নিউইয়র্ক ০৫:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হত্যার সময় জিয়াউর রহমানকে দেখে ‘কাঁপছিলেন’ সাবেক মেজর মোজাফফর

  • আপডেটের সময় : ০৪:৩২:০৬ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
  • ৩ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানীর একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ তাকে আটক করে এবং পরদিন বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। তৎকালীন মেজর পদমর্যাদার এই কর্মকর্তার বয়স এখন ৭৭ বছর। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই উপস্থিত ছিলেন মোজাফফর।

ডিএমপির ১৬ জুলাই প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে সূত্রের তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মোজাফফরের অবস্থান শনাক্ত করে বনানীর ওই বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে অবহিত করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়।

ডিএমপি মোজাফফরকে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ‘পলাতক আসামি’ ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগে, কোন সামরিক বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। গ্রেপ্তারের পর মোজাফফরের নিজের কোনো বক্তব্যও প্রকাশিত হয়নি।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে মোজাফফরের উল্লেখ রয়েছে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে জিয়া হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির ত্রয়োদশ অধ্যায় অনুযায়ী, ভোররাতে গোলাগুলির শব্দে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তার সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, মোজাফফর সেই মুহূর্তে দৃশ্যত কাঁপছিলেন এবং মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। বইটিতে বলা হয়েছে, মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিন তখনো মনে করছিলেন, জিয়াকে হত্যা নয়, সার্কিট হাউস থেকে তুলে নেওয়া হবে।

কিন্তু এরপরই লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সামনে এসে সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়াকে গুলি করেন। বইটিতে উল্লেখ রয়েছে, সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর তার সঙ্গীকে বলেছিলেন যে তিনি জানতেন না রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে; তার ধারণা ছিল, জিয়াকে শুধু বের করে আনা হবে। তবে এটি মাসকারেনহাসের বইয়ে দেওয়া বক্তব্য; আদালতে শপথ নিয়ে দেওয়া বা জেরার মাধ্যমে যাচাই করা সাক্ষ্য নয়।

মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মোজাফফরের ভূমিকা হত্যার মুহূর্তে উপস্থিত থাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে পুনরায় সার্কিট হাউসে যান। সেখানে জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ‘গোপন কাগজপত্র’ ও ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়। এরপর জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই বইয়ে আরও বলা হয়েছে, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন। ফলে হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকে জানতেন না—মোজাফফরের কথিত এই দাবি তার পরবর্তী সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয় না।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে মঞ্জুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছাড়েন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, সামনের জিপে ছিলেন মতিউর রহমান, মাহবুব, মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেপ্তার হলেও মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

জিয়া হত্যার পর ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। এদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মোজাফফর পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন এবং তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। মোজাফফরের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে আলাদা কোনো রায় দেওয়া হয়েছিল কি না, বা পুরোনো কোনো সামরিক পরোয়ানা এখনো কার্যকর আছে কি না—এসব বিষয়ে সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

মোজাফফরের পলাতক জীবনের একটি বিরল তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ২০১৪ সালে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী নিবন্ধে মইনুলের বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশের ইংরেজি অনুবাদ উদ্ধৃত করেছিলেন। লিফশুলৎজের ভাষ্য অনুযায়ী, মইনুল নিজেই তাকে ওই অনুবাদ পাঠিয়েছিলেন।

মইনুল লিখেছেন, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি জানতে পারেন যে জিয়া হত্যার পলাতক অভিযুক্ত মেজর খালেদ ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন এবং মোজাফফর ছিলেন ভারতে। একপর্যায়ে মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে মইনুলের সঙ্গে দেখা করেন। জিয়াউর রহমান কীভাবে নিহত হয়েছিলেন, তা জানতে মইনুল তাদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন।

খালেদ ও মোজাফফরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মইনুল লিখেছেন, চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে সেনানিবাসে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনায় নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, মাহবুব ও মেজর খালেদ। জেনারেল মঞ্জুর আগে থেকে পরিকল্পনা জানতেন না বলে তাদের দাবি। তাদের ভাষ্যে, জিয়াকে চাপ দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এবং কয়েকজন মন্ত্রীকে অপসারণ করানোই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।সার্কিট হাউসের ঘটনা সম্পর্কে মইনুল লিখেছেন, জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর মতিউর রহমান খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেন। অন্য কর্মকর্তারা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন এবং তারা গুলি চালাননি—এমনই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ওই দুই পলাতকের ভাষ্যের ভিত্তিতে। মইনুলের বইয়েও মোজাফফরকে গুলিবর্ষণকারী বলা হয়নি। তবে খালেদ ও মোজাফফরের বক্তব্য আলাদাভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় কোন তথ্যটি কার, তা স্পষ্ট নয়। উল্লেখ্য, তারা দুজনই তখন পলাতক অভিযুক্ত ছিলেন এবং তাদের বক্তব্য কোনো আদালতে জেরা বা স্বাধীন সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই হয়নি।

