নিউইয়র্ক ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ও ছিনতাইয়ে বিপর্যস্ত খুলনা

  • আপডেটের সময় : ১২:৪৪:২৮ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

খুলনা মহানগরীসহ পুরো জেলায় একের পর এক খুনের ঘটনায় তছনছ হয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবার। দুর্বৃত্তের গুলিতে সন্তান হারাচ্ছে বাবাকে, স্ত্রী হারাচ্ছে প্রিয় স্বামীকে, বোন হারাচ্ছে ভাইকে, বাবা-মা হারাচ্ছে আদরের সন্তানকে। একসময়ের শান্তির শহর খুলনায় পাল্লা দিয়ে চলছে খুন, চাঁদাবাজি আর গোলাগুলির মহোত্সব।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরে খুলনা মহানগরসহ জেলায় দুর্বৃত্তদের গুলি ও গণপিটুনিতে ৭৫টি হত্যাসহ অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ড থেকে নারীরাও বাদ যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত সোমবার দুপুরে নগরীর পার্শ্ববর্তী রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের আঠারোবাঁকী নদী থেকে পুলিশ সোহাগ ও রেজাউল করিম নামে দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে। এর আগের দিন গত রবিবার সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহলে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) হিসাবমতে, চলতি বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত শুধু খুলনা মহানগরীতে দুর্বৃত্তদের হাতে নারীসহ নিহত হয়েছে ৩৭ জন। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ। কেএমপি সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এক জন, ফেব্রুয়ারি মাসে চার জন, মার্চ মাসে চার জন, এপ্রিল মাসে দুই জন, মে মাসে তিন জন, জুন মাসে তিন জন, জুলাই মাসে তিন জন, আগস্ট মাসে পাঁচ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ছয় জন, অক্টোবর মাসে চার জন ও ১ নভেম্বর দুই জন নিহত হয়েছে। অর্থাত্, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় চারটি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এ সময় পুলিশ হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৫৯ জনকে গ্রেফতার করেছে।

২২ সন্ত্রাসী সংগঠন, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে তটস্থ মানুষ

খুলনা মহানগরীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত ২২টি সন্ত্রাসী সংগঠন ও কিশোর গ্যাং রয়েছে। এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো হচ্ছে রনি চৌধুরী ওরফে বাবু চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন ‘বি’ কোম্পানি, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, ডেঞ্জার বয়েজ, টেঙ্কি শাওন গ্রুপ, আরমান ওরফে আরমিন গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, সেভেন স্টার, নাইন্টিন বয়েজ, ব্লাড বয়েজ, ব্ল্যাক ঈগল, ডার্ক নাইটস, সিন্ডিকেট, চিংড়ি পলাশ গ্রুপ, শিপলু ওরফে রকি গ্রুপ এবং সিনবাদ গ্রুপ। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন পাড়ায়-মহল্লায় রয়েছে বিভিন্ন উপগ্রুপ। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এক গ্রুপের সন্ত্রাসীরা আরেক গ্রুপের সন্ত্রাসীদের হত্যা করছে। এসব গ্রুপের মধ্যে ‘বি’ কোম্পানি গ্রুপের সন্ত্রাসী তত্পরতা সবচেয়ে বেশি। এই গ্রুপগুলোর ভয়ে তটস্থ সাধারণ মানুষ।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বর্তমানে খুলনা মহানগরীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত ১৫ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ কারাগার থেকে তাদের বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্যদিকে, বি কোম্পানির শীর্ষ নেতা রনি চৌধুরী ওরফে বাবু চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু ভারতের বোম্বে অথবা মালয়েশিয়া থেকে পরিচালনা করছে তার বাহিনী। সূত্রমতে, মাদক বিক্রির টাকা থেকে গ্রেনেড বাবুর প্রতিদিন আয় অর্ধ কোটি টাকারও বেশি।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে নগরীর শামসুর রহমান রোডে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার বাবা মিন্টু চৌধুরীসহ দুই-তিন জন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। তিনি জানান, জব্দকৃত ঐ টাকা ছিল গ্রেনেড বাবুর সেদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত মাদক বিক্রির আয়।

