নিউইয়র্ক ০৪:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৩৪ কোটি টাকার গবেষণা প্রকল্পে ২২ উটপাখির ১৫টিই জবাই

  • আপডেটের সময় : ০৫:৪৭:০১ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ৩ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

দেশে বাণিজ্যিকভাবে উটপাখি পালনের সম্ভাবনা যাচাই এবং গরু-খাসির বিকল্প মাংসের উৎস খুঁজতে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় আনা ২২টি উটপাখির মধ্যে ১৫টিই জবাই করা হয়েছে এবং তিনটি মারা গেছে। বর্তমানে প্রকল্পে রয়েছে মাত্র চারটি উটপাখি। তবে সংরক্ষিত শেডে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দুইটির বেশি উটপাখি দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ’ প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালে আফ্রিকা থেকে দুই দফায় এসব উটপাখি আনা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির পরিচালক বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাজেদুল করিম সরকার।

বিএলআরআই সূত্র বলছে, প্রথম দফায় সাতটি এবং পরে আরও ১৫টি অপ্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি আমদানি করা হয়। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের জলবায়ুতে উটপাখির অভিযোজন, প্রজনন সক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা।

প্রকল্প শুরুর সময় সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের পরিবেশে উটপাখি সহজেই অভিযোজিত হতে পারবে। তাদের তথ্যমতে, একটি পূর্ণবয়স্ক উটপাখির ওজন ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে এবং একটি পাখি থেকে দুইটি দেশীয় গরুর সমপরিমাণ মাংস পাওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে এ মাংস বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল।

তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গবেষণার দৃশ্যমান কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, মাংসের গুণগত মান ও স্বাদ মূল্যায়নের জন্য ধাপে ধাপে ১৫টি উটপাখি জবাই করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় তিনটি মারা গেছে।

গবেষণার জন্য আনা এত সংখ্যক প্রাণী জবাই করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গবেষণায় প্রাণী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক সীমা রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসান বলেন, উটপাখি বাংলাদেশের দেশীয় প্রাণী নয়। তাই এ দেশের পরিবেশে এদের সফলভাবে অভিযোজিত করা সহজ নয়। আর জবাই করে খাওয়ার বিষয়টি যদি গবেষণা প্রকল্পে থেকেও থাকে, তাহলে ২২টির মধ্যে এতোগুলো জবাই করার এই প্রকল্পটি যারা নিয়েছেন তাদের আগে চিন্তা করা দরকার ছিল।

সাজেদুল করিমের অধীনে উটপাখি নিয়ে পিএইচডি করা হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী খন্দকার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, গবেষণা মানে সব সফল হতে হবে, এমন না। এখানে ব্যর্থতা থাকবে। উটপাখি নিয়ে আমি পিএইচডি করেছি। যেহেতু এটা এই আবহাওয়ার কোনো প্রাণী না, ফলে এখানে সফল হতে বেশ কয়েকধাপে কাজ করতে হবে। একবারের কাজে এখানে সফলতা আসবে না।

১৫টি পাখি জবাই করার বিষয়ে তিনি বলেন, গবেষণার প্রয়োজনে মাংসের স্বাদ পরীক্ষা করতে এটি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত সাজেদুল করিম স্যার বলতে পারবেন। আমি কোনো কথা বলতে চাই না।

এসব বিষয় নিয়ে প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাজেদুল করিম সরকারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার কার্যালয়ে গিয়ে ও মুঠোফোনে কল করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এদিকে ড. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজের স্ত্রীসহ নিকটাত্মীয়দের বিভিন্নভাবে প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং নিয়োগ ও ফেলোশিপ বণ্টনে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্ব) ড. শাকিলা ফারুক বলেন, উটপাখি বাংলাদেশের দেশীয় প্রজাতি নয়। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের পরিবেশে প্রাণীগুলোর অভিযোজন, খাদ্যাভ্যাস ও মাংসের গুণগত মান মূল্যায়ন করা। এ কারণেই কিছু উটপাখি জবাই করা হয়েছে।

তবে প্রকল্প-সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকই ভালো বলতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালে গবেষণাধীন ৩৮টি মোরগ জবাই করে খাওয়া হলেও সেসময় দাবি করা হয়েছিল, সেগুলো চুরি হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

এছাড়া প্রধান কার্যালয় থেকে সৈয়দপুর কেন্দ্রে পাঠানো ১ হাজার ২০০টি কোয়েল পাখি মারা যাওয়ার পরও সেই তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই মৃত্যুর তথ্য গোপন রেখেই পরে একই কেন্দ্রে আরও ১ হাজার কোয়েল স্থানান্তর করা হয়।

এসব বিষয়ে সম্প্রতি বিএলআরআই পরিদর্শনে আসা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘বিএলআরআইয়ে যেসব বিষয়ের অনিয়ম সামনে এসেছে সেগুলো নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত কাজ চলছে। এটি নিয়েও তদন্ত করা হবে এবং এর রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।’

