নিউইয়র্ক ০২:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার, মহানায়কের মুগ্ধতা আজও অমলিন

  • আপডেটের সময় : ১০:২১:৩১ পূর্বাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

অভিনেতা উত্তম কুমার। বাংলা চলচ্চিত্রে তাকে বলা হয় মহানায়ক। সেলুলয়েডের পর্দায় তার এক চিলতে হাসি, সংলাপ উচ্চারণের স্বতন্ত্র ভঙ্গি কিংবা ব্যক্তিত্বের নিজস্বতা- চার দশক পার হয়েও এতটুকু ফিকে হয়নি।  আজ ৩ সেপ্টেম্বর বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তির জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া এ কালজয়ী তারকা শতবর্ষে পা রাখলেন।উত্তম কুমারকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই প্রথমে মনে পড়ে তার হাসি, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার জুটি কিংবা বাংলা সিনেমার রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তার জনপ্রিয়তা। কিন্তু শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাকে দেখলে তার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোই আড়ালে থেকে যায়। কারণ উত্তম কুমারের প্রকৃত কৃতিত্ব ছিল—তিনি নিজের তৈরি তারকা-ইমেজের ভেতর বন্দি থাকেননি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই ইমেজকে ভেঙে বারবার নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন।

অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর চলচ্চিত্রে অভিষেক ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’-এ। শুরুর কয়েক বছর ছিল সংগ্রামের। একের পর এক ছবিতে প্রত্যাশিত সাফল্য না আসায় তার নামের সঙ্গে ব্যর্থতার তকমাও জুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ এবং ১৯৫৩ সালের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন জনপ্রিয়তার সূচনা করে।

পঞ্চাশের দশকে উত্তম কুমারের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে রোমান্টিক নায়ক। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’সহ বহু ছবিতে প্রেম, বিরহ ও আবেগের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে। তার অভিনয়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—অতিরিক্ত নাটকীয়তার বদলে চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করা। এ কারণেই তার অভিনয় অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি কিছু বলে যেত।

কিন্তু ষাটের দশকে উত্তম কুমারের অভিনয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি শুধু জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর না করে চরিত্রের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ‘এন্থনি ফিরিঙ্গি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘নায়ক’—এ ধরনের ছবিতে তার চরিত্র ও অভিনয়ের ধরন আগের রোমান্টিক নায়ক-ইমেজের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

এই বিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালের এই ছবিতে উত্তম কুমার অভিনয় করেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে। চরিত্রটি বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী ও সফল, কিন্তু ভেতরে রয়েছে অনুশোচনা, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও অতীতের চাপ। এই দ্বন্দ্বকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তম কুমার সেই চরিত্রে নিজের জনপ্রিয় তারকা-পরিচয়কেই যেন অভিনয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

‘নায়ক’-এর গুরুত্ব এখানেই যে, ছবির চরিত্রটি এক অর্থে উত্তম কুমারের নিজের তারকা-পরিচয়ের সঙ্গেও দর্শককে তুলনা করার সুযোগ দেয়। পর্দার সফল নায়ক আর ব্যক্তিগত জীবনের মানুষের মধ্যে যে দূরত্ব থাকে, সেই ব্যবধানকে তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে দৃশ্যমান করেন। ফলে ‘নায়ক’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের একটি বাঁকও হয়ে ওঠে।

সত্তরের দশকে এসে তার অভিনয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। ‘অমানুষ’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘মৌচাক’, ‘সব্যসাচী’, ‘দুই পৃথিবী’সহ বিভিন্ন ধরনের ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। কখনো রহস্যময়, কখনো গম্ভীর, কখনো সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে থাকা চরিত্র—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের তারকা-ব্যক্তিত্বকে চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছেন।

এখানেই উত্তম কুমারের সঙ্গে অনেক জনপ্রিয় নায়কের পার্থক্য। তিনি শুধু দর্শকের চাহিদা পূরণ করেননি; দর্শকের তৈরি করা নিজের একটি নির্দিষ্ট ইমেজের বিরুদ্ধেও কখনো কখনো গেছেন। তার ক্যারিয়ারে বাণিজ্যিক সাফল্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া কাজও। ফলে ‘জনপ্রিয়’ ও ‘গুণী’—এই দুই পরিচয়ের মধ্যে তাকে আলাদা করে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