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চলছে চাঁদাবাজি

খুলনা মহানগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চলছে চাঁদাবাজি। নগরীর সরকারি আযম খান কমার্স কলেজের পাশে একজন স্বনামধন্য চিকিত্সকের কাছে ৩ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বি’ কোম্পানি। ভয়ে তিনি থানায় কোনো অভিযোগ না করলেও চেম্বার বন্ধ রেখে আত্মগোপন করেছেন। ঐ এলাকার আরো দুই জন চিকিত্সকের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল, তারাও আত্মগোপন করেছেন। গত ৭ অক্টোবর খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। পরে মাসে ৩৫ লাখ টাকা চাঁদা প্রদানের শর্তে তিনি পার পেয়েছেন। যদিও তিনি চাঁদা দাবির বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। এছাড়া কমার্স কলেজের পাশে অবস্থিত একটি ক্লিনিকের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে বি কোম্পানি। নির্দিষ্ট সময়ে চাঁদা না পেয়ে ভাঙচুর করা হয় ঐ ক্লিনিকে। পরে মোটা অঙ্কের টাকায় বি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করেন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। শুধু এসব প্রতিষ্ঠানই নয়, বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁ, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি, সরকারি কর্মকর্তারা চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে। চাঁদাবাজদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ইজিবাইক চালক, মুদি দোকানদার ও ফুটপাতের দোকানদাররাও।

গত ২৬ অক্টোবর বিকালে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদকে মোবাইল ফোনে চাঁদা দাবির পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি দেন আসলাম শিকদার নামে এক ব্যক্তি। টাকা না দিলে যে কোনো জায়গা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাবেন বলে হুমকি দেন ঐ ব্যক্তি। এছাড়াও ‘হয় অর্থ, নয় রক্ত’ এই দুটির যে কোনো একটি দিতে হবে বলেও তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এর এক দিন আগে ২৫ অক্টোবর মোটা অঙ্কের চাঁদা চেয়ে পাইকগাছা উপজেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জি এম আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জি এম আক্কাস আলীকে আলাদাভাবে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়।

সন্ত্রাসী–চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ীদের নেপথ্যের গডফাদার কারা?

একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে নগরবাসীর মধ্যে। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিরিস্থির নাজুক অবস্থা নিয়ে নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলদার বলেন, বর্তমানে খুলনার আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে নগরবাসী বাক্রুদ্ধ। নগরীর প্রতিটি এলাকায় সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তাও চাঁদাবাজদের হামলার শিকার হয়েছেন। সেই সঙ্গে বেড়েছে ছিনতাই। ছিনতাইকারীদের ভয়ে রাতে নগরীতে মানুষ চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে। কারো জীবনের নিরাপত্তা নেই।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশের যথাযথ ভূমিকা পালন না করা ও প্রকৃত সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার কারণে প্রায় প্রতিদিনই নগরীতে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। তিনি আরো বলেন, এই গডফাদার ও নেপথ্যের মদতদাতাদের চিহ্নিত করা না গেলে একসময়ের শান্তির নগরী খুলনায় শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে না।

খুলনার অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা ফেসবুকে লিখেছেন, শান্ত ও শান্তির নগরী খুলনা এখন অশান্ত। সাধারণ মানুষ এখন ভয়ে আতঙ্কিত। প্রায় প্রতিদিনই হত্যা, ছিনতাই, জমি দখল, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ডেপুটি কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, খুলনায় মাদককেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণতাই বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বস্তি এলাকায় কিশোর-তরুণদের মাধ্যমে অপরাধ সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। পুলিশ অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত ও গ্রেফতারে তত্পর রয়েছে।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলায় সন্ত্রাস দমনে ব্লক রেইড, স্পট রেড এবং তালিকা ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। খুলনার সব হত্যাকাণ্ড মাদক কারবার নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে। মাদক স্পটগুলোতে হানা দেওয়া হচ্ছে। দাগি আসামিরা যাতে দ্রুত জামিন না পায়, সেজন্য বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত সব সন্ত্রাস দমন করে খুলনাকে শান্তির নগরীতে পরিণত করা হবে।’

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

মার্কিন সিনেট নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম তরুণী

নির্বাচনে হেরে ট্রাম্প বললেন, আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না

