নিউইয়র্ক ১২:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে প্রাণ হারালো নান্দাইলের মামুন

  • আপডেটের সময় : ০৭:৪৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৩ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার যুবক মামুন মিয়া (২৫)। পরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে তার পরিবার ও সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী জানিয়েছেন।

নিহত মামুন উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় গত ৭ মে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ইলেকট্রনিক শ্রমিক হিসেবে উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান মামুন। এ জন্য এজেন্সির সঙ্গে তার সাড়ে আট লাখ টাকার চুক্তি হয়। মামুনের সঙ্গে আরও প্রায় ৩০ জনের একটি দল ছিল।

পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিন পর এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট একটি পাচারকারী চক্র মামুনসহ ওই দলের যুবকদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।

মামুনের সঙ্গে থাকা ঝিনাইদহের রাজন মিয়া মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হন। ওই হামলায় রাজনও গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন বলে জানান।

মামুনের মৃত্যুর খবর পরিবারে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে পরিবারটি।

বুধবার দুপুরে মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের সামনে উঠানে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। খবর পেয়ে আশপাশের লোকজনও তাদের বাড়িতে ভিড় করেন।

নিহতের স্ত্রী মহিমা আক্তার বলেন, “গত ২৬ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। তখন মামুন জানিয়েছিল, সে যুদ্ধে আছে। প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে ওয়াই-ফাই সংযোগ করে কথা বলতে হয়েছিল। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। মরদেহ কীভাবে দেশে আনব, সেটাও জানি না। সরকারের কাছে আমার স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।”

মামুনের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, “সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর জন্য চার মাস আগে সাড়ে ৮ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ ও ধার করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। এখনও কারও টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। সমিতির লোকজন টাকা নিতে এসে ঘুরে যাচ্ছে। একমাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি হবে, ভাবতেও পারিনি। দুই নাতিকে কীভাবে বড় করব, তাও বুঝতে পারছি না।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, “ছেলেটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রাশিয়ায় গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।”

স্বজনদের অভিযোগ, উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে একটি চক্র প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে যুবকদের যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তারা অভিযুক্ত এজেন্সি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে নিহত মামুনের মরদেহ দ্রুত সরকারি উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তার পরিবার।

নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। পরিবারের কেউ থানায় অভিযোগ দিলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

ভারতে বাংলাদেশের মতো ‘পরিস্থিতি’ তৈরির চেষ্টা করছে কংগ্রেস: বিজেপি

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনে ৫ শিশুসহ ২৮ জন নিহত

০৮ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে প্রাণ হারালো নান্দাইলের মামুন

আপডেটের সময় : ০৭:৪৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার যুবক মামুন মিয়া (২৫)। পরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে তার পরিবার ও সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী জানিয়েছেন।

নিহত মামুন উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় গত ৭ মে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ইলেকট্রনিক শ্রমিক হিসেবে উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান মামুন। এ জন্য এজেন্সির সঙ্গে তার সাড়ে আট লাখ টাকার চুক্তি হয়। মামুনের সঙ্গে আরও প্রায় ৩০ জনের একটি দল ছিল।

পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিন পর এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট একটি পাচারকারী চক্র মামুনসহ ওই দলের যুবকদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।

মামুনের সঙ্গে থাকা ঝিনাইদহের রাজন মিয়া মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হন। ওই হামলায় রাজনও গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন বলে জানান।

মামুনের মৃত্যুর খবর পরিবারে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে পরিবারটি।

বুধবার দুপুরে মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের সামনে উঠানে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। খবর পেয়ে আশপাশের লোকজনও তাদের বাড়িতে ভিড় করেন।

নিহতের স্ত্রী মহিমা আক্তার বলেন, “গত ২৬ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। তখন মামুন জানিয়েছিল, সে যুদ্ধে আছে। প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে ওয়াই-ফাই সংযোগ করে কথা বলতে হয়েছিল। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। মরদেহ কীভাবে দেশে আনব, সেটাও জানি না। সরকারের কাছে আমার স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।”

মামুনের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, “সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর জন্য চার মাস আগে সাড়ে ৮ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ ও ধার করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। এখনও কারও টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। সমিতির লোকজন টাকা নিতে এসে ঘুরে যাচ্ছে। একমাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি হবে, ভাবতেও পারিনি। দুই নাতিকে কীভাবে বড় করব, তাও বুঝতে পারছি না।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, “ছেলেটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রাশিয়ায় গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।”

স্বজনদের অভিযোগ, উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে একটি চক্র প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে যুবকদের যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তারা অভিযুক্ত এজেন্সি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে নিহত মামুনের মরদেহ দ্রুত সরকারি উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তার পরিবার।

নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। পরিবারের কেউ থানায় অভিযোগ দিলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

Share this news as a Photo Card