অভিনয়ের পাশাপাশি উত্তম কুমার ছিলেন প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবেও সক্রিয়। অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে তিনি শুধু অভিনয়ের জায়গা হিসেবে দেখেননি; চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নিজের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করেছেন।

তার এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত ছিল আত্মপরিবর্তনের ক্ষমতা। পঞ্চাশের দশকের নায়ক যদি ছিলেন স্বপ্নের পুরুষ, ষাটের দশকে সেই নায়ক হয়ে উঠলেন জটিল মানুষ; আর সত্তরের দশকে তিনি ক্রমেই পরিণত চরিত্রের অভিনেতা। এই পরিবর্তনই তাঁকে দীর্ঘদিন দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রেখেছিল।

উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তার অভিনয় নিয়ে আলোচনা থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তার কিছু কাজ নতুন করে মূল্যায়িত হয়েছে। জন্মশতবর্ষে এসে সেই মূল্যায়নের সুযোগ আরও বড়। কারণ শত বছর পরেও তার অভিনয় শুধু স্মৃতির বিষয় নয়; অভিনয় শেখার, চলচ্চিত্রের ভাষা বোঝার এবং তারকা-সংস্কৃতি বিশ্লেষণের উপকরণ হিসেবেও তা গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ‘মহানায়ক’ শব্দটি উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে শুধু জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি নয়। তার ক্ষেত্রে এটি একটি দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার ফল—যেখানে একজন ব্যর্থ তরুণ অভিনেতা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় নায়ক, তারপর তারকা, এরপর বহুমাত্রিক অভিনেতা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই—তিনি তার সময়কে শুধু প্রতিনিধিত্ব করেননি; নিজের অভিনয় দিয়ে সেই সময়ের রুচি, স্বপ্ন ও আবেগকেও প্রভাবিত করেছিলেন। আর সেই কারণেই নায়ক উত্তম কুমার একসময় মহানায়ক হয়ে উঠেছিলেন।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

বাংলাদেশে পুরোপুরি বন্ধ নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি

আমরা যখন চাই, তখনই হামলা চালাতে প্রস্তুত: ট্রাম্প

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার, মহানায়কের মুগ্ধতা আজও অমলিন

আপডেটের সময় : ১০:২১:৩১ পূর্বাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অভিনেতা উত্তম কুমার। বাংলা চলচ্চিত্রে তাকে বলা হয় মহানায়ক। সেলুলয়েডের পর্দায় তার এক চিলতে হাসি, সংলাপ উচ্চারণের স্বতন্ত্র ভঙ্গি কিংবা ব্যক্তিত্বের নিজস্বতা- চার দশক পার হয়েও এতটুকু ফিকে হয়নি।  আজ ৩ সেপ্টেম্বর বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তির জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া এ কালজয়ী তারকা শতবর্ষে পা রাখলেন।উত্তম কুমারকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই প্রথমে মনে পড়ে তার হাসি, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার জুটি কিংবা বাংলা সিনেমার রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তার জনপ্রিয়তা। কিন্তু শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাকে দেখলে তার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোই আড়ালে থেকে যায়। কারণ উত্তম কুমারের প্রকৃত কৃতিত্ব ছিল—তিনি নিজের তৈরি তারকা-ইমেজের ভেতর বন্দি থাকেননি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই ইমেজকে ভেঙে বারবার নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন।

অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর চলচ্চিত্রে অভিষেক ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’-এ। শুরুর কয়েক বছর ছিল সংগ্রামের। একের পর এক ছবিতে প্রত্যাশিত সাফল্য না আসায় তার নামের সঙ্গে ব্যর্থতার তকমাও জুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ এবং ১৯৫৩ সালের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন জনপ্রিয়তার সূচনা করে।

পঞ্চাশের দশকে উত্তম কুমারের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে রোমান্টিক নায়ক। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’সহ বহু ছবিতে প্রেম, বিরহ ও আবেগের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে। তার অভিনয়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—অতিরিক্ত নাটকীয়তার বদলে চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করা। এ কারণেই তার অভিনয় অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি কিছু বলে যেত।