০৪ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ও ছিনতাইয়ে বিপর্যস্ত খুলনা

আপডেটের সময় : ১২:৪৪:২৮ অপরাহ্ণ, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

খুলনা মহানগরীসহ পুরো জেলায় একের পর এক খুনের ঘটনায় তছনছ হয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবার। দুর্বৃত্তের গুলিতে সন্তান হারাচ্ছে বাবাকে, স্ত্রী হারাচ্ছে প্রিয় স্বামীকে, বোন হারাচ্ছে ভাইকে, বাবা-মা হারাচ্ছে আদরের সন্তানকে। একসময়ের শান্তির শহর খুলনায় পাল্লা দিয়ে চলছে খুন, চাঁদাবাজি আর গোলাগুলির মহোত্সব।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরে খুলনা মহানগরসহ জেলায় দুর্বৃত্তদের গুলি ও গণপিটুনিতে ৭৫টি হত্যাসহ অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ড থেকে নারীরাও বাদ যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত সোমবার দুপুরে নগরীর পার্শ্ববর্তী রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের আঠারোবাঁকী নদী থেকে পুলিশ সোহাগ ও রেজাউল করিম নামে দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে। এর আগের দিন গত রবিবার সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহলে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) হিসাবমতে, চলতি বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত শুধু খুলনা মহানগরীতে দুর্বৃত্তদের হাতে নারীসহ নিহত হয়েছে ৩৭ জন। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ। কেএমপি সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এক জন, ফেব্রুয়ারি মাসে চার জন, মার্চ মাসে চার জন, এপ্রিল মাসে দুই জন, মে মাসে তিন জন, জুন মাসে তিন জন, জুলাই মাসে তিন জন, আগস্ট মাসে পাঁচ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ছয় জন, অক্টোবর মাসে চার জন ও ১ নভেম্বর দুই জন নিহত হয়েছে। অর্থাত্, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় চারটি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এ সময় পুলিশ হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৫৯ জনকে গ্রেফতার করেছে।

২২ সন্ত্রাসী সংগঠন, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে তটস্থ মানুষ

খুলনা মহানগরীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত ২২টি সন্ত্রাসী সংগঠন ও কিশোর গ্যাং রয়েছে। এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো হচ্ছে রনি চৌধুরী ওরফে বাবু চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন ‘বি’ কোম্পানি, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, ডেঞ্জার বয়েজ, টেঙ্কি শাওন গ্রুপ, আরমান ওরফে আরমিন গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, সেভেন স্টার, নাইন্টিন বয়েজ, ব্লাড বয়েজ, ব্ল্যাক ঈগল, ডার্ক নাইটস, সিন্ডিকেট, চিংড়ি পলাশ গ্রুপ, শিপলু ওরফে রকি গ্রুপ এবং সিনবাদ গ্রুপ। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন পাড়ায়-মহল্লায় রয়েছে বিভিন্ন উপগ্রুপ। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এক গ্রুপের সন্ত্রাসীরা আরেক গ্রুপের সন্ত্রাসীদের হত্যা করছে। এসব গ্রুপের মধ্যে ‘বি’ কোম্পানি গ্রুপের সন্ত্রাসী তত্পরতা সবচেয়ে বেশি। এই গ্রুপগুলোর ভয়ে তটস্থ সাধারণ মানুষ।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বর্তমানে খুলনা মহানগরীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত ১৫ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ কারাগার থেকে তাদের বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্যদিকে, বি কোম্পানির শীর্ষ নেতা রনি চৌধুরী ওরফে বাবু চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু ভারতের বোম্বে অথবা মালয়েশিয়া থেকে পরিচালনা করছে তার বাহিনী। সূত্রমতে, মাদক বিক্রির টাকা থেকে গ্রেনেড বাবুর প্রতিদিন আয় অর্ধ কোটি টাকারও বেশি।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে নগরীর শামসুর রহমান রোডে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার বাবা মিন্টু চৌধুরীসহ দুই-তিন জন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। তিনি জানান, জব্দকৃত ঐ টাকা ছিল গ্রেনেড বাবুর সেদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত মাদক বিক্রির আয়।

