নিউইয়র্ক ০৬:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপ নিয়ে ফিফা ও উয়েফা মুখোমুখি

  • আপডেটের সময় : ০৭:৫৩:০৬ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

সবুজ ঘাসে গড়িয়ে চলা একটি বলের গল্প কখনো শুধু খেলার নয়। সেখানে জড়িয়ে থাকে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রজন্মের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপকে ঘিরেই এবার শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বকাপ কি শুধুই আবেগের নাম, নাকি এটি এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একটি বাণিজ্যিক সম্পদে?৪৮ দলের সর্ববৃহৎ বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের পরপরই নতুন এক ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা সামনে এনেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্বকাপ সংক্রান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তারা গঠন করতে যাচ্ছে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে ২০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি নতুন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ মাইনোরিটি শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহ করতে চায় ফিফা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করার কাজ শুরু করেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য এই পরিকল্পনাকে ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, শেয়ার বিক্রি থেকে আসা প্রতিটি ডলারই আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে ফুটবলের উন্নয়নে। 

প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেকটি অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ফুটবল এবং তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবল বিকাশের জন্য এককালীন ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অনুদান পাবে। ২০৩৫ থেকে ২০৩৮ মেয়াদে সেই অনুদান বেড়ে ২৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ইনফান্তিনোর দাবি, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে সম্পদের আরো ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং ছোট দেশগুলোর ফুটবলও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে। কিন্তু ফিফার এই যুক্তিতে আশ্বস্ত হয়নি ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। তাদের অভিযোগ, অর্থ সংগ্রহের নামে ফিফা এমন এক সীমারেখা অতিক্রম করছে। যেখানে ফুটবলের ঐতিহ্য, শাসনব্যবস্থা ও আত্মপরিচয়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে। উয়েফার কড়া ভাষ্যের মূল সুর একটাই- ‘ফুটবল কোনো বিক্রয়যোগ্য সম্পদ নয়।’

এক বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, ‘ফিফা এমন একটি সীমা অতিক্রম করছে যা কোনো ক্রীড়া সংস্থার অতিক্রম করা উচিত নয়। ফুটবলের গভর্ন্যান্স কিংবা ঐতিহ্য কোনো কেনাবেচার সম্পদ হতে পারে না। আমরা কেউই ফুটবলের মালিক নই, আর এটি বিক্রি করার অধিকারও ফিফাকে কেউ দেয়নি।’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে উয়েফাভুক্ত দেশগুলো চলতি সপ্তাহেই জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগোলে তাকে চাপে ফেলতে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেওয়ার ব্যাপারেও দেশগুলোর আগ্রহ রয়েছে। জোর গুঞ্জন, ফিফার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে এবং সম্ভাব্য বিশ্বকাপ বর্জনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে চলতি সপ্তাহেই এ বৈঠক করতে চায় উয়েফা। যেখানে সব সদস্য দেশ (৫৫) আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে। 

এর আগে ২০২১ সালে প্রতি দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিল ফিফা। তবে উয়েফার বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকির মুখে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সংস্থাটি। এবারও ফিফার নতুন পরিকল্পনা ঠেকাতে একই ধরনের কৌশল নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলমান এই বিরোধ কেবল ফুটবল প্রশাসনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও প্রকাশ্যে ফিফার পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপ কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। এটি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতা। এর কোনো অংশ বিক্রি করার অর্থই হলো ফুটবলকে বিক্রি করে দেওয়া।’ফুটবল ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ সব সময়ই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক একটি আয়োজন ছিল। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি ও বিপণন থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই বিলিয়ন ডলার আয় করে ফিফা। তবে এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত ব্যবসায়িক কাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ হয়তো উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। আবার অন্যদের আশঙ্কা, একবার যদি বিনিয়োগকারীদের লাভের হিসাব ফুটবলের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তবে খেলাটির মানবিক সৌন্দর্য ধীরে ধীরে মুনাফার অঙ্কে বন্দি হয়ে যাবে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

স্পেনে দাবানল পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার

জাপানের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮, চলছে উদ্ধার অভিযান