কিন্তু ষাটের দশকে উত্তম কুমারের অভিনয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি শুধু জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর না করে চরিত্রের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ‘এন্থনি ফিরিঙ্গি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘নায়ক’—এ ধরনের ছবিতে তার চরিত্র ও অভিনয়ের ধরন আগের রোমান্টিক নায়ক-ইমেজের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

এই বিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালের এই ছবিতে উত্তম কুমার অভিনয় করেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে। চরিত্রটি বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী ও সফল, কিন্তু ভেতরে রয়েছে অনুশোচনা, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও অতীতের চাপ। এই দ্বন্দ্বকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তম কুমার সেই চরিত্রে নিজের জনপ্রিয় তারকা-পরিচয়কেই যেন অভিনয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

‘নায়ক’-এর গুরুত্ব এখানেই যে, ছবির চরিত্রটি এক অর্থে উত্তম কুমারের নিজের তারকা-পরিচয়ের সঙ্গেও দর্শককে তুলনা করার সুযোগ দেয়। পর্দার সফল নায়ক আর ব্যক্তিগত জীবনের মানুষের মধ্যে যে দূরত্ব থাকে, সেই ব্যবধানকে তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে দৃশ্যমান করেন। ফলে ‘নায়ক’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের একটি বাঁকও হয়ে ওঠে।

সত্তরের দশকে এসে তার অভিনয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। ‘অমানুষ’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘মৌচাক’, ‘সব্যসাচী’, ‘দুই পৃথিবী’সহ বিভিন্ন ধরনের ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। কখনো রহস্যময়, কখনো গম্ভীর, কখনো সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে থাকা চরিত্র—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের তারকা-ব্যক্তিত্বকে চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছেন।

এখানেই উত্তম কুমারের সঙ্গে অনেক জনপ্রিয় নায়কের পার্থক্য। তিনি শুধু দর্শকের চাহিদা পূরণ করেননি; দর্শকের তৈরি করা নিজের একটি নির্দিষ্ট ইমেজের বিরুদ্ধেও কখনো কখনো গেছেন। তার ক্যারিয়ারে বাণিজ্যিক সাফল্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া কাজও। ফলে ‘জনপ্রিয়’ ও ‘গুণী’—এই দুই পরিচয়ের মধ্যে তাকে আলাদা করে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

অভিনয়ের পাশাপাশি উত্তম কুমার ছিলেন প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবেও সক্রিয়। অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে তিনি শুধু অভিনয়ের জায়গা হিসেবে দেখেননি; চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নিজের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করেছেন।

তার এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত ছিল আত্মপরিবর্তনের ক্ষমতা। পঞ্চাশের দশকের নায়ক যদি ছিলেন স্বপ্নের পুরুষ, ষাটের দশকে সেই নায়ক হয়ে উঠলেন জটিল মানুষ; আর সত্তরের দশকে তিনি ক্রমেই পরিণত চরিত্রের অভিনেতা। এই পরিবর্তনই তাঁকে দীর্ঘদিন দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রেখেছিল।

উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তার অভিনয় নিয়ে আলোচনা থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তার কিছু কাজ নতুন করে মূল্যায়িত হয়েছে। জন্মশতবর্ষে এসে সেই মূল্যায়নের সুযোগ আরও বড়। কারণ শত বছর পরেও তার অভিনয় শুধু স্মৃতির বিষয় নয়; অভিনয় শেখার, চলচ্চিত্রের ভাষা বোঝার এবং তারকা-সংস্কৃতি বিশ্লেষণের উপকরণ হিসেবেও তা গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ‘মহানায়ক’ শব্দটি উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে শুধু জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি নয়। তার ক্ষেত্রে এটি একটি দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার ফল—যেখানে একজন ব্যর্থ তরুণ অভিনেতা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় নায়ক, তারপর তারকা, এরপর বহুমাত্রিক অভিনেতা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই—তিনি তার সময়কে শুধু প্রতিনিধিত্ব করেননি; নিজের অভিনয় দিয়ে সেই সময়ের রুচি, স্বপ্ন ও আবেগকেও প্রভাবিত করেছিলেন। আর সেই কারণেই নায়ক উত্তম কুমার একসময় মহানায়ক হয়ে উঠেছিলেন।

Share this news as a Photo Card