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চলছে চাঁদাবাজি

খুলনা মহানগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চলছে চাঁদাবাজি। নগরীর সরকারি আযম খান কমার্স কলেজের পাশে একজন স্বনামধন্য চিকিত্সকের কাছে ৩ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বি’ কোম্পানি। ভয়ে তিনি থানায় কোনো অভিযোগ না করলেও চেম্বার বন্ধ রেখে আত্মগোপন করেছেন। ঐ এলাকার আরো দুই জন চিকিত্সকের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল, তারাও আত্মগোপন করেছেন। গত ৭ অক্টোবর খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। পরে মাসে ৩৫ লাখ টাকা চাঁদা প্রদানের শর্তে তিনি পার পেয়েছেন। যদিও তিনি চাঁদা দাবির বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। এছাড়া কমার্স কলেজের পাশে অবস্থিত একটি ক্লিনিকের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে বি কোম্পানি। নির্দিষ্ট সময়ে চাঁদা না পেয়ে ভাঙচুর করা হয় ঐ ক্লিনিকে। পরে মোটা অঙ্কের টাকায় বি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করেন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। শুধু এসব প্রতিষ্ঠানই নয়, বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁ, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি, সরকারি কর্মকর্তারা চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে। চাঁদাবাজদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ইজিবাইক চালক, মুদি দোকানদার ও ফুটপাতের দোকানদাররাও।

গত ২৬ অক্টোবর বিকালে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদকে মোবাইল ফোনে চাঁদা দাবির পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি দেন আসলাম শিকদার নামে এক ব্যক্তি। টাকা না দিলে যে কোনো জায়গা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাবেন বলে হুমকি দেন ঐ ব্যক্তি। এছাড়াও ‘হয় অর্থ, নয় রক্ত’ এই দুটির যে কোনো একটি দিতে হবে বলেও তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এর এক দিন আগে ২৫ অক্টোবর মোটা অঙ্কের চাঁদা চেয়ে পাইকগাছা উপজেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জি এম আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জি এম আক্কাস আলীকে আলাদাভাবে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়।

সন্ত্রাসী–চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ীদের নেপথ্যের গডফাদার কারা?

একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে নগরবাসীর মধ্যে। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিরিস্থির নাজুক অবস্থা নিয়ে নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলদার বলেন, বর্তমানে খুলনার আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে নগরবাসী বাক্রুদ্ধ। নগরীর প্রতিটি এলাকায় সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তাও চাঁদাবাজদের হামলার শিকার হয়েছেন। সেই সঙ্গে বেড়েছে ছিনতাই। ছিনতাইকারীদের ভয়ে রাতে নগরীতে মানুষ চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে। কারো জীবনের নিরাপত্তা নেই।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশের যথাযথ ভূমিকা পালন না করা ও প্রকৃত সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার কারণে প্রায় প্রতিদিনই নগরীতে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। তিনি আরো বলেন, এই গডফাদার ও নেপথ্যের মদতদাতাদের চিহ্নিত করা না গেলে একসময়ের শান্তির নগরী খুলনায় শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে না।

খুলনার অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা ফেসবুকে লিখেছেন, শান্ত ও শান্তির নগরী খুলনা এখন অশান্ত। সাধারণ মানুষ এখন ভয়ে আতঙ্কিত। প্রায় প্রতিদিনই হত্যা, ছিনতাই, জমি দখল, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ডেপুটি কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, খুলনায় মাদককেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণতাই বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বস্তি এলাকায় কিশোর-তরুণদের মাধ্যমে অপরাধ সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। পুলিশ অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত ও গ্রেফতারে তত্পর রয়েছে।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলায় সন্ত্রাস দমনে ব্লক রেইড, স্পট রেড এবং তালিকা ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। খুলনার সব হত্যাকাণ্ড মাদক কারবার নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে। মাদক স্পটগুলোতে হানা দেওয়া হচ্ছে। দাগি আসামিরা যাতে দ্রুত জামিন না পায়, সেজন্য বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত সব সন্ত্রাস দমন করে খুলনাকে শান্তির নগরীতে পরিণত করা হবে।’

Share this news as a Photo Card