নিউইয়র্ক ০৬:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর, সই হতে পারে ৩-৪টি সমঝোতা স্মারক

  • আপডেটের সময় : ১১:৪৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ ও দেশীয় বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আটটির মতো সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালে সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর টোকিও সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল জাপানে যাবে। এতে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি, বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীসহ সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা থাকবেন।

বাংলাদেশ ও জাপান সরকার মঙ্গলবার একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। এরপর থেকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। সময়ের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যোগাযোগ, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, আসন্ন সফর দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী করার সুযোগ তৈরি করেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হওয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে।

সফরে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হবে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব।

জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। মেট্রো রেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী প্রকল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে। সফরে এসব প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন, চলমান কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ২৭ অক্টোবর

সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।

এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সভাপতি এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠকের সম্ভাব্য কর্মসূচি রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। সফরসূচিতে চিবা শহরের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, নিউক্লিয়ার হেডকোয়ার্টার্স এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কথাও রয়েছে।

মেট্রো রেল প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদ নিয়েও আলোচনা

মেট্রো রেল লাইন-১ ও লাইন-৫-এর ব্যয় যথাক্রমে ৮৩ শতাংশ ও ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সফরে আলোচনায় আসবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচিত হবে। মেগা প্রকল্প ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন অবকাঠামোগত সহযোগিতা রয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

জাপানের ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের কাছ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। তবে ঋণের সুদের হার সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে আলোচনার ফল পরে জানানো হবে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি বা যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, একটি যৌথ বিবৃতি নিয়ে আলোচনা চলছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ ধরনের বিবৃতির বিষয়ে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সফরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

ইপিএ কার্যকর হলে খাতভিত্তিক প্রভাব পর্যালোচনা

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সই হওয়া ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, চুক্তিটি কার্যকরের আগে জাপানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। সেই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তা সম্পন্ন হলে চুক্তি কার্যকর হবে।

তিনি বলেন, ইপিএ একটি সামগ্রিক চুক্তি। কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধা তৈরি হলে অন্য কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে সুবিধার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর কোন কোন খাত কী কারণে অসুবিধায় পড়ছে, তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে। সামগ্রিকভাবে দুই দেশই এ চুক্তি থেকে উপকৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নতুন বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন

সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব।

বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে জাপানের সহায়তা পাওয়ার বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক আলোচনায় থাকবে।

সফর উপলক্ষে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, দেশীয় বিমান পরিবহন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ নিয়ে সমঝোতা স্মারক বা সহযোগিতা চুক্তির খসড়া আলোচনাধীন রয়েছে। এসবের কয়েকটি সফরকালে সই হতে পারে।

মাতারবাড়ী বন্দর নিয়েও আলোচনা

মাতারবাড়ী বন্দরের উন্নয়ন এবং এ প্রকল্পের মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বন্দর অবকাঠামোর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করবে, তা সামাল দেওয়ার মতো কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা বন্দরে থাকা প্রয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তা থেকেই মাতারবাড়ী বন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সক্ষমতার ঘাটতি বা অতিরিক্ত অব্যবহৃত সক্ষমতা দেখা দিলে সে অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও বৈশ্বিক ইস্যু

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত অবসানে যৌথ ভূমিকা রাখার বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, জাপান সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে, নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে এবং জাপান থেকে বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন ও সম্পন্ন করা, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হবে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

কাবার ভাইরাল ভিডিওটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশিদের নয়: মসজিদে নববী কর্তৃপক্ষ

ইসরায়েলে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণ করবে মুসলিম ভোটাররা

২০ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর, সই হতে পারে ৩-৪টি সমঝোতা স্মারক

আপডেটের সময় : ১১:৪৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ ও দেশীয় বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আটটির মতো সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালে সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর টোকিও সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল জাপানে যাবে। এতে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি, বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীসহ সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা থাকবেন।

বাংলাদেশ ও জাপান সরকার মঙ্গলবার একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। এরপর থেকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। সময়ের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যোগাযোগ, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, আসন্ন সফর দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত সহযোগিতাকে আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী করার সুযোগ তৈরি করেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হওয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে।

সফরে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হবে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব।

জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। মেট্রো রেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী প্রকল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে। সফরে এসব প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন, চলমান কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ২৭ অক্টোবর

সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।

এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সভাপতি এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠকের সম্ভাব্য কর্মসূচি রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। সফরসূচিতে চিবা শহরের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, নিউক্লিয়ার হেডকোয়ার্টার্স এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কথাও রয়েছে।

মেট্রো রেল প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদ নিয়েও আলোচনা

মেট্রো রেল লাইন-১ ও লাইন-৫-এর ব্যয় যথাক্রমে ৮৩ শতাংশ ও ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সফরে আলোচনায় আসবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচিত হবে। মেগা প্রকল্প ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন অবকাঠামোগত সহযোগিতা রয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

জাপানের ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের কাছ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। তবে ঋণের সুদের হার সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে আলোচনার ফল পরে জানানো হবে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি বা যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, একটি যৌথ বিবৃতি নিয়ে আলোচনা চলছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ ধরনের বিবৃতির বিষয়ে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সফরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

ইপিএ কার্যকর হলে খাতভিত্তিক প্রভাব পর্যালোচনা

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সই হওয়া ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, চুক্তিটি কার্যকরের আগে জাপানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। সেই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তা সম্পন্ন হলে চুক্তি কার্যকর হবে।

তিনি বলেন, ইপিএ একটি সামগ্রিক চুক্তি। কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধা তৈরি হলে অন্য কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে সুবিধার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর কোন কোন খাত কী কারণে অসুবিধায় পড়ছে, তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে। সামগ্রিকভাবে দুই দেশই এ চুক্তি থেকে উপকৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নতুন বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন

সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব।

বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে জাপানের সহায়তা পাওয়ার বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক আলোচনায় থাকবে।

সফর উপলক্ষে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, দেশীয় বিমান পরিবহন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ নিয়ে সমঝোতা স্মারক বা সহযোগিতা চুক্তির খসড়া আলোচনাধীন রয়েছে। এসবের কয়েকটি সফরকালে সই হতে পারে।

মাতারবাড়ী বন্দর নিয়েও আলোচনা

মাতারবাড়ী বন্দরের উন্নয়ন এবং এ প্রকল্পের মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বন্দর অবকাঠামোর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করবে, তা সামাল দেওয়ার মতো কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা বন্দরে থাকা প্রয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তা থেকেই মাতারবাড়ী বন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সক্ষমতার ঘাটতি বা অতিরিক্ত অব্যবহৃত সক্ষমতা দেখা দিলে সে অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও বৈশ্বিক ইস্যু

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত অবসানে যৌথ ভূমিকা রাখার বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, জাপান সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে, নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে এবং জাপান থেকে বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন ও সম্পন্ন করা, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হবে।

Share this news as a Photo Card