নিউইয়র্ক ০৫:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাতারের উপহারের বিমানে তুরস্ক গেলেন ট্রাম্প, ফিরলেন পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে

  • আপডেটের সময় : ১০:৪১:৫২ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
  • ৪ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে গত মঙ্গলবার কাতারের উপহার দেওয়া নতুন সংস্কার করা উড়োজাহাজে তুরস্কে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটিই ছিল উড়োজাহাজটির প্রথম আন্তর্জাতিক যাত্রা। তবে বুধবার রাতে তুরস্ক ছাড়ার সময় আকস্মিকভাবে ওই উড়োজাহাজে না উঠে পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ এ যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

পরে ইংল্যান্ডের মিলডেনহল ঘাঁটিতে পৌঁছে ট্রাম্প আবার নতুন উড়োজাহাজে ওঠেন এবং সেখান থেকে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, ইরানের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা হিসেবে এ পরিবর্তন আনা হয়। সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল।

নতুন উড়োজাহাজটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এ সিদ্ধান্তের পর আরও প্রশ্ন উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত উড়োজাহাজটি ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে গত এক বছরে এতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম যথাযথভাবে যুক্ত করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন সংশয় তৈরি হয়েছে।

আইনপ্রণেতা ও কয়েকজন কর্মকর্তার আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়সীমার চাপের কারণে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রেসিডেন্টের সুরক্ষায় ব্যবহৃত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।

এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, ‘নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান একটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ। এতে উচ্চমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট এবং তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শত্রুর লক্ষ্যবস্তু তিনি। তাই এসব হুমকি মোকাবিলায় আমরা আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করি, যার মধ্যে বিভ্রান্তিমূলক কৌশল এবং দৃষ্টি ভিন্নদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।’

তবে নতুন উড়োজাহাজটির সক্ষমতা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা, যারা স্পর্শকাতর নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, ‘নতুন উড়োজাহাজটিতে পুরোনো উড়োজাহাজটির সব সুবিধা নেই। তাদের ভাষ্য, তুরস্ক থেকে ফেরার সময় প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট কোনো হুমকির কারণে নয়; বরং সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শে নেওয়া একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল।’

নিজের নতুন উড়োজাহাজের বিলাসবহুল সুবিধাগুলো নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করা ট্রাম্প সোমবার রাতে সেই নতুন উড়োজাহাজেই ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই ইরানের সঙ্গে সংঘাত আবার শুরু হয় এবং ট্রাম্প ও ন্যাটো নেতারা যখন আঙ্কারায় প্রায় এক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা চালায়।

বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অস্বীকার করেন যে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে তিনি উড়োজাহাজ পরিবর্তন করেছিলেন। বরং তিনি দাবি করেন, নতুন উড়োজাহাজটি যাতে আগেভাগে রওনা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে থামতে পারে এবং সেখানে অবস্থানরত সেনাদের দেখানো যায়, সে কারণেই এই পরিবর্তন করা হয়েছিল। তার ভাষায়, উড়োজাহাজটি ‘অসাধারণ’।

তবে আঙ্কারায় সাংবাদিকেরা যখন তাকে উড়োজাহাজ পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে চাপ দিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন ট্রাম্প বারবার বলেন যে তিনি ইরানের এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি তেহরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকা দেখেছেন অথবা সে সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছে।এর আগে বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প লিখেছিলেন, তিনি ‘পুরোনো দিনের স্মৃতির খাতিরে’ আঙ্কারা থেকে পুরোনো বিমানেই যাত্রা করবেন। আর নতুন উড়োজাহাজটি ইংল্যান্ডের মিলডেনহল ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা উড়োজাহাজটি ঘুরে দেখার সুযোগ পান।

সিক্রেট সার্ভিস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা জানায়, প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টই এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

ট্রাম্প যখন আঙ্কারা ত্যাগ করেন, তখন তিনি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে পুরোনো বিমানে ওঠেন। ফলে তার সঙ্গে সফররত সাংবাদিকেরা সাধারণত যেভাবে সিঁড়ি বেয়ে বিমানে ওঠার দৃশ্য দেখেন বা ছবি তোলেন, সেদিন তা করতে পারেননি।

এ ছাড়া বিমানে থাকা যাত্রীদের উড্ডয়নের আগে জানালার পর্দা নামিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

