একসময় দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদনজগতের অতি পরিচিত মুখ ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী কিম সে–ইন। তবে জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করেই শোবিজ অঙ্গন থেকে একদম অদৃশ্য হয়ে যান তিনি।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সম্প্রতি একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে অভিনয়জগৎ ছাড়ার নেপথ্যে থাকা নিজের জীবনের সেই বেদনাদায়ক ও কঠিন বাস্তবতার কথা অকপটে প্রকাশ করেছেন এই তারকা। তিনি জানান, অসুস্থ মা ও চরম আর্থিক সংকটে পড়া পুরো পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে একসময় বাধ্য হয়ে তাকে পর্দায় নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়েছিল।
গত ৩০ জুলাই প্রচারিত এমবিএনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘স্পেশাল ওয়ার্ল্ড’–এ বিশেষ অতিথি হিসেবে হাজির হয়ে নিজের জীবনের করুণ ইতিহাস তুলে ধরেন কিম সে–ইন।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে ‘সেম বেড, ডিফারেন্ট ড্রিমস’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বিনোদনজগতে পা রাখেন কিম। পরবর্তীতে ২০১১ সালে এসবিএস চ্যানেলের অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ওহ মাই গড’–এ অভিনয় করে বেশ দর্শকপ্রিয়তা ও পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ২০১৩ সালে তিনি স্থায়ীভাবে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই নির্মম অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কিম সে–ইন বলেন, ‘সে সময় আমার তৎকালীন এজেন্সি প্রধান আমাকে নিয়মিত নানা অনৈতিক বিনোদনকেন্দ্রে নিয়ে যেতেন এবং প্রতিনিয়ত চরম মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। আর ঠিক সেই কঠিন সময়েই আমার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। জীবনের প্রতিটি দিন আমার কাছে জীবন্ত নরকের মতো মনে হতো এবং নিজের বেঁচে থাকার ওপরই তীব্র ঘৃণা জন্মে গিয়েছিল।’
কিম জানান, তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর পরিবারে জন্ম নিলেও হঠাৎ ব্যবসায় ধস নামায় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে একপর্যায়ে পুরো পরিবারকে একটি অস্বাস্থ্যকর গুদামঘরেও রাত কাটাতে হয়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে পুরো পরিবারের আর্থিক দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতেই তিনি বিনোদনজগতে নিয়মিত কাজ করা শুরু করেছিলেন।
নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে অভিনেত্রী বলেন, ‘তখন মা ও পরিবারের জরুরি চিকিৎসায় কয়েক কোটি ওনের মারাত্মক প্রয়োজন ছিল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে পুরো পরিবারকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হয়েছিল। সেই সময় স্রেফ জীবিকা ও চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতেই আমি পর্দায় নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করতে বাধ্য হই। তবে আমার এই সিদ্ধান্তের কারণে আমার বাবা আমার ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হয়েছিলেন।’
বর্তমানে নিজের সাধারণ জীবন যাপন সম্পর্কে কিম সে–ইন জানান, তিনি এখন অভিনয় ছেড়ে সাতটি পরিত্যক্ত কুকুর, খরগোশ, মুরগিসহ মোট ১৫টি গৃহপালিত প্রাণীর দেখাশোনা করেন। আর এদের খাবারের খরচ মেটাতে ও নিজের সংসার চালাতে তিনি অত্যন্ত সাধারণ ফুড ডেলিভারির খণ্ডকালীন (পার্ট-টাইম) কাজ করছেন।
পারিবারিক ট্র্যাজেডির কথা জানিয়ে কিম জানান, মাত্র দুই বছর আগে তাঁর বাবা তীব্র হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবাকে দেওয়া শেষ প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেই তিনি এখন এই পরিত্যক্ত কুকুরগুলোর যত্ন নিচ্ছেন। অন্যদিকে, তাঁর মা ১৫ বছর আগে হঠাৎ মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে (ব্রেইন স্ট্রোক) আক্রান্ত হয়ে কোমায় চলে যান, যার জ্ঞান আজ পর্যন্ত আর ফেরেনি।
ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অদম্য ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে কিম সে-ইন বলেন, ‘এত কিছুর পরেও আমি খুব ভালোভাবে বাঁচতে চাই। কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে চাই এবং প্রাণীদের নিয়ে এখন আমার যে বড় পরিবারটি গড়ে উঠেছে, জীবন দিয়ে হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আগলে রাখতে চাই।’

























