নিউইয়র্ক ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংকটের বৃত্তে ন্যাশনাল ব্যাংক, পাঁচ বছরে বদলেছে ৬ এমডি

  • আপডেটের সময় : ০১:০৫:৩২ অপরাহ্ণ, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

সংকটের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ন‍্যাশনাল ব্যাংক। গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারায় ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দিলেও পরিচালনা ব‍্যর্থতা, ঘন ঘন এমডি বদলি, ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ব‍্যাংকটিকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে।

শাখায় শাখায় এখনও নগদ অর্থের সংকটে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা, এটিএমেও মিলছে না প্রয়োজনীয় টাকা। অন্যদিকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি, বিপুল খেলাপি ঋণ ও কর্পোরেট সুশাসনের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ব্যাংকটির অস্তিত্ব সংকটকে আরও গভীর করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নিয়ে নয়, সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ (প্রভিশন) রাখতে না পারায় প্রায় ১৯ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। ফলে ব্যাংকটির মূলধন ও তারল্য—উভয় ক্ষেত্রেই তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানায়, ৯০ দিনের জন্য ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ডিমান্ড প্রমিসরি (ডিপি) নোটের বিপরীতে ব্যাংকটিকে এক হাজার কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ মোকাবিলায় এ অর্থ ছাড় করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকটি গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে চাপের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতারা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই ঋণ দ্রুত ছেড়ে দেয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে আসেন মেলিতা মেহজাবিন।

ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ওই সময় ঈদকে ঘিরে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ বেড়েছিলো। তবে আমানত প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে নিজস্ব উৎস থেকে প্রয়োজনীয় তারল্য জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নিতে হয়েছে। কৃষিঋণ বাদেও নতুন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরও তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সমস্যা দূর না করে বারবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

ব্যাংকটির গ্রাহকদের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকার বেশি অর্থ উত্তোলনে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এটিএম বুথ থেকেও নিয়মিতভাবে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেতনভোগীসহ সাধারণ গ্রাহকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহক সাইদুল ইসলাম বলেন, চাকরির সুবাদে প্রায় দুই বছর ধরে তিনি গুলশান কর্পোরেট শাখায় একটি বেতন হিসাব পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বেতন জমা হওয়ার পরও অনেক সময় এটিএম বুথে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করা যায়নি। মাঝে মধ্যে অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকে সপ্তাহে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা তোলা গেলেও সেটিও নিয়মিত করা যায় না। ফলে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ না পেয়ে বাধ্য হয়ে সুপারশপে কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করে বেতনের টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

হোসাইন সাজ্জাদ নামে একজন গ্রাহক জানান, সম্প্রতি ১৫ হাজার টাকার একটি চেক নগদায়নের জন্য গুলশান শাখায় গিয়ে দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে দীর্ঘ বাকবিতণ্ডার পর তিনি টাকা তুলতে সক্ষম হন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির কার্যক্রম তদারকির জন্য ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-১২–এর পরিচালক মুনির আহমেদ চৌধুরীকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। কর্তব্যরত গার্ড জানান তিনি বাইরে আছেন। একাধিকবার কল ও এসএমএস পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, ‘এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নতুন করে ঋণ দেওয়া মস্ত বড় বোকামি হবে। আগে এসব ব্যাংকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।’

তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক দুর্বল ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের দুর্বলতার কারণে তারা যথাযথ আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এমন প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন কতটা কার্যকর হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আর্থিক সহায়তা দিতে চায়, তাহলে আগে কার্যকর সংস্কার, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর আর্থিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বজনগ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একটি ব্যাংক টিকে থাকে মূলত জনগণের আমানতের ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।’

দীর্ঘদিনের সংকট

ন্যাশনাল ব্যাংক একসময় দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ছিল। ২০০৮ সালের পর জয়নুল হক শিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর অনিয়ম, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। পরে পারিবারিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে যায়।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের অন্যতম। তবে পর্ষদে পরিবর্তন এলেও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ২৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাশনাল ব্যাংকের সংকট কাটাতে শুধু তারল্য সহায়তা যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি পূরণ, কার্যকর কর্পোরেট সুশাসন এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার—এই চারটি ক্ষেত্রেই একযোগে অগ্রগতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগ পেতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিটির মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। প্রতিবার চুক্তির মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর। পাশাপাশি অফসাইট বা অনসাইট পরিদর্শনে বিরূপ পর্যবেক্ষণ না থাকা, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যের পরিবারের কেউ না হওয়া এবং অন্তত ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।

কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংকে কর্পোরেট সুশাসনের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। গত পাঁচ বছরে ভারপ্রাপ্তসহ ছয়জন এমডি পদত্যাগ করেছেন, বাধ্যতামূলক ছুটিতে গেছেন অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক চেয়ারম্যান জয়নুল হক শিকদারের মৃত্যুর পর পরিচালকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণ এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে এমডির দায়িত্ব পরিচালনার ঘটনায় ২০২১ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে এ এস এম বুলবুলকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল শাহ সৈয়দ আবদুল বারী এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর মেহমুদ হোসেন যোগ দেন। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি আবারও এমডি হিসেবে দায়িত্বে ফেরেন।

একই সময় ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংক ঘোষণা দেয় মো. তৌহিদুল আলম খান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাংকে ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তৌহিদুল আলম খানও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

বর্তমান এমডি আদিল চৌধুরী ২০২৫ সালের ৭ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ন্যাশনাল ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি ইতোমধ্যে প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দেন ।

এই বিষয়ে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্বে থাকা ইমরান আহমেদ বলেন,

‘অন্তর্বর্তী সরকারের সবই ঠিক ছিল। কিন্তু তাদের একটি শব্দ ‘দেউলিয়া’ আমাদের ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। তাদের এই বক্তব্য আমাদের সিগনিফিক্যান্টলি শ্যাটার করেছে।’

ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম বড় ব্যাংক উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, একটি সময়ে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের তারল্য সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে আমানতকারীদের সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সহায়তায় ধীরে ধীরে পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসছে ব্যাংকটি।

এমডি ইমরান আহমেদ বলেন, ‘একটা ব্যাংকের প্রাণ হচ্ছে আমানত। আমানতকারীদের সহায়তায় আমরা আস্তে আস্তে এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসছি। বর্তমানে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পর্যায় থেকেও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছি।’

তবে ব্যাংকটির আমানত পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু দৈনিক যে পরিমাণ আমানত ব্যাংকে আসার কথা, সে অনুযায়ী আমানত আসছে না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহক একটা সময়ে ব্যাংক থেকে সরে গিয়েছিলেন। বাঙালি হিসেবে আমরা অনেক বড় বড় সমস্যা হয়তো ভুলে যাই। কিন্তু কোনো একটা বিষয় একবার মনের মধ্যে ঢুকে গেলে সেটি মন থেকে বের করতে পারি না। ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও আমরা সেটাই মোকাবিলা করছি।’

তিনি বলেন, ‘সবাই আমাদের ভালো বলছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল। আমাদের নেটওয়ার্কও শক্তিশালী। একটি ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ালে ন্যাশনাল ব্যাংকও ঘুরে দাঁড়াবে।’

ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকার সহায়তা নিয়েও ব্যাখ্যা দেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা এমন কোন বড় ফ্যাক্টর না।  মূলত আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে সহায়তা করার জন্যই এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকটি ৪৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক। এখানে ১ হাজার কোটি টাকা এমন কোনো বড় বিষয় নয়, যেটি ব্যাংকের বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেবে। এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনে সহায়তা করার জন্য দিয়েছে।’

তবে এই সহায়তার খবর প্রকাশ্যে এলে উল্টো ব্যাংকটিতে টাকা উত্তোলনের চাপ বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি। এ ধরনের তহবিল দিলে অনেক সময় আমাদের ভালো চেয়ে খারাপ হয় বেশি। তারল্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বর্তমানে কিছুটা ‘রেশনিং’ করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে ছোট অঙ্কের আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