মইনুল লিখেছেন, ১৯৯১ সালে ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই আলোচনার বিষয়বস্তু জানিয়েছিলেন। মেজর খালেদ পরে ১৯৯৩ সালে ব্যাংককে হৃদ্‌রোগে মারা যান। ফলে ওই ব্যাংকক বৈঠকের দুই পলাতক প্রত্যক্ষদর্শীর মধ্যে মোজাফফরই পরবর্তীতে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর ভারতে আত্মগোপন করেছিলেন এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত পার হতেন। তবে ডিএমপির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে শুধু বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন।

মোজাফফর কত বছর ভারতে ছিলেন, সেখানে কোথায় ও কী পরিচয়ে থাকতেন, কীভাবে ব্যাংককে যাতায়াত করেছিলেন, কবে বাংলাদেশে ফিরেছেন, বনানীতে কত দিন ধরে ও কার সহায়তায় আত্মগোপনে ছিলেন—কোনো সরকারি সংস্থা এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। কোনো কোনো সূত্রমতে, তিনি অনেক দিন ধরেই দেশে অবস্থান করছিলেন।

দীর্ঘ পলাতক জীবন শেষে মোজাফফরের গ্রেপ্তারে ৪৫ বছরের পুরোনো কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। সেদিন সার্কিট হাউসে অভিযানের আগে কর্মকর্তাদের কী বলা হয়েছিল, জিয়াকে হত্যা নাকি তুলে নেওয়া—কোন উদ্দেশ্যের কথা তারা জানতেন, পরিকল্পনায় আর কারা যুক্ত ছিলেন, হত্যার পর জিয়ার কক্ষে কী খোঁজা হয়েছিল এবং মরদেহ কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নে মোজাফফরের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

একই সঙ্গে দীর্ঘ পলাতক জীবনে কারা তাকে সহায়তা করেছে এবং এতদিন কেন তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি—এসব প্রশ্নের উত্তরও জাতীয় গুরুত্ব বহন করে। তবে মোজাফফরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথি বা পুরোনো সামরিক তদন্তের ফলাফল এখনো জনসমক্ষে আসেনি। ফলে ঐতিহাসিক বইয়ে তার নামে দেওয়া বক্তব্য এবং পুলিশের বর্তমান অভিযোগ—দুটিই এখন আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক যাচাইয়ের অপেক্ষায়।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

মেক্সিকোতে ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি

সিআইএ-মোসাদের সঙ্গে এপস্টাইনের যোগাযোগ ছিল: ভ্যান্স

১৭ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

হত্যার সময় জিয়াউর রহমানকে দেখে ‘কাঁপছিলেন’ সাবেক মেজর মোজাফফর

আপডেটের সময় : ০৪:৩২:০৬ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানীর একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ তাকে আটক করে এবং পরদিন বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। তৎকালীন মেজর পদমর্যাদার এই কর্মকর্তার বয়স এখন ৭৭ বছর। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই উপস্থিত ছিলেন মোজাফফর।

ডিএমপির ১৬ জুলাই প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে সূত্রের তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মোজাফফরের অবস্থান শনাক্ত করে বনানীর ওই বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে অবহিত করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়।

ডিএমপি মোজাফফরকে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ‘পলাতক আসামি’ ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগে, কোন সামরিক বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। গ্রেপ্তারের পর মোজাফফরের নিজের কোনো বক্তব্যও প্রকাশিত হয়নি।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে মোজাফফরের উল্লেখ রয়েছে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে জিয়া হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির ত্রয়োদশ অধ্যায় অনুযায়ী, ভোররাতে গোলাগুলির শব্দে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তার সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, মোজাফফর সেই মুহূর্তে দৃশ্যত কাঁপছিলেন এবং মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। বইটিতে বলা হয়েছে, মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিন তখনো মনে করছিলেন, জিয়াকে হত্যা নয়, সার্কিট হাউস থেকে তুলে নেওয়া হবে।

কিন্তু এরপরই লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সামনে এসে সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়াকে গুলি করেন। বইটিতে উল্লেখ রয়েছে, সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর তার সঙ্গীকে বলেছিলেন যে তিনি জানতেন না রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে; তার ধারণা ছিল, জিয়াকে শুধু বের করে আনা হবে। তবে এটি মাসকারেনহাসের বইয়ে দেওয়া বক্তব্য; আদালতে শপথ নিয়ে দেওয়া বা জেরার মাধ্যমে যাচাই করা সাক্ষ্য নয়।

মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মোজাফফরের ভূমিকা হত্যার মুহূর্তে উপস্থিত থাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে পুনরায় সার্কিট হাউসে যান। সেখানে জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ‘গোপন কাগজপত্র’ ও ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়। এরপর জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই বইয়ে আরও বলা হয়েছে, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন। ফলে হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকে জানতেন না—মোজাফফরের কথিত এই দাবি তার পরবর্তী সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয় না।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে মঞ্জুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছাড়েন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, সামনের জিপে ছিলেন মতিউর রহমান, মাহবুব, মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেপ্তার হলেও মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

