নিউইয়র্ক ০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবাসস্থল ও করিডর হারিয়ে সংকটে বন্য হাতি

  • আপডেটের সময় : ০৭:২৭:০৪ অপরাহ্ণ, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
  • ৩ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

একসময় মূল্যবান দাঁত ও হাড়গোড়ের জন্য শিকারিদের হাতে প্রাণ হারাত বন্য হাতি। এখন পার্বত্য এলাকায় মাংসের জন্যও হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এর পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের প্রাচীন করিডর। বন উজাড় ও প্রাকৃতিক বনভূমির চরিত্র বদলে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে খাদ্যসংকট। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বন্য হাতির অস্তিত্ব এখন বড় ধরনের সংকটে।

হাতির প্রতি মানুষের এমন নিষ্ঠুরতার মধ্যেই আজ ১২ আগস্ট পালিত হচ্ছে বিশ্ব হাতি দিবস। প্রতিবছর দিবসটি পালিত হলেও মহাবিপন্ন এই বন্যপ্রাণী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) লাল তালিকায় হাতি বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রজাতিটি মহাবিপন্ন। দেশে হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে আবাসস্থল ধ্বংস, করিডর দখল ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংকটে হাতির চলাচলের ১২ করিডর

আইইউসিএন ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের জরিপে বাংলাদেশে হাতির ১২টি চলাচলের করিডর চিহ্নিত করে। এর মধ্যে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের তিনটি, উত্তর বন বিভাগের পাঁচটি এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চারটি করিডর রয়েছে। পরে সরকার এসব করিডরকে গেজেটের মাধ্যমে সংরক্ষণের আওতায় আনে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি-সাতগড় করিডর বর্তমানে অনেকটাই বন্ধ। রেললাইন নির্মাণের কারণে এ পথে হাতির চলাচল কমে গেছে। ফলে চুনতি এলাকার হাতি চুনতিতে এবং বাঁশখালী এলাকার হাতি বাঁশখালীতে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে হাতির প্রজনন ও বংশবিস্তারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু নির্ধারিত ১২টি করিডর নয়, হাতির অন্যান্য প্রচলিত চলাচলের পথও এখন বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত। এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে বসতি, সড়ক, রেললাইন ও বিভিন্ন অবকাঠামো।

বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এই পাঁচ জেলায় বন্য হাতির প্রধান ও স্থায়ী আবাসস্থল রয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী শেরপুর, জামালপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৌসুমি বা সাময়িকভাবে হাতির বিচরণ দেখা যায়।

অর্থাৎ দেশের অন্তত ১৪টি জেলায় হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতির চলাচল প্রশাসনিক সীমানা মেনে হয় না। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত আন্তঃসীমান্ত করিডর দিয়েই চলাচল করে। এসব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বনভূমির চরিত্র বদলে খাদ্যসংকট

বন গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে সেখানে শাল, সেগুন, পাইন কিংবা আকাশমণির মতো গাছের বাগান গড়ে তোলায় হাতির প্রাকৃতিক খাদ্যের সংকট তীব্র হয়েছে।

একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কেজি খাবারের প্রয়োজন হয়। সাধারণত বাঁশ, লতাপাতা ও বুনো ফলমূল তাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু প্রাকৃতিক বন সংকুচিত হওয়ায় পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে হাতির দল লোকালয়ের ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে।

বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ধান, কলা ও পেঁপের প্রতি হাতির বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। ফলে খাবারের সন্ধানে ফসলের মাঠে আসার সময় মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

সাড়ে আট বছরে প্রাণ গেছে ১৫২ হাতির

হাতি হত্যার বিভিন্ন ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে হত্যা, বিষপ্রয়োগ, ট্রেনের ধাক্কা এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি মাংসের জন্য হাতির অঙ্গ কেটে নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

বন বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৪৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর সিলেট, মৌলভীবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে আরও চারটি হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত হাতির মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫২।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মৃত্যু শুধু বন্যপ্রাণী নিধনের ঘটনা নয়; এটি দেশের জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় আঘাত। হাতির মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মানুষের দখলে আবাসস্থল চলে যাওয়া এবং চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের আইইউসিএনের শুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৬৮টি আবাসিক বন্য হাতি ছিল। এর বাইরে ৯৩টি আন্তঃসীমান্তীয় এবং ৯৬টি বন্দি হাতি ছিল। গত এক দশকে আবাসস্থল সংকোচন ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার অব্যাহত থাকায় আবাসিক হাতির সংখ্যা ২০০-এর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উন্নয়ন প্রকল্পে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে করিডর

