নিউইয়র্ক ০৬:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা, সুমানগঞ্জের ৭ তরুণের হদিস নেই

  • আপডেটের সময় : ০৭:২২:৪০ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের কয়েকজন তরুণ নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই মুখ খুলছেন না। দালালচক্রের ভয়, হুমকি ও সন্তানদের জীবিত উদ্ধারের আশ্বাসের কারণে পরিবারগুলো তথ্য দিতে দ্বিধা করছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে অন্তত সাতজন তরুণ নিখোঁজের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- শান্তিগঞ্জ উপজেলার চিকারকান্দি গ্রামের মামুন খান, রিপন মিয়া ও এনাম উদ্দিন, শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় চন্দ্র পাল এবং রনসী গ্রামের ছাব্বির হোসেন তালহা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্বজন জানান, নিখোঁজ তরুণরা কোথায় আছেন, কার কাছে আছেন, এমনকি তারা জীবিত না মৃত, সেটিও তারা নিশ্চিত নন। সন্তানরা জীবিত থাকলে তাদের উদ্ধারে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে দালালদের বিরুদ্ধে কথা বললে সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

পরিবারগুলোর সঙ্গে দালালদের এমন প্রতিশ্রুতিও রয়েছে যে, কোনো সমস্যা হলে কিংবা ‘গেম’ বাতিল হলে গচ্ছিত টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কথা বললে কেউ মারা গিয়ে থাকলে ‘কনট্রাক্টের’ টাকা ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনরা।

এদিকে, নিখোঁজদের কারও কারও সন্ধান পাওয়ার খবরও ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা। এসব কারণে দালালদের বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না তাঁরা।

একজন স্বজন বলেন, আমাদের ছেলেগুলো মহাবিপদে আছে। জীবিত না মৃত, তাও জানি না। যদি বেঁচে থাকে, তাহলে দালালদের পায়ে ধরে হলেও জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলেই শুকরিয়া। নামধাম বলার সময় এখন নয়। তবে পরিস্থিতির ব্যত্যয় ঘটলে আমরা সবকিছু বলব।

পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে চাইছেন না। ফলে নিখোঁজদের উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্বজনরা জানিয়েছেন, তাদের সন্তানরা অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। যাতায়াতের চুক্তি তাঁদের সন্তানরাই করেছিল বলে দাবি পরিবারের। তাঁরা শুধু টাকা দিয়েছেন। তবে কাকে টাকা দিয়েছেন, সে তথ্যও স্পষ্ট করে বলতে চাইছেন না তাঁরা।

সুনামগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাজমুস সাকিব বলেন, ‘দালালচক্র ভিকটিমের পরিবারকে এক ধরনের ফাঁদে ফেলে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করছে। বৈধ পথে বিদেশগামীদের কোনো সমস্যা হলে আমরা দেখতে পারি। কিন্তু অবৈধ পথে যারা যান, তাঁদের আমরা চাইলেও দেখতে পারি না। এই পথ ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। সচেতনতা বাড়াতে হবে। এভাবে যাওয়ার পথ থেকে মুখ ফিরাতে হবে। তাঁরা কথা না বললে এই চক্র আরও সাহস পাবে।’

তিনি জানান, বৈধ পথে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য সুনামগঞ্জের ১৩ হাজার ২৪০ জন ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেজিস্ট্রেশন করেছেন।

শান্তিগঞ্জ থানার ওসি ওলী উল্লাহ বলেন, এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিভাবকদের কাছে গিয়ে অনেক বুঝিয়েও তথ্য নেওয়া যাচ্ছে না। তারা দালালদের দিকে চেয়ে আছেন। সন্তানের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা নিদারুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়াকে আরও উৎসাহিত করবে। তাদের উচিত পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা। আমরা তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখব।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা বলেন, কাউকে কিছু না জানিয়ে আমি এবং শান্তিগঞ্জ থানার ওসি ওলী উল্লাহ পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে গিয়েছিলাম। কথা বলে তেমন কিছু উদ্ধার করতে পারিনি। তারা কোনো ধরনের সহযোগিতামূলক বক্তব্য দেননি। তারা সহযোগিতা না করলে আমরা কতটুকু ফলপ্রসূ কাজ করতে পারব, তা আপনারা বুঝতেই পারছেন।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের ছেলে কনট্রাক্ট করেছে। কিন্তু কীভাবে করল বা গেল, তা তারা জানেন না। মূলত তারা আমাদের তথ্য দিতে রাজি নন। এখানে তারা আরেক প্রলোভনে পড়েছেন। দালালরা সম্ভবত তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, তাদের ছেলেদের ফিরিয়ে দেবে। হতে পারে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা অন্য কোনো কিছু। এজন্য মুখ খুলছেন না। এই মুখ না খোলা আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের অপেক্ষায় দিল্লি: দীনেশ ত্রিবেদী

