নিউইয়র্ক ০৬:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ

  • আপডেটের সময় : ০৭:০৪:২২ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধের আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তে দেশভেদে ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হচ্ছে। মূলত একটি অস্থায়ী বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই হোয়াইট হাউস এই পদক্ষেপ নিল।

বৃহস্পতিবার দেশটির ‘ফেডারেল রেজিস্টার’-এ প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন শুল্কের তথ্য জানানো হয়। নতুন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যকে প্রভাবিত করবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোসহ বেশ কয়েকটি দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের পণ্যে পূর্বনির্ধারিত শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ বা সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হবে। এ ছাড়া চীনসহ বাকি ৩৮টি দেশকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে।গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় জরুরি আইনের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ১০ থেকে ৫০ শতাংশ ‘পারস্পরিক শুল্ক’ বাতিল করে দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিল, যার মেয়াদ শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে শেষ হচ্ছে। ঠিক একই সময়ে নতুন এই শুল্ক কার্যকর হবে। তবে ট্রানজিটে থাকা পণ্যগুলো আগামী ২৮ জুলাই পর্যন্ত নতুন শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের আগের ধাক্কা সামলাতে এবার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারায় নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আইনজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধারায় গৃহীত পদক্ষেপ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা বেশ কঠিন।

ব্যাপক পরিসরে শুল্ক আরোপ করা হলেও বেশ কিছু পণ্যকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল-গ্যাস, সার এবং নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যদ্রব্য। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২৩২ ধারার আওতাভুক্ত গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্তপূরণ করা পণ্যগুলোও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ আইদে জানিয়েছেন, এই শুল্ক আরোপের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। কারণ, তাদের দেশে বাধ্যতামূলক শ্রম রোধে স্পষ্ট আইন রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলও এটিকে অন্যায্য আখ্যা দিয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তবে মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের মুখে পড়া কানাডা কিছুটা নমনীয় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক জানিয়েছেন, তারা পারস্পরিক স্বার্থে আগামী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে, ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট গভর্নর মাউরা হিলি সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রির এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধের আইন রয়েছে এবং তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। আমাদের বাণিজ্য অংশীদারদেরও একই পথ অনুসরণ করার সময় পার হয়ে গেছে।’

এই পদক্ষেপকে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ এবং বৈশ্বিক শ্রমিকদের কল্যাণের উদ্যোগ উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শুধু মেয়াদ শেষ হওয়া শুল্কের বিকল্প হিসেবে এটি আনা হয়নি; বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে বাধ্যতামূলক শ্রম নির্মূল করতেই উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের আহ্বানে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যবিষয়ক আইনজীবী রায়ান মাজেরাস বলেন, ‘একবার ৩০১ ধারায় শুল্ক বসানো হলে তা সমন্বয়ের অনেক সুযোগ থাকে। এটি মূলত ১০ শতাংশের ভিত্তি ধরে রাখার একটি জোরালো কৌশল এবং তারা মনে করছেন আদালতে এটি আইনি সুরক্ষা পাবে।’

বাধ্যতামূলক শ্রমের ধুয়া তুলে নতুন শুল্ক আরোপ করা হলেও, এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশল দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের বন্দিশিবিরে আটকে রেখে কাজ করানোর অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে, যা বেইজিং বরাবরই অস্বীকার করে। মূলত চীন থেকে আমদানি করা পণ্যে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে, নতুন এই পদক্ষেপকে তারই একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে শিল্পপণ্য বাদে চীনের পণ্যের ওপর শুল্কের হার ১০ শতাংশে নেমে এসেছিল।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ডেলিভারিম্যান কবি ওয়াং জিবিং 

মার্কিন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল ইরান

২৫ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ

আপডেটের সময় : ০৭:০৪:২২ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধের আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তে দেশভেদে ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হচ্ছে। মূলত একটি অস্থায়ী বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই হোয়াইট হাউস এই পদক্ষেপ নিল।

বৃহস্পতিবার দেশটির ‘ফেডারেল রেজিস্টার’-এ প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন শুল্কের তথ্য জানানো হয়। নতুন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যকে প্রভাবিত করবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোসহ বেশ কয়েকটি দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের পণ্যে পূর্বনির্ধারিত শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ বা সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হবে। এ ছাড়া চীনসহ বাকি ৩৮টি দেশকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে।গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় জরুরি আইনের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ১০ থেকে ৫০ শতাংশ ‘পারস্পরিক শুল্ক’ বাতিল করে দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিল, যার মেয়াদ শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে শেষ হচ্ছে। ঠিক একই সময়ে নতুন এই শুল্ক কার্যকর হবে। তবে ট্রানজিটে থাকা পণ্যগুলো আগামী ২৮ জুলাই পর্যন্ত নতুন শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের আগের ধাক্কা সামলাতে এবার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারায় নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আইনজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধারায় গৃহীত পদক্ষেপ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা বেশ কঠিন।

ব্যাপক পরিসরে শুল্ক আরোপ করা হলেও বেশ কিছু পণ্যকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল-গ্যাস, সার এবং নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যদ্রব্য। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২৩২ ধারার আওতাভুক্ত গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্তপূরণ করা পণ্যগুলোও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ আইদে জানিয়েছেন, এই শুল্ক আরোপের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। কারণ, তাদের দেশে বাধ্যতামূলক শ্রম রোধে স্পষ্ট আইন রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলও এটিকে অন্যায্য আখ্যা দিয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তবে মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের মুখে পড়া কানাডা কিছুটা নমনীয় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক জানিয়েছেন, তারা পারস্পরিক স্বার্থে আগামী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে, ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট গভর্নর মাউরা হিলি সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রির এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধের আইন রয়েছে এবং তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। আমাদের বাণিজ্য অংশীদারদেরও একই পথ অনুসরণ করার সময় পার হয়ে গেছে।’

এই পদক্ষেপকে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ এবং বৈশ্বিক শ্রমিকদের কল্যাণের উদ্যোগ উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শুধু মেয়াদ শেষ হওয়া শুল্কের বিকল্প হিসেবে এটি আনা হয়নি; বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে বাধ্যতামূলক শ্রম নির্মূল করতেই উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের আহ্বানে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যবিষয়ক আইনজীবী রায়ান মাজেরাস বলেন, ‘একবার ৩০১ ধারায় শুল্ক বসানো হলে তা সমন্বয়ের অনেক সুযোগ থাকে। এটি মূলত ১০ শতাংশের ভিত্তি ধরে রাখার একটি জোরালো কৌশল এবং তারা মনে করছেন আদালতে এটি আইনি সুরক্ষা পাবে।’

বাধ্যতামূলক শ্রমের ধুয়া তুলে নতুন শুল্ক আরোপ করা হলেও, এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশল দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের বন্দিশিবিরে আটকে রেখে কাজ করানোর অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে, যা বেইজিং বরাবরই অস্বীকার করে। মূলত চীন থেকে আমদানি করা পণ্যে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে, নতুন এই পদক্ষেপকে তারই একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে শিল্পপণ্য বাদে চীনের পণ্যের ওপর শুল্কের হার ১০ শতাংশে নেমে এসেছিল।

Share this news as a Photo Card