বড় অঙ্কের টাকা একসঙ্গে উত্তোলনের ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রাহকদের টাকা তুলতে দিচ্ছি না—এটা ঠিক নয়। তবে তারা যেভাবে চাইছেন, একবারে সব টাকা তুলে নিতে পারছেন না। বড় অঙ্কের টাকা হলে আমাদের একটি পরিকল্পনার মধ্যে যেতে হচ্ছে।’

অন্যদিকে ৫ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১ লাখ টাকার মতো তুলনামূলক ছোট অঙ্কের অর্থ উত্তোলনে বড় ধরনের সমস্যা নেই বলে জানান তিনি। তবে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার কর্মীদের বেতন পরিশোধ এবং বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধের সময় তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়। প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে আমাদের রপ্তানি খাতের গ্রাহকদের কর্মীদের বেতন নিশ্চিত করতে হয়। তখন বড় অঙ্কের তারল্য ব্যবস্থাপনা করতে হয়। এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের রেশনিং করতে হচ্ছে।’

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আমদানি বিল পরিশোধের সময়ও একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে ওই সময় এক-দুই দিন কিছু গ্রাহক সমস্যায় পড়তে পারেন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি গ্রাহকদের সম্পূর্ণ সেবা দেওয়ার জন্য। খুব বেশি কষ্ট দেওয়া হচ্ছে বা টাকা দেওয়া হচ্ছে না—এটা আমি ঠিক মানবো না।’

ন্যাশনাল ব্যাংকের দুর্বলতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘তাদের তারল্য সংকট আছে—এটা নিয়ে আমি কিছু বলব না। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নিয়ে কোনো ব্যাংকই টিকে থাকতে পারে না। যদি তারা খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারে, তাহলেই তারা টিকে থাকতে পারবে। সেদিকেই তাদের জোর দিতে হবে, যাতে আমানতকারীদের চাহিদা পূরণ করতে পারে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল ২৯টি ব্যাংককে নতুন করে তারল্য সহায়তা না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে- একীভূত পাঁচটি ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং এবি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এসব ব্যাংকে আমানত সংগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

আয়ারল্যান্ডকে একীভূত করার পক্ষে ট্রাম্প, ক্ষুব্ধ যুক্তরাজ্য

সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের মিসাইল ও ড্রোন হামলা

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

সংকটের বৃত্তে ন্যাশনাল ব্যাংক, পাঁচ বছরে বদলেছে ৬ এমডি

আপডেটের সময় : ০১:০৫:৩২ অপরাহ্ণ, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংকটের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ন‍্যাশনাল ব্যাংক। গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারায় ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা দিলেও পরিচালনা ব‍্যর্থতা, ঘন ঘন এমডি বদলি, ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ব‍্যাংকটিকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে।

শাখায় শাখায় এখনও নগদ অর্থের সংকটে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা, এটিএমেও মিলছে না প্রয়োজনীয় টাকা। অন্যদিকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি, বিপুল খেলাপি ঋণ ও কর্পোরেট সুশাসনের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ব্যাংকটির অস্তিত্ব সংকটকে আরও গভীর করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নিয়ে নয়, সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ (প্রভিশন) রাখতে না পারায় প্রায় ১৯ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। ফলে ব্যাংকটির মূলধন ও তারল্য—উভয় ক্ষেত্রেই তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানায়, ৯০ দিনের জন্য ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ডিমান্ড প্রমিসরি (ডিপি) নোটের বিপরীতে ব্যাংকটিকে এক হাজার কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ মোকাবিলায় এ অর্থ ছাড় করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকটি গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে চাপের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতারা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই ঋণ দ্রুত ছেড়ে দেয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে আসেন মেলিতা মেহজাবিন।

ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ওই সময় ঈদকে ঘিরে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ বেড়েছিলো। তবে আমানত প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে নিজস্ব উৎস থেকে প্রয়োজনীয় তারল্য জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নিতে হয়েছে। কৃষিঋণ বাদেও নতুন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরও তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সমস্যা দূর না করে বারবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

