাসনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে এবং মানুষের সুরক্ষা দুর্বল করেছে। তিন বছরের যুদ্ধে গাজার মানুষের কাছে যুদ্ধ শুধু বোমা হামলা কিংবা সামরিক অভিযান নয়। এটি বদলে দিয়েছে ঘর, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

এদিকে ইসরায়েল জুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বুধবার স্মরণ করা হয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার স্মৃতি এবং হামলায় নিহতদের। এই স্মরণ কর্মসূচিগুলোকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন হবে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বার্ষিকী পালন করছে ইসরায়েল। আসন্ন নির্বাচনে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সেই দিনটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। ভোটাররা এমন এক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন যেখানে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সেই দিনটি একটি প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিন বছর আগে ঠিক যে সময়ে (স্থানীয় সময় ভোর ৬: ২৯ মিনিটে) হামাসের হামলা শুরু হয়েছিল, সেই সময়ে গাজা সীমান্তের কাছে কিবুতজ কফার আজায় একটি শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

ভারতে বাংলাদেশের মতো ‘পরিস্থিতি’ তৈরির চেষ্টা করছে কংগ্রেস: বিজেপি

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনে ৫ শিশুসহ ২৮ জন নিহত

০৮ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

গাজা যুদ্ধের তিন বছর: হারিয়ে গেছে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ

আপডেটের সময় : ০১:২০:০৬ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর গাজায় শুরু হয় ব্যাপক ইসরায়েলি সামরিক অভিযান। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে চলা বিমান ও স্থল হামলায় অবরুদ্ধ উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িঘর, সড়ক, হাসপাতাল ও অন্যান্য অবকাঠামোর বড় অংশই আজ নিশ্চিহ্ন। এদিকে ইসরায়েলে নির্বাচনের তোড়জোড়ের মধ্যেই গতকাল হামলার তৃতীয় বার্ষিকী পালন করা হয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় গত তিন বছরে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ১ হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ফলে প্রায় ২০ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ডে স্বাভাবিক জীবনযাপন এখন বহু দূরের বিষয়। যুদ্ধ গাজার মানুষের জীবনযাপনের মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। অনেকরই আর স্থায়ী কোনো বাড়ি নেই। নেই নির্ভরযোগ্য পানি, বিদ্যুৎ বা যাতায়াতব্যবস্থা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষ জরুরি আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্ৰায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল। এসব আশ্রয়স্থল বৃষ্টি, তীব্র গরম কিংবা অন্য প্রাকৃতিক পরিস্থিতি থেকে খুব বেশি সুরক্ষা দিতে পারে না। বিছানা, আলো, রান্নার সরঞ্জাম ও স্যানিটেশন সুবিধারও সংকট রয়েছে বহু পরিবারের। পানির সংকটও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, আগস্টের শুরুতে ৯১ শতাংশ মূল্যায়ন করা পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার পানির নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।

হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক শিশু তাঁবু ও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করছে। বর্তমানে দুই লাখ শিশু কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। দীর্ঘ সময়ের এই শিক্ষাবিরতিতে শিশুদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ শিক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সব কয়টিই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল চালু আছে। তবে কোনো হাসপাতালই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষার উপকরণ ও জ্বালানির তীব্র সংকট রয়েছে। ক্যানসারের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসাও এতে ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর মাত্র ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আরো কয়েক হাজার রোগীর বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন।

যুদ্ধ শুধু গাজার অবকাঠামো নয়, এর ভৌগোলিক বাস্তবতাও বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে গাজার বিভিন্ন এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষকে ক্রমেই ছোট এলাকায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ গাজার মিশরের সীমান্তবর্তী রাফাহ এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। যুদ্ধের সময় গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ সেখানে গাজায় কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড নেই।

ফলে হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু জ্বালানি, ইঞ্জিন তেল ও যন্ত্রাংশের সংকট পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে মানুষের চলাচলও কঠিন হয়েছে। ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নানা বাধা তৈরি হয়েছে। পানি সংগ্রহ, ফোন চার্জ দেওয়া, রান্না করা কিংবা গোসলের মতো সাধারণ কাজও এখন পরিকল্পনা ও সীমিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের বড় ধাক্কা এসেছে গাজার অর্থনীতিতে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হওয়ায় বহু মানুষ আয় হারিয়েছেন।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ শতাংশে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি কমে দাঁড়ায় মাত্র ২১২ মার্কিন ডলার, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ। কৃষি ও শিল্প উৎপাদনও ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ছয় শতাংশে নেমে এসেছে। নির্মাণ খাতের উৎপাদন নেমেছে মাত্র এক শতাংশে। আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও পণ্যের দাম ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি ছিল। ফলে পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা আরো কমেছে। অনেক পরিবার এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। নগদ অর্থের সংকটও তৈরি হয়েছে। এ কারণে অনেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-ওয়ালেট ব্যবহার করছেন। যুদ্ধ গাজার শিক্ষাব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করেছে। ইউনিসেফের হিসাবে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করতে পারেনি। অনেক স্কুল এখন আশ্রয়কেন্দ্র আশ্রয় নিয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হলে জাতিসংঘের হিসাবে আট লাখের বেশি মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হয়। বর্তমানে রাফাহর পশ্চিমাঞ্চলের মাওয়াসি রাফাহ ছাড়া প্রায় পুরো এলাকাই ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। ফলে সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষদের অনেকেই নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে হামাস গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছিল। তবে সেই প্রক্রিয়া এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পুলিশের ওপর অন্তত ১২টি হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৫ জন ছিলেন পুলিশ সদস্য। জাতিসংঘ বলেছে, বেসামরিক প্রশাসনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে এবং মানুষের সুরক্ষা দুর্বল করেছে। তিন বছরের যুদ্ধে গাজার মানুষের কাছে যুদ্ধ শুধু বোমা হামলা কিংবা সামরিক অভিযান নয়। এটি বদলে দিয়েছে ঘর, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

এদিকে ইসরায়েল জুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বুধবার স্মরণ করা হয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার স্মৃতি এবং হামলায় নিহতদের। এই স্মরণ কর্মসূচিগুলোকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন হবে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বার্ষিকী পালন করছে ইসরায়েল। আসন্ন নির্বাচনে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সেই দিনটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। ভোটাররা এমন এক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন যেখানে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সেই দিনটি একটি প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিন বছর আগে ঠিক যে সময়ে (স্থানীয় সময় ভোর ৬: ২৯ মিনিটে) হামাসের হামলা শুরু হয়েছিল, সেই সময়ে গাজা সীমান্তের কাছে কিবুতজ কফার আজায় একটি শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

Share this news as a Photo Card