উড়োজাহাজটি বুধবার গভীর রাতে মিলডেনহল ঘাঁটিতে অবতরণ করে। এরপর প্রেসিডেন্ট নতুন বিমানে উঠে ওয়াশিংটনে ফিরে যান।

আঙ্কারা ছাড়ার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভবত তাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, কারণ ইরানের হুমকির কারণে তারা ‘একটি বিপজ্জনক উড়োজাহাজে’ ছিলেন।

বহুদিন ধরেই জানা যায়, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা আসন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভ্রান্ত বা অকার্যকর করে দিতে পারে। এ ছাড়া এতে এমন বিশেষ ধাতব কণা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভ্রান্ত করে লক্ষ্যচ্যুত করতে সক্ষম।

কাতারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটিতে এসব সক্ষমতার কতগুলো সংযোজন করা হয়েছে, বা আদৌ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। অথচ ট্রাম্প দ্রুত এই উড়োজাহাজটিকে সরকারি দায়িত্বে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন।

প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বলেন, এত বড় ধরনের নিরাপত্তা উন্নয়ন সম্পন্ন করতে প্রায় একশ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে এবং এতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্যে বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় ই. মেইঙ্ক বলেন, এই পরিবর্তনগুলোর ব্যয় ‘সম্ভবত চল্লিশ কোটি ডলারেরও কম’ হবে।

গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবাহিনী এই ৭৪৭ জেটলাইনার মডেলের উড়োজাহাজটির উন্নয়নকাজ শুরু করে।

সে সময় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে উড়োজাহাজটিকে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আকাশপথে যাতায়াতের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। তবে উন্নয়নকাজের অন্য সব তথ্য গোপনীয় বলে জানানো হয়।

এই পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য এর সমালোচনা করেন।

তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, ট্রাম্প হয়তো বিমানবাহিনীর ওপর এত দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ দেবেন যে উড়োজাহাজটিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা সম্ভব হবে না। এর মধ্যে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক বিস্ফোরণের তড়িৎচৌম্বকীয় প্রভাব থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বিমানবাহিনীর বর্ণনা অনুযায়ী, উড়োজাহাজটির সংস্কার ও পুনর্গঠনের বড় একটি অংশ টেক্সাসের এমন একটি স্থাপনায় সম্পন্ন হয়েছে, যা গোপন প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য পরিচিত।

বাইডেন প্রশাসনের সময় এয়ার ফোর্স ওয়ান কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা বিমানবাহিনীর সাবেক সহকারী সচিব অ্যান্ড্রু পি. হান্টার বলেন, একটি ৭৪৭ মডেলের উড়োজাহাজকে প্রকৃত অর্থে এয়ার ফোর্স ওয়ানে রূপান্তর করতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগে।

তিনি বলেন, মূল উড়োজাহাজটি যত বিলাসবহুলই হোক না কেন, বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজনের জন্য এর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়। কাতারের উপহার দেওয়া উড়োজাহাজটিকে সংস্কার করার জন্য বিমানবাহিনীর হাতে যে সময় ছিল, তা এমন কাজের জন্য যথেষ্ট না।

হান্টার নিরাপত্তাজনিত গোপনীয়তার কারণে জটিল নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করতে রাজি হননি।

তবে অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, এসব জটিল উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে তড়িৎচৌম্বকীয় অভিঘাত থেকে সুরক্ষার জন্য উড়োজাহাজটির বৈদ্যুতিক তারব্যবস্থাকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করা। তবে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটিতে এসব কাজ করা হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

হান্টার বলেন, ‘তাদের হাতে যে সময় ছিল, তাতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি এমন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সব সময় যোগাযোগ রাখতে পারেন। কিন্তু এমন কোনো কাজ করা সম্ভব নয়, যার জন্য উড়োজাহাজটির কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি উড়োজাহাজকে পূর্ণাঙ্গ এয়ার ফোর্স ওয়ানের সমমানের করে তুলতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য।’

চলতি বছরের শুরুতে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বিমানবাহিনীর কাছে জানতে চেয়েছিল, কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটির উন্নয়নকাজে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না। তবে বিমানবাহিনী ওই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

