নিউইয়র্ক ০৯:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই হাত নেই, মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস রিয়াদের

  • আপডেটের সময় : ০৬:০৫:৩৯ অপরাহ্ণ, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
  • ৬ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

দুই হাত নেই। তবু থেমে থাকেনি পড়াশোনা। মুখে কলম ধরে লিখেই দাখিল (এসএসসি সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রিয়াদ হাসান। এবারের দাখিল পরীক্ষায় সে জিপিএ ২.৯৪ পেয়েছে। তবে প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে তার। তারপরও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নে এগিয়ে যেতে চায় সে।

রিয়াদের জীবনে এই সাফল্য এসেছে দীর্ঘ সংগ্রাম পেরিয়ে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় মসজিদের ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুতের মেইন লাইনের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় সে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।

দুই হাত হারালেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায়নি রিয়াদ। বরং মুখ দিয়ে কলম ধরে লেখা আয়ত্ত করে একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিতে থাকে। সেই দক্ষতাই তাকে এবার দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি রিয়াদের ছিল গভীর আগ্রহ। বালিচাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকেরাও তাকে বিশেষভাবে উৎসাহ দিতেন। পরে গ্রামের পাশের বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয় সে। সেখান থেকেই এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে।

বর্তমানে মুখ দিয়ে লেখালেখি থেকে শুরু করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে করতে পারে রিয়াদ। শুধু পড়াশোনাই নয়, দৈনন্দিন অনেক কাজও নিজেই করার চেষ্টা করে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে সে।

রিয়াদ হাসান বলে, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক হব। দুই হাত হারিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও মুখ দিয়ে লিখে এবার দাখিল পরীক্ষা পাস করেছি। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল করতে পারিনি। আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। আমি উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে একটি চাকরি করতে চাই। সরকার যদি আমার দিকে একটু নজর দেয় এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, তাহলে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে পরিবারের হাল ধরতে চাই।’

রিয়াদের ছোট ভাই রাহাদ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের দুই হাত নেই। চলাফেরাতেও অনেক কষ্ট হয়। সে মুখ দিয়ে লেখাপড়া করে। অনেক সময় আমি তাকে হাতে করে ভাত খাওয়াই।’

রিয়াদের মা দেলরোবা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করে অনেক কষ্টে দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। অভাবের মধ্যেও আমরা চেষ্টা করেছি ছেলেদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। রিয়াদ লেখাপড়া শেষ করে যদি সরকারি সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, তাহলে আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম সফল হবে।’

বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার নুরুল হক বলেন, ‘রিয়াদ অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তার অদম্য মনোবলের প্রমাণ। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দাখিল পাস করা রিয়াদ এখন উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে চায়। তার স্বপ্ন—একদিন নিজেই শিক্ষক হয়ে অন্যদের আলোর পথ দেখানো।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

গভীর রাতে কলকাতার সেই হোটেলে যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে

১৯ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

দুই হাত নেই, মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস রিয়াদের

আপডেটের সময় : ০৬:০৫:৩৯ অপরাহ্ণ, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬

দুই হাত নেই। তবু থেমে থাকেনি পড়াশোনা। মুখে কলম ধরে লিখেই দাখিল (এসএসসি সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রিয়াদ হাসান। এবারের দাখিল পরীক্ষায় সে জিপিএ ২.৯৪ পেয়েছে। তবে প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে তার। তারপরও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নে এগিয়ে যেতে চায় সে।

রিয়াদের জীবনে এই সাফল্য এসেছে দীর্ঘ সংগ্রাম পেরিয়ে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় মসজিদের ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুতের মেইন লাইনের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় সে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।

দুই হাত হারালেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায়নি রিয়াদ। বরং মুখ দিয়ে কলম ধরে লেখা আয়ত্ত করে একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিতে থাকে। সেই দক্ষতাই তাকে এবার দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি রিয়াদের ছিল গভীর আগ্রহ। বালিচাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকেরাও তাকে বিশেষভাবে উৎসাহ দিতেন। পরে গ্রামের পাশের বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয় সে। সেখান থেকেই এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে।

বর্তমানে মুখ দিয়ে লেখালেখি থেকে শুরু করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে করতে পারে রিয়াদ। শুধু পড়াশোনাই নয়, দৈনন্দিন অনেক কাজও নিজেই করার চেষ্টা করে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে সে।

রিয়াদ হাসান বলে, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক হব। দুই হাত হারিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও মুখ দিয়ে লিখে এবার দাখিল পরীক্ষা পাস করেছি। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল করতে পারিনি। আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। আমি উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে একটি চাকরি করতে চাই। সরকার যদি আমার দিকে একটু নজর দেয় এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, তাহলে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে পরিবারের হাল ধরতে চাই।’

রিয়াদের ছোট ভাই রাহাদ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের দুই হাত নেই। চলাফেরাতেও অনেক কষ্ট হয়। সে মুখ দিয়ে লেখাপড়া করে। অনেক সময় আমি তাকে হাতে করে ভাত খাওয়াই।’

রিয়াদের মা দেলরোবা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করে অনেক কষ্টে দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। অভাবের মধ্যেও আমরা চেষ্টা করেছি ছেলেদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। রিয়াদ লেখাপড়া শেষ করে যদি সরকারি সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, তাহলে আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম সফল হবে।’

বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার নুরুল হক বলেন, ‘রিয়াদ অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তার অদম্য মনোবলের প্রমাণ। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দাখিল পাস করা রিয়াদ এখন উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে চায়। তার স্বপ্ন—একদিন নিজেই শিক্ষক হয়ে অন্যদের আলোর পথ দেখানো।

Share this news as a Photo Card