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের 'অর্থনৈতিক যুদ্ধ' ঘোষণা

২১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা, সুমানগঞ্জের ৭ তরুণের হদিস নেই

আপডেটের সময় : ০৭:২২:৪০ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের কয়েকজন তরুণ নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই মুখ খুলছেন না। দালালচক্রের ভয়, হুমকি ও সন্তানদের জীবিত উদ্ধারের আশ্বাসের কারণে পরিবারগুলো তথ্য দিতে দ্বিধা করছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে অন্তত সাতজন তরুণ নিখোঁজের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- শান্তিগঞ্জ উপজেলার চিকারকান্দি গ্রামের মামুন খান, রিপন মিয়া ও এনাম উদ্দিন, শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় চন্দ্র পাল এবং রনসী গ্রামের ছাব্বির হোসেন তালহা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্বজন জানান, নিখোঁজ তরুণরা কোথায় আছেন, কার কাছে আছেন, এমনকি তারা জীবিত না মৃত, সেটিও তারা নিশ্চিত নন। সন্তানরা জীবিত থাকলে তাদের উদ্ধারে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে দালালদের বিরুদ্ধে কথা বললে সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

পরিবারগুলোর সঙ্গে দালালদের এমন প্রতিশ্রুতিও রয়েছে যে, কোনো সমস্যা হলে কিংবা ‘গেম’ বাতিল হলে গচ্ছিত টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কথা বললে কেউ মারা গিয়ে থাকলে ‘কনট্রাক্টের’ টাকা ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনরা।

এদিকে, নিখোঁজদের কারও কারও সন্ধান পাওয়ার খবরও ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা। এসব কারণে দালালদের বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না তাঁরা।

একজন স্বজন বলেন, আমাদের ছেলেগুলো মহাবিপদে আছে। জীবিত না মৃত, তাও জানি না। যদি বেঁচে থাকে, তাহলে দালালদের পায়ে ধরে হলেও জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলেই শুকরিয়া। নামধাম বলার সময় এখন নয়। তবে পরিস্থিতির ব্যত্যয় ঘটলে আমরা সবকিছু বলব।

পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে চাইছেন না। ফলে নিখোঁজদের উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্বজনরা জানিয়েছেন, তাদের সন্তানরা অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। যাতায়াতের চুক্তি তাঁদের সন্তানরাই করেছিল বলে দাবি পরিবারের। তাঁরা শুধু টাকা দিয়েছেন। তবে কাকে টাকা দিয়েছেন, সে তথ্যও স্পষ্ট করে বলতে চাইছেন না তাঁরা।

সুনামগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাজমুস সাকিব বলেন, ‘দালালচক্র ভিকটিমের পরিবারকে এক ধরনের ফাঁদে ফেলে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করছে। বৈধ পথে বিদেশগামীদের কোনো সমস্যা হলে আমরা দেখতে পারি। কিন্তু অবৈধ পথে যারা যান, তাঁদের আমরা চাইলেও দেখতে পারি না। এই পথ ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। সচেতনতা বাড়াতে হবে। এভাবে যাওয়ার পথ থেকে মুখ ফিরাতে হবে। তাঁরা কথা না বললে এই চক্র আরও সাহস পাবে।’

তিনি জানান, বৈধ পথে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য সুনামগঞ্জের ১৩ হাজার ২৪০ জন ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেজিস্ট্রেশন করেছেন।

শান্তিগঞ্জ থানার ওসি ওলী উল্লাহ বলেন, এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিভাবকদের কাছে গিয়ে অনেক বুঝিয়েও তথ্য নেওয়া যাচ্ছে না। তারা দালালদের দিকে চেয়ে আছেন। সন্তানের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা নিদারুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়াকে আরও উৎসাহিত করবে। তাদের উচিত পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা। আমরা তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখব।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা বলেন, কাউকে কিছু না জানিয়ে আমি এবং শান্তিগঞ্জ থানার ওসি ওলী উল্লাহ পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে গিয়েছিলাম। কথা বলে তেমন কিছু উদ্ধার করতে পারিনি। তারা কোনো ধরনের সহযোগিতামূলক বক্তব্য দেননি। তারা সহযোগিতা না করলে আমরা কতটুকু ফলপ্রসূ কাজ করতে পারব, তা আপনারা বুঝতেই পারছেন।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের ছেলে কনট্রাক্ট করেছে। কিন্তু কীভাবে করল বা গেল, তা তারা জানেন না। মূলত তারা আমাদের তথ্য দিতে রাজি নন। এখানে তারা আরেক প্রলোভনে পড়েছেন। দালালরা সম্ভবত তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, তাদের ছেলেদের ফিরিয়ে দেবে। হতে পারে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা অন্য কোনো কিছু। এজন্য মুখ খুলছেন না। এই মুখ না খোলা আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

Share this news as a Photo Card