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

স্পেনে দাবানল পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার

জাপানের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮, চলছে উদ্ধার অভিযান

৩১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

১৩৪ কোটি টাকার গবেষণা প্রকল্পে ২২ উটপাখির ১৫টিই জবাই

আপডেটের সময় : ০৫:৪৭:০১ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

দেশে বাণিজ্যিকভাবে উটপাখি পালনের সম্ভাবনা যাচাই এবং গরু-খাসির বিকল্প মাংসের উৎস খুঁজতে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় আনা ২২টি উটপাখির মধ্যে ১৫টিই জবাই করা হয়েছে এবং তিনটি মারা গেছে। বর্তমানে প্রকল্পে রয়েছে মাত্র চারটি উটপাখি। তবে সংরক্ষিত শেডে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দুইটির বেশি উটপাখি দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ’ প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালে আফ্রিকা থেকে দুই দফায় এসব উটপাখি আনা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির পরিচালক বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাজেদুল করিম সরকার।

বিএলআরআই সূত্র বলছে, প্রথম দফায় সাতটি এবং পরে আরও ১৫টি অপ্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি আমদানি করা হয়। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের জলবায়ুতে উটপাখির অভিযোজন, প্রজনন সক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা।

প্রকল্প শুরুর সময় সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের পরিবেশে উটপাখি সহজেই অভিযোজিত হতে পারবে। তাদের তথ্যমতে, একটি পূর্ণবয়স্ক উটপাখির ওজন ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে এবং একটি পাখি থেকে দুইটি দেশীয় গরুর সমপরিমাণ মাংস পাওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে এ মাংস বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল।

তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গবেষণার দৃশ্যমান কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, মাংসের গুণগত মান ও স্বাদ মূল্যায়নের জন্য ধাপে ধাপে ১৫টি উটপাখি জবাই করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় তিনটি মারা গেছে।

গবেষণার জন্য আনা এত সংখ্যক প্রাণী জবাই করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গবেষণায় প্রাণী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক সীমা রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসান বলেন, উটপাখি বাংলাদেশের দেশীয় প্রাণী নয়। তাই এ দেশের পরিবেশে এদের সফলভাবে অভিযোজিত করা সহজ নয়। আর জবাই করে খাওয়ার বিষয়টি যদি গবেষণা প্রকল্পে থেকেও থাকে, তাহলে ২২টির মধ্যে এতোগুলো জবাই করার এই প্রকল্পটি যারা নিয়েছেন তাদের আগে চিন্তা করা দরকার ছিল।

সাজেদুল করিমের অধীনে উটপাখি নিয়ে পিএইচডি করা হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী খন্দকার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, গবেষণা মানে সব সফল হতে হবে, এমন না। এখানে ব্যর্থতা থাকবে। উটপাখি নিয়ে আমি পিএইচডি করেছি। যেহেতু এটা এই আবহাওয়ার কোনো প্রাণী না, ফলে এখানে সফল হতে বেশ কয়েকধাপে কাজ করতে হবে। একবারের কাজে এখানে সফলতা আসবে না।

১৫টি পাখি জবাই করার বিষয়ে তিনি বলেন, গবেষণার প্রয়োজনে মাংসের স্বাদ পরীক্ষা করতে এটি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত সাজেদুল করিম স্যার বলতে পারবেন। আমি কোনো কথা বলতে চাই না।

এসব বিষয় নিয়ে প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাজেদুল করিম সরকারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার কার্যালয়ে গিয়ে ও মুঠোফোনে কল করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এদিকে ড. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজের স্ত্রীসহ নিকটাত্মীয়দের বিভিন্নভাবে প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং নিয়োগ ও ফেলোশিপ বণ্টনে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্ব) ড. শাকিলা ফারুক বলেন, উটপাখি বাংলাদেশের দেশীয় প্রজাতি নয়। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের পরিবেশে প্রাণীগুলোর অভিযোজন, খাদ্যাভ্যাস ও মাংসের গুণগত মান মূল্যায়ন করা। এ কারণেই কিছু উটপাখি জবাই করা হয়েছে।

তবে প্রকল্প-সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকই ভালো বলতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালে গবেষণাধীন ৩৮টি মোরগ জবাই করে খাওয়া হলেও সেসময় দাবি করা হয়েছিল, সেগুলো চুরি হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

এছাড়া প্রধান কার্যালয় থেকে সৈয়দপুর কেন্দ্রে পাঠানো ১ হাজার ২০০টি কোয়েল পাখি মারা যাওয়ার পরও সেই তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই মৃত্যুর তথ্য গোপন রেখেই পরে একই কেন্দ্রে আরও ১ হাজার কোয়েল স্থানান্তর করা হয়।

এসব বিষয়ে সম্প্রতি বিএলআরআই পরিদর্শনে আসা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘বিএলআরআইয়ে যেসব বিষয়ের অনিয়ম সামনে এসেছে সেগুলো নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত কাজ চলছে। এটি নিয়েও তদন্ত করা হবে এবং এর রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।’

Share this news as a Photo Card