৩১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

বিশ্বকাপ নিয়ে ফিফা ও উয়েফা মুখোমুখি

আপডেটের সময় : ০৭:৫৩:০৬ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

সবুজ ঘাসে গড়িয়ে চলা একটি বলের গল্প কখনো শুধু খেলার নয়। সেখানে জড়িয়ে থাকে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রজন্মের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপকে ঘিরেই এবার শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বকাপ কি শুধুই আবেগের নাম, নাকি এটি এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একটি বাণিজ্যিক সম্পদে?৪৮ দলের সর্ববৃহৎ বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের পরপরই নতুন এক ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা সামনে এনেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্বকাপ সংক্রান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তারা গঠন করতে যাচ্ছে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে ২০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি নতুন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ মাইনোরিটি শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহ করতে চায় ফিফা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করার কাজ শুরু করেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য এই পরিকল্পনাকে ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, শেয়ার বিক্রি থেকে আসা প্রতিটি ডলারই আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে ফুটবলের উন্নয়নে। 

প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেকটি অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ফুটবল এবং তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবল বিকাশের জন্য এককালীন ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অনুদান পাবে। ২০৩৫ থেকে ২০৩৮ মেয়াদে সেই অনুদান বেড়ে ২৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ইনফান্তিনোর দাবি, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে সম্পদের আরো ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং ছোট দেশগুলোর ফুটবলও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে। কিন্তু ফিফার এই যুক্তিতে আশ্বস্ত হয়নি ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। তাদের অভিযোগ, অর্থ সংগ্রহের নামে ফিফা এমন এক সীমারেখা অতিক্রম করছে। যেখানে ফুটবলের ঐতিহ্য, শাসনব্যবস্থা ও আত্মপরিচয়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে। উয়েফার কড়া ভাষ্যের মূল সুর একটাই- ‘ফুটবল কোনো বিক্রয়যোগ্য সম্পদ নয়।’

এক বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, ‘ফিফা এমন একটি সীমা অতিক্রম করছে যা কোনো ক্রীড়া সংস্থার অতিক্রম করা উচিত নয়। ফুটবলের গভর্ন্যান্স কিংবা ঐতিহ্য কোনো কেনাবেচার সম্পদ হতে পারে না। আমরা কেউই ফুটবলের মালিক নই, আর এটি বিক্রি করার অধিকারও ফিফাকে কেউ দেয়নি।’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে উয়েফাভুক্ত দেশগুলো চলতি সপ্তাহেই জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগোলে তাকে চাপে ফেলতে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেওয়ার ব্যাপারেও দেশগুলোর আগ্রহ রয়েছে। জোর গুঞ্জন, ফিফার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে এবং সম্ভাব্য বিশ্বকাপ বর্জনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে চলতি সপ্তাহেই এ বৈঠক করতে চায় উয়েফা। যেখানে সব সদস্য দেশ (৫৫) আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে। 

এর আগে ২০২১ সালে প্রতি দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিল ফিফা। তবে উয়েফার বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকির মুখে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সংস্থাটি। এবারও ফিফার নতুন পরিকল্পনা ঠেকাতে একই ধরনের কৌশল নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলমান এই বিরোধ কেবল ফুটবল প্রশাসনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও প্রকাশ্যে ফিফার পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপ কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। এটি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতা। এর কোনো অংশ বিক্রি করার অর্থই হলো ফুটবলকে বিক্রি করে দেওয়া।’ফুটবল ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ সব সময়ই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক একটি আয়োজন ছিল। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি ও বিপণন থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই বিলিয়ন ডলার আয় করে ফিফা। তবে এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত ব্যবসায়িক কাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ হয়তো উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। আবার অন্যদের আশঙ্কা, একবার যদি বিনিয়োগকারীদের লাভের হিসাব ফুটবলের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তবে খেলাটির মানবিক সৌন্দর্য ধীরে ধীরে মুনাফার অঙ্কে বন্দি হয়ে যাবে।

Share this news as a Photo Card