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হাতির শতাব্দীপ্রাচীন চলাচলের পথকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে।

করিডর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় হাতির দল পরিচিত পথ হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে যেমন মানুষের ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি মানুষের আক্রমণে হাতিরও প্রাণ যাচ্ছে। একই সঙ্গে হাতির হামলায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

ফসলি জমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক বেড়া ব্যবহারের প্রবণতাও হাতির মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। এসব বেড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

মাংসের জন্যও হাতি হত্যা

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে মাংসের জন্য হাতি হত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে। গত এপ্রিলে রাঙামাটির লংগদুতে একটি মৃত হাতির পায়ের অংশ ও শুঁড় কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, ওই হাতিটিকে প্রায় তিন বছর আগে গুলি করা হয়েছিল। পরে মাংসের জন্য এর অঙ্গ কেটে নেওয়া হয়।

নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, লংগদুর ওই পুরুষ হাতিটি এলাকায় থাকা ১৪টি হাতির মধ্যে একমাত্র বড় ও প্রজননক্ষম পুরুষ হাতি ছিল। একটি গোষ্ঠীর হাতে হাতিটি কয়েকবার গুলিবিদ্ধও হয়েছিল।

কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি রক্ষায় শুধু দিবস পালন যথেষ্ট নয়। তাদের আবাসস্থল ও করিডর দখলমুক্ত রাখা, প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার, আন্তঃসীমান্ত চলাচলের পথ সুরক্ষিত করা এবং হাতি-মানুষ সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক বেড়া ও বিষপ্রয়োগ বন্ধ, অবৈধ শিকার ঠেকানো এবং হাতি হত্যার ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে। হাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে দেশের বন্য হাতির সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ব হাতি দিবসে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি হারিয়ে যেতে বসা বন্য হাতির জন্য সত্যিকারের নিরাপদ আবাসস্থল ও করিডর নিশ্চিত করা হবে?

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের অজু ও এশীয়দের চাল ধোয়ায় কম পানি ব্যবহারের পরামর্শ

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার’ অভিযোগ, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চাইল তুরস্ক

২৩ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

আবাসস্থল ও করিডর হারিয়ে সংকটে বন্য হাতি

আপডেটের সময় : ০৭:২৭:০৪ অপরাহ্ণ, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

একসময় মূল্যবান দাঁত ও হাড়গোড়ের জন্য শিকারিদের হাতে প্রাণ হারাত বন্য হাতি। এখন পার্বত্য এলাকায় মাংসের জন্যও হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এর পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের প্রাচীন করিডর। বন উজাড় ও প্রাকৃতিক বনভূমির চরিত্র বদলে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে খাদ্যসংকট। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বন্য হাতির অস্তিত্ব এখন বড় ধরনের সংকটে।

হাতির প্রতি মানুষের এমন নিষ্ঠুরতার মধ্যেই আজ ১২ আগস্ট পালিত হচ্ছে বিশ্ব হাতি দিবস। প্রতিবছর দিবসটি পালিত হলেও মহাবিপন্ন এই বন্যপ্রাণী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) লাল তালিকায় হাতি বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রজাতিটি মহাবিপন্ন। দেশে হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে আবাসস্থল ধ্বংস, করিডর দখল ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংকটে হাতির চলাচলের ১২ করিডর

আইইউসিএন ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের জরিপে বাংলাদেশে হাতির ১২টি চলাচলের করিডর চিহ্নিত করে। এর মধ্যে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের তিনটি, উত্তর বন বিভাগের পাঁচটি এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চারটি করিডর রয়েছে। পরে সরকার এসব করিডরকে গেজেটের মাধ্যমে সংরক্ষণের আওতায় আনে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি-সাতগড় করিডর বর্তমানে অনেকটাই বন্ধ। রেললাইন নির্মাণের কারণে এ পথে হাতির চলাচল কমে গেছে। ফলে চুনতি এলাকার হাতি চুনতিতে এবং বাঁশখালী এলাকার হাতি বাঁশখালীতে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে হাতির প্রজনন ও বংশবিস্তারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু নির্ধারিত ১২টি করিডর নয়, হাতির অন্যান্য প্রচলিত চলাচলের পথও এখন বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত। এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে বসতি, সড়ক, রেললাইন ও বিভিন্ন অবকাঠামো।

বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এই পাঁচ জেলায় বন্য হাতির প্রধান ও স্থায়ী আবাসস্থল রয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী শেরপুর, জামালপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৌসুমি বা সাময়িকভাবে হাতির বিচরণ দেখা যায়।

অর্থাৎ দেশের অন্তত ১৪টি জেলায় হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতির চলাচল প্রশাসনিক সীমানা মেনে হয় না। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত আন্তঃসীমান্ত করিডর দিয়েই চলাচল করে। এসব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।

বনভূমির চরিত্র বদলে খাদ্যসংকট

বন গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে সেখানে শাল, সেগুন, পাইন কিংবা আকাশমণির মতো গাছের বাগান গড়ে তোলায় হাতির প্রাকৃতিক খাদ্যের সংকট তীব্র হয়েছে।

একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কেজি খাবারের প্রয়োজন হয়। সাধারণত বাঁশ, লতাপাতা ও বুনো ফলমূল তাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু প্রাকৃতিক বন সংকুচিত হওয়ায় পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে হাতির দল লোকালয়ের ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে।

বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ধান, কলা ও পেঁপের প্রতি হাতির বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। ফলে খাবারের সন্ধানে ফসলের মাঠে আসার সময় মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

সাড়ে আট বছরে প্রাণ গেছে ১৫২ হাতির

হাতি হত্যার বিভিন্ন ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে হত্যা, বিষপ্রয়োগ, ট্রেনের ধাক্কা এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি মাংসের জন্য হাতির অঙ্গ কেটে নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

বন বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৪৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর সিলেট, মৌলভীবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে আরও চারটি হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত হাতির মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫২।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মৃত্যু শুধু বন্যপ্রাণী নিধনের ঘটনা নয়; এটি দেশের জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় আঘাত। হাতির মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মানুষের দখলে আবাসস্থল চলে যাওয়া এবং চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের আইইউসিএনের শুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৬৮টি আবাসিক বন্য হাতি ছিল। এর বাইরে ৯৩টি আন্তঃসীমান্তীয় এবং ৯৬টি বন্দি হাতি ছিল। গত এক দশকে আবাসস্থল সংকোচন ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার অব্যাহত থাকায় আবাসিক হাতির সংখ্যা ২০০-এর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উন্নয়ন প্রকল্পে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে করিডর

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হাতির শতাব্দীপ্রাচীন চলাচলের পথকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে।

করিডর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় হাতির দল পরিচিত পথ হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে যেমন মানুষের ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি মানুষের আক্রমণে হাতিরও প্রাণ যাচ্ছে। একই সঙ্গে হাতির হামলায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

ফসলি জমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক বেড়া ব্যবহারের প্রবণতাও হাতির মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। এসব বেড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

মাংসের জন্যও হাতি হত্যা

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে মাংসের জন্য হাতি হত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে। গত এপ্রিলে রাঙামাটির লংগদুতে একটি মৃত হাতির পায়ের অংশ ও শুঁড় কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, ওই হাতিটিকে প্রায় তিন বছর আগে গুলি করা হয়েছিল। পরে মাংসের জন্য এর অঙ্গ কেটে নেওয়া হয়।

নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, লংগদুর ওই পুরুষ হাতিটি এলাকায় থাকা ১৪টি হাতির মধ্যে একমাত্র বড় ও প্রজননক্ষম পুরুষ হাতি ছিল। একটি গোষ্ঠীর হাতে হাতিটি কয়েকবার গুলিবিদ্ধও হয়েছিল।

কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি রক্ষায় শুধু দিবস পালন যথেষ্ট নয়। তাদের আবাসস্থল ও করিডর দখলমুক্ত রাখা, প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার, আন্তঃসীমান্ত চলাচলের পথ সুরক্ষিত করা এবং হাতি-মানুষ সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক বেড়া ও বিষপ্রয়োগ বন্ধ, অবৈধ শিকার ঠেকানো এবং হাতি হত্যার ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে। হাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে দেশের বন্য হাতির সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ব হাতি দিবসে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি হারিয়ে যেতে বসা বন্য হাতির জন্য সত্যিকারের নিরাপদ আবাসস্থল ও করিডর নিশ্চিত করা হবে?

Share this news as a Photo Card