একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে দিনে ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টার লোডশেডিং-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট নেত্রকোনার সাধারণ মানুষ। চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকের কম হওয়ায় জেলার গ্রামীণ ও শহর অঞ্চল এখন তীব্র সংকটে। অসহনীয় এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। বিদ্যুৎ নিয়ে পল্লী বিদ্যুতের এমন চরম উদাসীনতায় গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র গণ-অসন্তোষ।
এই পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ কারণে জেলার বিদ্যুৎ অফিস ও ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চিঠি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে নেত্রকোনায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। গত ৭ আগস্ট বিকেল ৪টায় জেলার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১১০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র ৫৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাওয়া যায়নি। ওই সময়ে প্রায় ৫০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়েছে।
পরদিন ৮ আগস্ট বিকেল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ মেগাওয়াটে। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায় প্রায় ৬০ মেগাওয়াট। ৯ আগস্ট রাত ৮টার হিসাবেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ছিল বড় ঘাটতি। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যাপক লোডশেডিং করতে হয়েছে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে।
সমিতির দেওয়া তথ্যমতে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। অর্থাৎ দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
প্রশাসনের কাছে দেওয়া চিঠিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো এলাকায় গ্রাহকদের অসন্তোষ ও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সমিতির অফিস ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে প্রশাসনের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
চাহিদা ১৮৫ মেগাওয়াট, সরবরাহ অর্ধেকেরও কম
নেত্রকোনায় বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ১৮০ থেকে ১৮৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধু পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ১৫৯ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ মিলছে অর্ধেকেরও কম। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ গ্রিড থেকে নেত্রকোনা গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। গ্রিড পর্যায়ে সরবরাহ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলার গ্রামাঞ্চলে।
নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় জেলার ১৫টি উপকেন্দ্রে গ্রাহক রয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭১ হাজার। অন্যদিকে জেলা শহরে পিডিবির তিনটি উপকেন্দ্রে গ্রাহক প্রায় ৫৭ হাজার। সব মিলিয়ে জেলায় বিদ্যুতের মোট গ্রাহক প্রায় ৭ লাখ ২৮ হাজার।
শহরের চেয়ে গ্রামে দুর্ভোগ বেশি
বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পল্লী এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে চার-পাঁচ ঘণ্টার আগে আর আসে না। বিদ্যুৎ আসার পরও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যাচ্ছে। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কয়েক ঘণ্টার বেশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
আটপাড়া উপজেলা সদরের বাসিন্দা হানিফ জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে তীব্র লোডশেডিং চলছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ থাকে না। ২৪ ঘণ্টায় সাত ঘণ্টাও ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।
কলমাকান্দার নক্তিপাড়া গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে চার-পাঁচ ঘণ্টার আগে ফিরে আসে না। কিছুক্ষণ পর আবার চলে যায়।’
মোহনগঞ্জ সদর এলাকার মোজ্জামেল বলেন, ‘কারেন্ট এই আসে, এই যায়। ফ্যান ঘুরতে শুরু করলেই আবার বিদ্যুৎ চলে যায়। একবার গেলে চার ঘণ্টার আগে আসে না। দিনে গড়ে ছয় ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ থাকে।’
কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সদর এলাকার একটি ফিডারে তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ দেওয়া হলেও অন্য ফিডারগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি।’
মদন উপজেলা সদরের আল আমিন বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার পানির মোটর চালানো যাচ্ছে না। প্রচণ্ড গরমে ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। সন্তানদের পড়াশোনাতেও সমস্যা হচ্ছে।’
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে তুলনামূলক কম লোডশেডিং
বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, উপজেলা সদর, হাসপাতাল, ব্যাংক, আদালত এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখতে এসব এলাকার ফিডারে তুলনামূলক কম লোডশেডিং করা হচ্ছে। তবে এসব এলাকার বাইরে আবাসিক ও গ্রামীণ ফিডারগুলোতে ঘাটতির চাপ বেশি পড়ছে।
নেত্রকোনা পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে হাসপাতাল, আদালত, ব্যাংক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফিডারে তুলনামূলক কম লোডশেডিং করা হচ্ছে।’
নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. আকরাম হোসেন বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকের কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সমিতির সব অফিস ও ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিরাপত্তা জোরদারে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অবহিত করা হয়েছে।’


