ব্যাংকটির গ্রাহকদের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকার বেশি অর্থ উত্তোলনে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এটিএম বুথ থেকেও নিয়মিতভাবে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেতনভোগীসহ সাধারণ গ্রাহকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহক সাইদুল ইসলাম বলেন, চাকরির সুবাদে প্রায় দুই বছর ধরে তিনি গুলশান কর্পোরেট শাখায় একটি বেতন হিসাব পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বেতন জমা হওয়ার পরও অনেক সময় এটিএম বুথে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করা যায়নি। মাঝে মধ্যে অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকে সপ্তাহে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা তোলা গেলেও সেটিও নিয়মিত করা যায় না। ফলে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ না পেয়ে বাধ্য হয়ে সুপারশপে কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করে বেতনের টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

হোসাইন সাজ্জাদ নামে একজন গ্রাহক জানান, সম্প্রতি ১৫ হাজার টাকার একটি চেক নগদায়নের জন্য গুলশান শাখায় গিয়ে দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে দীর্ঘ বাকবিতণ্ডার পর তিনি টাকা তুলতে সক্ষম হন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির কার্যক্রম তদারকির জন্য ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ-১২–এর পরিচালক মুনির আহমেদ চৌধুরীকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। কর্তব্যরত গার্ড জানান তিনি বাইরে আছেন। একাধিকবার কল ও এসএমএস পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, ‘এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নতুন করে ঋণ দেওয়া মস্ত বড় বোকামি হবে। আগে এসব ব্যাংকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।’

তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক দুর্বল ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের দুর্বলতার কারণে তারা যথাযথ আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এমন প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন কতটা কার্যকর হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আর্থিক সহায়তা দিতে চায়, তাহলে আগে কার্যকর সংস্কার, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর আর্থিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বজনগ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একটি ব্যাংক টিকে থাকে মূলত জনগণের আমানতের ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।’

দীর্ঘদিনের সংকট

ন্যাশনাল ব্যাংক একসময় দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ছিল। ২০০৮ সালের পর জয়নুল হক শিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর অনিয়ম, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। পরে পারিবারিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে যায়।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের অন্যতম। তবে পর্ষদে পরিবর্তন এলেও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ২৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাশনাল ব্যাংকের সংকট কাটাতে শুধু তারল্য সহায়তা যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি পূরণ, কার্যকর কর্পোরেট সুশাসন এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার—এই চারটি ক্ষেত্রেই একযোগে অগ্রগতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগ পেতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিটির মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। প্রতিবার চুক্তির মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর। পাশাপাশি অফসাইট বা অনসাইট পরিদর্শনে বিরূপ পর্যবেক্ষণ না থাকা, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যের পরিবারের কেউ না হওয়া এবং অন্তত ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।

কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংকে কর্পোরেট সুশাসনের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। গত পাঁচ বছরে ভারপ্রাপ্তসহ ছয়জন এমডি পদত্যাগ করেছেন, বাধ্যতামূলক ছুটিতে গেছেন অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক চেয়ারম্যান জয়নুল হক শিকদারের মৃত্যুর পর পরিচালকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণ এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে এমডির দায়িত্ব পরিচালনার ঘটনায় ২০২১ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে এ এস এম বুলবুলকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল শাহ সৈয়দ আবদুল বারী এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর মেহমুদ হোসেন যোগ দেন। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি আবারও এমডি হিসেবে দায়িত্বে ফেরেন।

একই সময় ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংক ঘোষণা দেয় মো. তৌহিদুল আলম খান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাংকে ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তৌহিদুল আলম খানও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

বর্তমান এমডি আদিল চৌধুরী ২০২৫ সালের ৭ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ন্যাশনাল ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি ইতোমধ্যে প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দেন ।

এই বিষয়ে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্বে থাকা ইমরান আহমেদ বলেন,

‘অন্তর্বর্তী সরকারের সবই ঠিক ছিল। কিন্তু তাদের একটি শব্দ ‘দেউলিয়া’ আমাদের ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। তাদের এই বক্তব্য আমাদের সিগনিফিক্যান্টলি শ্যাটার করেছে।’

ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম বড় ব্যাংক উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, একটি সময়ে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের তারল্য সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে আমানতকারীদের সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সহায়তায় ধীরে ধীরে পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসছে ব্যাংকটি।