জিয়া হত্যার পর ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। এদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মোজাফফর পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন এবং তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। মোজাফফরের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে আলাদা কোনো রায় দেওয়া হয়েছিল কি না, বা পুরোনো কোনো সামরিক পরোয়ানা এখনো কার্যকর আছে কি না—এসব বিষয়ে সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

মোজাফফরের পলাতক জীবনের একটি বিরল তথ্য পাওয়া যায় মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ২০১৪ সালে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী নিবন্ধে মইনুলের বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশের ইংরেজি অনুবাদ উদ্ধৃত করেছিলেন। লিফশুলৎজের ভাষ্য অনুযায়ী, মইনুল নিজেই তাকে ওই অনুবাদ পাঠিয়েছিলেন।

মইনুল লিখেছেন, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি জানতে পারেন যে জিয়া হত্যার পলাতক অভিযুক্ত মেজর খালেদ ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন এবং মোজাফফর ছিলেন ভারতে। একপর্যায়ে মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে মইনুলের সঙ্গে দেখা করেন। জিয়াউর রহমান কীভাবে নিহত হয়েছিলেন, তা জানতে মইনুল তাদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন।

খালেদ ও মোজাফফরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মইনুল লিখেছেন, চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে সেনানিবাসে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনায় নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, মাহবুব ও মেজর খালেদ। জেনারেল মঞ্জুর আগে থেকে পরিকল্পনা জানতেন না বলে তাদের দাবি। তাদের ভাষ্যে, জিয়াকে চাপ দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা এবং কয়েকজন মন্ত্রীকে অপসারণ করানোই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।সার্কিট হাউসের ঘটনা সম্পর্কে মইনুল লিখেছেন, জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর মতিউর রহমান খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেন। অন্য কর্মকর্তারা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন এবং তারা গুলি চালাননি—এমনই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ওই দুই পলাতকের ভাষ্যের ভিত্তিতে। মইনুলের বইয়েও মোজাফফরকে গুলিবর্ষণকারী বলা হয়নি। তবে খালেদ ও মোজাফফরের বক্তব্য আলাদাভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় কোন তথ্যটি কার, তা স্পষ্ট নয়। উল্লেখ্য, তারা দুজনই তখন পলাতক অভিযুক্ত ছিলেন এবং তাদের বক্তব্য কোনো আদালতে জেরা বা স্বাধীন সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই হয়নি।

মইনুল লিখেছেন, ১৯৯১ সালে ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই আলোচনার বিষয়বস্তু জানিয়েছিলেন। মেজর খালেদ পরে ১৯৯৩ সালে ব্যাংককে হৃদ্‌রোগে মারা যান। ফলে ওই ব্যাংকক বৈঠকের দুই পলাতক প্রত্যক্ষদর্শীর মধ্যে মোজাফফরই পরবর্তীতে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর ভারতে আত্মগোপন করেছিলেন এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত পার হতেন। তবে ডিএমপির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে শুধু বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন।

মোজাফফর কত বছর ভারতে ছিলেন, সেখানে কোথায় ও কী পরিচয়ে থাকতেন, কীভাবে ব্যাংককে যাতায়াত করেছিলেন, কবে বাংলাদেশে ফিরেছেন, বনানীতে কত দিন ধরে ও কার সহায়তায় আত্মগোপনে ছিলেন—কোনো সরকারি সংস্থা এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। কোনো কোনো সূত্রমতে, তিনি অনেক দিন ধরেই দেশে অবস্থান করছিলেন।

দীর্ঘ পলাতক জীবন শেষে মোজাফফরের গ্রেপ্তারে ৪৫ বছরের পুরোনো কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। সেদিন সার্কিট হাউসে অভিযানের আগে কর্মকর্তাদের কী বলা হয়েছিল, জিয়াকে হত্যা নাকি তুলে নেওয়া—কোন উদ্দেশ্যের কথা তারা জানতেন, পরিকল্পনায় আর কারা যুক্ত ছিলেন, হত্যার পর জিয়ার কক্ষে কী খোঁজা হয়েছিল এবং মরদেহ কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নে মোজাফফরের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

একই সঙ্গে দীর্ঘ পলাতক জীবনে কারা তাকে সহায়তা করেছে এবং এতদিন কেন তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি—এসব প্রশ্নের উত্তরও জাতীয় গুরুত্ব বহন করে। তবে মোজাফফরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথি বা পুরোনো সামরিক তদন্তের ফলাফল এখনো জনসমক্ষে আসেনি। ফলে ঐতিহাসিক বইয়ে তার নামে দেওয়া বক্তব্য এবং পুলিশের বর্তমান অভিযোগ—দুটিই এখন আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক যাচাইয়ের অপেক্ষায়।

Share this news as a Photo Card