দক্ষিণ স্পেনে ভয়াবহ দাবানলে নিহত ১২, আগুন নিয়ন্ত্রণে শতাধিক দমকলকর্মীর লড়াই

পর্তুগালের নতুন কোচ হলেন হোর্হে জেসুস 

১১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

কাতারের উপহারের বিমানে তুরস্ক গেলেন ট্রাম্প, ফিরলেন পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে

আপডেটের সময় : ১০:৪১:৫২ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে গত মঙ্গলবার কাতারের উপহার দেওয়া নতুন সংস্কার করা উড়োজাহাজে তুরস্কে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটিই ছিল উড়োজাহাজটির প্রথম আন্তর্জাতিক যাত্রা। তবে বুধবার রাতে তুরস্ক ছাড়ার সময় আকস্মিকভাবে ওই উড়োজাহাজে না উঠে পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ এ যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

পরে ইংল্যান্ডের মিলডেনহল ঘাঁটিতে পৌঁছে ট্রাম্প আবার নতুন উড়োজাহাজে ওঠেন এবং সেখান থেকে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, ইরানের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা হিসেবে এ পরিবর্তন আনা হয়। সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল।

নতুন উড়োজাহাজটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এ সিদ্ধান্তের পর আরও প্রশ্ন উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত উড়োজাহাজটি ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে গত এক বছরে এতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম যথাযথভাবে যুক্ত করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন সংশয় তৈরি হয়েছে।

আইনপ্রণেতা ও কয়েকজন কর্মকর্তার আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়সীমার চাপের কারণে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রেসিডেন্টের সুরক্ষায় ব্যবহৃত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।

এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, ‘নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান একটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ। এতে উচ্চমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট এবং তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শত্রুর লক্ষ্যবস্তু তিনি। তাই এসব হুমকি মোকাবিলায় আমরা আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করি, যার মধ্যে বিভ্রান্তিমূলক কৌশল এবং দৃষ্টি ভিন্নদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।’

তবে নতুন উড়োজাহাজটির সক্ষমতা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা, যারা স্পর্শকাতর নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, ‘নতুন উড়োজাহাজটিতে পুরোনো উড়োজাহাজটির সব সুবিধা নেই। তাদের ভাষ্য, তুরস্ক থেকে ফেরার সময় প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট কোনো হুমকির কারণে নয়; বরং সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শে নেওয়া একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল।’

নিজের নতুন উড়োজাহাজের বিলাসবহুল সুবিধাগুলো নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করা ট্রাম্প সোমবার রাতে সেই নতুন উড়োজাহাজেই ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই ইরানের সঙ্গে সংঘাত আবার শুরু হয় এবং ট্রাম্প ও ন্যাটো নেতারা যখন আঙ্কারায় প্রায় এক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা চালায়।

বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অস্বীকার করেন যে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে তিনি উড়োজাহাজ পরিবর্তন করেছিলেন। বরং তিনি দাবি করেন, নতুন উড়োজাহাজটি যাতে আগেভাগে রওনা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে থামতে পারে এবং সেখানে অবস্থানরত সেনাদের দেখানো যায়, সে কারণেই এই পরিবর্তন করা হয়েছিল। তার ভাষায়, উড়োজাহাজটি ‘অসাধারণ’।

তবে আঙ্কারায় সাংবাদিকেরা যখন তাকে উড়োজাহাজ পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে চাপ দিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন ট্রাম্প বারবার বলেন যে তিনি ইরানের এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি তেহরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকা দেখেছেন অথবা সে সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছে।এর আগে বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প লিখেছিলেন, তিনি ‘পুরোনো দিনের স্মৃতির খাতিরে’ আঙ্কারা থেকে পুরোনো বিমানেই যাত্রা করবেন। আর নতুন উড়োজাহাজটি ইংল্যান্ডের মিলডেনহল ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা উড়োজাহাজটি ঘুরে দেখার সুযোগ পান।

সিক্রেট সার্ভিস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা জানায়, প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টই এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

ট্রাম্প যখন আঙ্কারা ত্যাগ করেন, তখন তিনি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে পুরোনো বিমানে ওঠেন। ফলে তার সঙ্গে সফররত সাংবাদিকেরা সাধারণত যেভাবে সিঁড়ি বেয়ে বিমানে ওঠার দৃশ্য দেখেন বা ছবি তোলেন, সেদিন তা করতে পারেননি।

