নিউইয়র্ক ০৬:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টোকিওর বিকল্প রাজধানীর খোঁজে জাপান

  • আপডেটের সময় : ০৮:০৮:৫৫ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ভূমিকম্পপ্রবণ জাপানে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজধানী টোকিও অচল হয়ে পড়লে সরকারি কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে বিকল্প বা দ্বিতীয় রাজধানী নির্ধারণের আইনি কাঠামো তৈরি করেছে দেশটির আইনপ্রণেতারা।

গত মাসেই পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত বিলটি অনুমোদিত হয়। তবে সরকারের এই পরিকল্পনা ঘিরে ইতোমধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জোট সরকারের ছোট শরিক জাপান ইনোভেশন পার্টির (ইশিন) প্রভাববলয় ওসাকাকে সুবিধা দিতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ বিতর্কের কারণে আইনপ্রণেতাদের গ্রীষ্মকালীন ছুটিও পিছিয়ে যায়। নিম্নকক্ষে ক্ষমতাসীন জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি সহজে পাস হলেও, বিরোধী নিয়ন্ত্রিত উচ্চকক্ষে তা সামান্য ব্যবধানে অনুমোদিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির অন্যান্য নীতি বাস্তবায়নে আগামী দিনে কঠিন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত মিলছে।

নতুন আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো টোকিওতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলেও সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিও মহানগর এলাকায় ৭ মাত্রার বা তার চেয়ে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ।

এমন বড় দুর্যোগ ঘটলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্ট, কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। আইন অনুযায়ী, তখন নির্দিষ্ট অঞ্চল সাময়িকভাবে দেশের মূল রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

জরুরি প্রস্তুতির পাশাপাশি বিকল্প অঞ্চলগুলোকে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে। বর্তমানে জাপানের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ টোকিও থেকে আসে। দেশের অর্ধেকের বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখানে অবস্থিত এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ এই এক অঞ্চলেই বসবাস করে। এই এককেন্দ্রিকতা কমাতে বিকল্প রাজধানী এলাকায় সরকারি স্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ, কর ছাড় ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জাপানের দ্বিতীয় রাজধানী গঠনের পরিকল্পনা মূলত ওসাকাকেন্দ্রিক দল জাপান ইনোভেশন পার্টির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এজেন্ডা। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও ওসাকার সাবেক গভর্নর তোরু হাশিমোতো ২০১০ সালের দিকে প্রথম ওসাকাকে বিকল্প রাজধানী করার প্রস্তাব দেন।

গত বছর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে দীর্ঘদিনের শরিক কোমেইতোর জোট ভেঙে যাওয়ার পর ইশিনকে জোটে আনতে তাকাইচি যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলেন, তার মধ্যে এ বিল পাস অন্যতম। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে বঞ্চিত করে বিপুল অর্থ, কর ছাড় ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুধু ওসাকা বা কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকেই চলে যেতে পারে।

সরকার এখনো এ প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ বা অর্থনৈতিক সুবিধার কোনো স্পষ্ট হিসাব দিতে পারেনি। এর সঙ্গে ওসাকা শহরের প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক জটও জড়িয়ে আছে।

আইনে নির্দিষ্ট করে ওসাকা বা অন্য কোনো শহরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এটি শুধু আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, যার অধীনে অঞ্চলগুলো আবেদন করতে পারবে। এমনকি একাধিক বিকল্প রাজধানী করার পথও খোলা রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

বিকল্প রাজধানী হতে হলে কোনো অঞ্চলকে টোকিওর সঙ্গে একই সময়ে দুর্যোগকবলিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে তুলনামূলক মুক্ত হতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রশাসনিক সক্ষমতা, সরকারি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক ভিত্তি ও জনসংখ্যা থাকতে হবে।

ইতোমধ্যে ফুকুওকা, হোক্কাইদো ও মিয়াগির মতো কয়েকটি প্রিফেকচার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটার কেন্দ্রস্থল আইচির গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা বিল পাসের পরপরই ঘোষণা করেছেন, তিনি তার অঞ্চলকে দেশের প্রথম বিকল্প রাজধানী হিসেবে দেখতে চান।

বিকল্প রাজধানী বিল পাস করে তাকাইচি তার জোটসঙ্গী ইশিনকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে পারলেও, উচ্চকক্ষে মাত্র দুই ভোটের ব্যবধানে বিলটি পাস হওয়া তার সরকারের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো জরুরি বিষয়গুলোর সমাধান না করে এ ধরনের বিতর্কিত আইন বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়ায় ভোটারদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জনপ্রিয়তা কমছে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যে বিক্রয় কর কমানোর যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নীতি নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে সমালোচনা উঠছে।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

স্পেনে দাবানল পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার

জাপানের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮, চলছে উদ্ধার অভিযান

