কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আমাদের কারও বন্ধু নয়। এটি আমাদের গোপনীয়তাও রক্ষা করে না। অথচ আমাদের অনেকেই বিভিন্ন তথ্য দিয়ে এআইয়ের কাছে পরামর্শ চায়। কিন্তু টেক বিশেষজ্ঞরা সবসময় বলে আসছেন, চ্যাটবটকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
ম্যাশেবলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চ্যাটবটের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার মানে বড় ধরনের ঝুঁকি। আমরা হয়তো ছোট একটি সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন শুরু করি, কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত, চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ও জিজ্ঞেস করতে শুরু করি। এতে সেই ব্যক্তির তথ্য ফাঁস বা অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে।
সবকিছু বলার সমস্যা কী
মূলত এআই চ্যাটবটগুলো আমাদের কথোপকথন থেকে শেখে। এমনকি আমরা যা লিখছি তা কোনো কোম্পানি, ডেভেলপার, এমনকি বিজ্ঞাপনদাতার কাছেও যেতে পারে। এছাড়া যাদের কাছে ডিভাইস বা অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস আছে, তারাও এই চ্যাট দেখতে পারে।
এছাড়া এআই আমাদের ভুল তথ্য দিতে পারে। হয়তো অর্থসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করছি, তবে তার উত্তর পাচ্ছি ভুল। এই ভুল উত্তর আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক সময় এআই তোষামোদি আচরণ করে। মানে আমাদের মন্তব্য বা ধারণার সঙ্গে একমত হতে চায়। এতে আমাদের ভুল ধারণাগুলো আরও শক্ত হয়।
সব ধরনের বিষয়ে এআইয়ের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ বা কার্যকর নয় বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই কখনোই মানুষের প্রকৃত বিকল্প বা সত্যিকারের বন্ধু হতে পারে না। বিশেষ করে সৌন্দর্য, আবেগ, আত্মমর্যাদা ও অর্থসংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয়ে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
এ কারণে এআইয়ের কাছে নিচের ৫ ধরনের পরামর্শ না চাওয়াই ভালো-
চেহারা ও সৌন্দর্যের মূল্যায়ন: চেহারার সৌন্দর্য বা পোশাক নিয়ে এআইয়ের কাছে মতামত চাওয়া নিরর্থক। বাণিজ্যিক অ্যালগরিদমের কারণে এটি সাধারণত ব্যবহারকারীকে খুশি রাখার চেষ্টা করে। বাস্তব জীবনের একজন বন্ধু যেমন সত্যিটা বলে দিতে পারে, এআই তা পারে না।
আবেগ ও ভালোবাসার বিচার: কেউ আপনাকে ভালোবাসে কিনা-এমন প্রশ্নের উত্তরে এআই কৃত্রিম সহানুভূতি দেখাতে পারে। কিন্তু মানুষের জটিল অনুভূতি বোঝা বা হৃদয় দিয়ে তা অনুভব করার সক্ষমতা এর নেই। আবেগগত সহায়তার জন্য এআইয়ের বদলে কোনো বন্ধু বা পেশাদার থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হওয়াই শ্রেয়।
বুদ্ধিমত্তা ও আত্মমর্যাদা: নিজের বুদ্ধিমত্তা বা যোগ্যতা মাপার জন্য এআইয়ের ওপর নির্ভর করা এক ধরনের ভ্রান্তি। এআই সুবিশাল তথ্যের ভাণ্ডার হলেও এটি কোনো অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ নয়।
আর্থিক পরামর্শ: অর্থসংক্রান্ত বা জীবনের জটিল সিদ্ধান্তে এআই অনেক সময় বাস্তবসম্মত হিসাবের বদলে দার্শনিক উত্তর দেয়। তাই আর্থিক হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে পেশাদার হিসাবরক্ষক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বাস্তব জীবনের সামাজিক ও মানবিক সাহায্য: এআই কোনো রেসিপি তৈরি বা রান্নার টিপস দিতে পারলেও সরাসরি থালা-বাসন মেজে দিতে পারে না। বিপদের দিনে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি ঠিক করা বা ছোট ছোট মানবিক ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া এআইয়ের পক্ষে সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো নিজস্ব ইচ্ছা বা অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে চলে না; এটি মূলত সার্ভার সংযোগ ও ডেটার ওপর নির্ভরশীল। এআই-কে বন্ধু বা জীবনের আশ্রয় ভাবা একটি ‘ডিজিটাল বিভ্রম’ ছাড়া আর কিছুই নয়। আসল সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের সহানুভূতি ও বাস্তব জীবনের বন্ধন ডিজিটাল জগতের কৃত্রিম প্রশংসার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ও কার্যকর।
আগে তথ্য শেয়ার করলে এখন করণীয়
চ্যাটবটে প্রবেশ করে আগের চ্যাট হিস্ট্রি ডিলিট করতে হবে। মেমোরি ডিলিট করতে হবে। একইসঙ্গে এআইকে ‘ভুতে যেতে’ বলতে হবে। আর নিজের প্রাইভেসি সেটিংস পরিবর্তন করে নিতে হবে। তবে কিছু ডেটা ব্যাকআপ কিছুদিন থাকতে পারে।
এআই থেকে নিরাপদ থাকতে ‘টেম্পোরারি চ্যাট’ ব্যবহার করতে হবে। ডেটা শেয়ারিং বন্ধ করা দরকারি। চ্যাটবটের বদলে সাধারণ ব্রাউজার ব্যবহার করা। সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো ব্যক্তিগত কোনো তথ্য শেয়ার না করা।


