এ ছাড়া বিমানে থাকা যাত্রীদের উড্ডয়নের আগে জানালার পর্দা নামিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

উড়োজাহাজটি বুধবার গভীর রাতে মিলডেনহল ঘাঁটিতে অবতরণ করে। এরপর প্রেসিডেন্ট নতুন বিমানে উঠে ওয়াশিংটনে ফিরে যান।

আঙ্কারা ছাড়ার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভবত তাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, কারণ ইরানের হুমকির কারণে তারা ‘একটি বিপজ্জনক উড়োজাহাজে’ ছিলেন।

বহুদিন ধরেই জানা যায়, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা আসন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভ্রান্ত বা অকার্যকর করে দিতে পারে। এ ছাড়া এতে এমন বিশেষ ধাতব কণা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভ্রান্ত করে লক্ষ্যচ্যুত করতে সক্ষম।

কাতারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটিতে এসব সক্ষমতার কতগুলো সংযোজন করা হয়েছে, বা আদৌ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। অথচ ট্রাম্প দ্রুত এই উড়োজাহাজটিকে সরকারি দায়িত্বে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিলেন।

প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বলেন, এত বড় ধরনের নিরাপত্তা উন্নয়ন সম্পন্ন করতে প্রায় একশ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে এবং এতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্যে বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় ই. মেইঙ্ক বলেন, এই পরিবর্তনগুলোর ব্যয় ‘সম্ভবত চল্লিশ কোটি ডলারেরও কম’ হবে।

গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবাহিনী এই ৭৪৭ জেটলাইনার মডেলের উড়োজাহাজটির উন্নয়নকাজ শুরু করে।

সে সময় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে উড়োজাহাজটিকে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আকাশপথে যাতায়াতের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। তবে উন্নয়নকাজের অন্য সব তথ্য গোপনীয় বলে জানানো হয়।

এই পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য এর সমালোচনা করেন।

তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, ট্রাম্প হয়তো বিমানবাহিনীর ওপর এত দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ দেবেন যে উড়োজাহাজটিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা সম্ভব হবে না। এর মধ্যে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক বিস্ফোরণের তড়িৎচৌম্বকীয় প্রভাব থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বিমানবাহিনীর বর্ণনা অনুযায়ী, উড়োজাহাজটির সংস্কার ও পুনর্গঠনের বড় একটি অংশ টেক্সাসের এমন একটি স্থাপনায় সম্পন্ন হয়েছে, যা গোপন প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য পরিচিত।

বাইডেন প্রশাসনের সময় এয়ার ফোর্স ওয়ান কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা বিমানবাহিনীর সাবেক সহকারী সচিব অ্যান্ড্রু পি. হান্টার বলেন, একটি ৭৪৭ মডেলের উড়োজাহাজকে প্রকৃত অর্থে এয়ার ফোর্স ওয়ানে রূপান্তর করতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগে।

তিনি বলেন, মূল উড়োজাহাজটি যত বিলাসবহুলই হোক না কেন, বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজনের জন্য এর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়। কাতারের উপহার দেওয়া উড়োজাহাজটিকে সংস্কার করার জন্য বিমানবাহিনীর হাতে যে সময় ছিল, তা এমন কাজের জন্য যথেষ্ট না।

হান্টার নিরাপত্তাজনিত গোপনীয়তার কারণে জটিল নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করতে রাজি হননি।

তবে অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, এসব জটিল উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে তড়িৎচৌম্বকীয় অভিঘাত থেকে সুরক্ষার জন্য উড়োজাহাজটির বৈদ্যুতিক তারব্যবস্থাকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করা। তবে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটিতে এসব কাজ করা হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

হান্টার বলেন, ‘তাদের হাতে যে সময় ছিল, তাতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি এমন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সব সময় যোগাযোগ রাখতে পারেন। কিন্তু এমন কোনো কাজ করা সম্ভব নয়, যার জন্য উড়োজাহাজটির কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি উড়োজাহাজকে পূর্ণাঙ্গ এয়ার ফোর্স ওয়ানের সমমানের করে তুলতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য।’

চলতি বছরের শুরুতে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বিমানবাহিনীর কাছে জানতে চেয়েছিল, কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটির উন্নয়নকাজে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না। তবে বিমানবাহিনী ওই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

Share this news as a Photo Card