৩১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

টোকিওর বিকল্প রাজধানীর খোঁজে জাপান

আপডেটের সময় : ০৮:০৮:৫৫ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

ভূমিকম্পপ্রবণ জাপানে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজধানী টোকিও অচল হয়ে পড়লে সরকারি কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে বিকল্প বা দ্বিতীয় রাজধানী নির্ধারণের আইনি কাঠামো তৈরি করেছে দেশটির আইনপ্রণেতারা।

গত মাসেই পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত বিলটি অনুমোদিত হয়। তবে সরকারের এই পরিকল্পনা ঘিরে ইতোমধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জোট সরকারের ছোট শরিক জাপান ইনোভেশন পার্টির (ইশিন) প্রভাববলয় ওসাকাকে সুবিধা দিতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ বিতর্কের কারণে আইনপ্রণেতাদের গ্রীষ্মকালীন ছুটিও পিছিয়ে যায়। নিম্নকক্ষে ক্ষমতাসীন জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি সহজে পাস হলেও, বিরোধী নিয়ন্ত্রিত উচ্চকক্ষে তা সামান্য ব্যবধানে অনুমোদিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির অন্যান্য নীতি বাস্তবায়নে আগামী দিনে কঠিন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত মিলছে।

নতুন আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো টোকিওতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলেও সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিও মহানগর এলাকায় ৭ মাত্রার বা তার চেয়ে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ।

এমন বড় দুর্যোগ ঘটলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্ট, কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। আইন অনুযায়ী, তখন নির্দিষ্ট অঞ্চল সাময়িকভাবে দেশের মূল রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

জরুরি প্রস্তুতির পাশাপাশি বিকল্প অঞ্চলগুলোকে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে। বর্তমানে জাপানের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ টোকিও থেকে আসে। দেশের অর্ধেকের বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখানে অবস্থিত এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ এই এক অঞ্চলেই বসবাস করে। এই এককেন্দ্রিকতা কমাতে বিকল্প রাজধানী এলাকায় সরকারি স্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ, কর ছাড় ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জাপানের দ্বিতীয় রাজধানী গঠনের পরিকল্পনা মূলত ওসাকাকেন্দ্রিক দল জাপান ইনোভেশন পার্টির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এজেন্ডা। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও ওসাকার সাবেক গভর্নর তোরু হাশিমোতো ২০১০ সালের দিকে প্রথম ওসাকাকে বিকল্প রাজধানী করার প্রস্তাব দেন।

গত বছর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে দীর্ঘদিনের শরিক কোমেইতোর জোট ভেঙে যাওয়ার পর ইশিনকে জোটে আনতে তাকাইচি যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলেন, তার মধ্যে এ বিল পাস অন্যতম। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে বঞ্চিত করে বিপুল অর্থ, কর ছাড় ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুধু ওসাকা বা কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকেই চলে যেতে পারে।

সরকার এখনো এ প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ বা অর্থনৈতিক সুবিধার কোনো স্পষ্ট হিসাব দিতে পারেনি। এর সঙ্গে ওসাকা শহরের প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক জটও জড়িয়ে আছে।

আইনে নির্দিষ্ট করে ওসাকা বা অন্য কোনো শহরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এটি শুধু আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, যার অধীনে অঞ্চলগুলো আবেদন করতে পারবে। এমনকি একাধিক বিকল্প রাজধানী করার পথও খোলা রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

বিকল্প রাজধানী হতে হলে কোনো অঞ্চলকে টোকিওর সঙ্গে একই সময়ে দুর্যোগকবলিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে তুলনামূলক মুক্ত হতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রশাসনিক সক্ষমতা, সরকারি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক ভিত্তি ও জনসংখ্যা থাকতে হবে।

ইতোমধ্যে ফুকুওকা, হোক্কাইদো ও মিয়াগির মতো কয়েকটি প্রিফেকচার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটার কেন্দ্রস্থল আইচির গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা বিল পাসের পরপরই ঘোষণা করেছেন, তিনি তার অঞ্চলকে দেশের প্রথম বিকল্প রাজধানী হিসেবে দেখতে চান।

বিকল্প রাজধানী বিল পাস করে তাকাইচি তার জোটসঙ্গী ইশিনকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে পারলেও, উচ্চকক্ষে মাত্র দুই ভোটের ব্যবধানে বিলটি পাস হওয়া তার সরকারের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো জরুরি বিষয়গুলোর সমাধান না করে এ ধরনের বিতর্কিত আইন বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়ায় ভোটারদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জনপ্রিয়তা কমছে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যে বিক্রয় কর কমানোর যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নীতি নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে সমালোচনা উঠছে।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস 

Share this news as a Photo Card