এমডি ইমরান আহমেদ বলেন, ‘একটা ব্যাংকের প্রাণ হচ্ছে আমানত। আমানতকারীদের সহায়তায় আমরা আস্তে আস্তে এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসছি। বর্তমানে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পর্যায় থেকেও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছি।’

তবে ব্যাংকটির আমানত পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু দৈনিক যে পরিমাণ আমানত ব্যাংকে আসার কথা, সে অনুযায়ী আমানত আসছে না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহক একটা সময়ে ব্যাংক থেকে সরে গিয়েছিলেন। বাঙালি হিসেবে আমরা অনেক বড় বড় সমস্যা হয়তো ভুলে যাই। কিন্তু কোনো একটা বিষয় একবার মনের মধ্যে ঢুকে গেলে সেটি মন থেকে বের করতে পারি না। ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও আমরা সেটাই মোকাবিলা করছি।’

তিনি বলেন, ‘সবাই আমাদের ভালো বলছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল। আমাদের নেটওয়ার্কও শক্তিশালী। একটি ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ালে ন্যাশনাল ব্যাংকও ঘুরে দাঁড়াবে।’

ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকার সহায়তা নিয়েও ব্যাখ্যা দেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা এমন কোন বড় ফ্যাক্টর না।  মূলত আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে সহায়তা করার জন্যই এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকটি ৪৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক। এখানে ১ হাজার কোটি টাকা এমন কোনো বড় বিষয় নয়, যেটি ব্যাংকের বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেবে। এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনে সহায়তা করার জন্য দিয়েছে।’

তবে এই সহায়তার খবর প্রকাশ্যে এলে উল্টো ব্যাংকটিতে টাকা উত্তোলনের চাপ বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি। এ ধরনের তহবিল দিলে অনেক সময় আমাদের ভালো চেয়ে খারাপ হয় বেশি। তারল্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বর্তমানে কিছুটা ‘রেশনিং’ করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে ছোট অঙ্কের আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

বড় অঙ্কের টাকা একসঙ্গে উত্তোলনের ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রাহকদের টাকা তুলতে দিচ্ছি না—এটা ঠিক নয়। তবে তারা যেভাবে চাইছেন, একবারে সব টাকা তুলে নিতে পারছেন না। বড় অঙ্কের টাকা হলে আমাদের একটি পরিকল্পনার মধ্যে যেতে হচ্ছে।’

অন্যদিকে ৫ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১ লাখ টাকার মতো তুলনামূলক ছোট অঙ্কের অর্থ উত্তোলনে বড় ধরনের সমস্যা নেই বলে জানান তিনি। তবে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার কর্মীদের বেতন পরিশোধ এবং বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধের সময় তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়। প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে আমাদের রপ্তানি খাতের গ্রাহকদের কর্মীদের বেতন নিশ্চিত করতে হয়। তখন বড় অঙ্কের তারল্য ব্যবস্থাপনা করতে হয়। এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের রেশনিং করতে হচ্ছে।’

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আমদানি বিল পরিশোধের সময়ও একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে ওই সময় এক-দুই দিন কিছু গ্রাহক সমস্যায় পড়তে পারেন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি গ্রাহকদের সম্পূর্ণ সেবা দেওয়ার জন্য। খুব বেশি কষ্ট দেওয়া হচ্ছে বা টাকা দেওয়া হচ্ছে না—এটা আমি ঠিক মানবো না।’

ন্যাশনাল ব্যাংকের দুর্বলতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘তাদের তারল্য সংকট আছে—এটা নিয়ে আমি কিছু বলব না। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নিয়ে কোনো ব্যাংকই টিকে থাকতে পারে না। যদি তারা খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারে, তাহলেই তারা টিকে থাকতে পারবে। সেদিকেই তাদের জোর দিতে হবে, যাতে আমানতকারীদের চাহিদা পূরণ করতে পারে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল ২৯টি ব্যাংককে নতুন করে তারল্য সহায়তা না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে- একীভূত পাঁচটি ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং এবি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এসব ব্যাংকে আমানত সংগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

Share this news as a Photo Card