নিউইয়র্ক ০৪:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষক থেকে খুচরা বাজারে আসতে ১০ নিত্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়

  • আপডেটের সময় : ০৭:২৫:৩২ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
  • ০ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

কৃষকের কাছ থেকে উত্পাদিত পণ্য ভোক্তার টেবিলে পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পার হওয়ার সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে দাম। মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় চাঁদাবাজির কারণে দেশের অন্তত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃষক পর্যায়ের তুলনায় কখনো কখনো দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে।

গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ (সিপিডি) পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে নিত্যপণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে এ চিত্র তুলে ধরা হয়। সংলাপে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, একাধিক অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

সিপিডির গবেষণায় দেশের ৮১০টি বাজার ঘুরে ১০টি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই পর্যায়ে দাম বাড়ে না; বরং পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়।

সিপিডির একই গবেষণায় অন্যান্য পণ্য নিয়েও বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালে দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে দাম বাড়ছে ২২ শতাংশ।

গবেষণা অনুযায়ী, চাল উত্পাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে মিলার পর্যায়েই কেজিপ্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে। ডালের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা সবচেয়ে বেশি মূল্য বাড়ান। একই চিত্র মরিচের বাজারেও দেখা গেছে। মরিচের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা গড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেন।

অন্যদিকে বেগুন ও আলুর বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেন খুচরা বিক্রেতারা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রান্তিক পাইকারদের পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমিষ জাতীয় পণ্যের বাজারেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, মাছের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি ঘটে শহরের আড়তদার পর্যায়ে। ডিম ও মুরগির বাজারে পাইকাররা বড় ভূমিকা রাখেন। আর গরুর মাংসের ক্ষেত্রে ব্যাপারিদের হাত ধরে কেজিপ্রতি গড়ে প্রায় ৭৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়।

সংলাপে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফারুক আল কবীর গবেষণার বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন। পরে অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম গুনতে হয়।

গবেষণার পর্যবেক্ষণের জবাবে প্রধান অতিথির বক্তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উত্পাদন পরিকল্পনায় এখনো তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো বছর কোনো পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়, আবার কোনো বছর অতিরিক্ত উত্পাদন হয়। এতে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়।

তিনি আরো বলেন, দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ লজিস্টিক ব্যয়। বিশ্বে যেখানে গড়ে জিডিপির ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয়, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। এই ব্যয় কমানো গেলে খাদ্যপণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এছাড়া উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারব্যবস্থার বিভিন্ন অসঙ্গতি রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ও কমাতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজি একটি বাস্তব সমস্যা। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।

সংলাপে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

বাংলাদেশিদের ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার তাগিদ ভারতের সংসদীয় কমিটির

ইরানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ নিয়ে সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা জোট

৩১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

কৃষক থেকে খুচরা বাজারে আসতে ১০ নিত্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়

আপডেটের সময় : ০৭:২৫:৩২ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

কৃষকের কাছ থেকে উত্পাদিত পণ্য ভোক্তার টেবিলে পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পার হওয়ার সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে দাম। মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় চাঁদাবাজির কারণে দেশের অন্তত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃষক পর্যায়ের তুলনায় কখনো কখনো দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে।

গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ (সিপিডি) পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে নিত্যপণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে এ চিত্র তুলে ধরা হয়। সংলাপে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, একাধিক অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

সিপিডির গবেষণায় দেশের ৮১০টি বাজার ঘুরে ১০টি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই পর্যায়ে দাম বাড়ে না; বরং পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়।

সিপিডির একই গবেষণায় অন্যান্য পণ্য নিয়েও বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালে দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে দাম বাড়ছে ২২ শতাংশ।

গবেষণা অনুযায়ী, চাল উত্পাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে মিলার পর্যায়েই কেজিপ্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে। ডালের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা সবচেয়ে বেশি মূল্য বাড়ান। একই চিত্র মরিচের বাজারেও দেখা গেছে। মরিচের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা গড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেন।

অন্যদিকে বেগুন ও আলুর বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেন খুচরা বিক্রেতারা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রান্তিক পাইকারদের পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমিষ জাতীয় পণ্যের বাজারেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, মাছের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি ঘটে শহরের আড়তদার পর্যায়ে। ডিম ও মুরগির বাজারে পাইকাররা বড় ভূমিকা রাখেন। আর গরুর মাংসের ক্ষেত্রে ব্যাপারিদের হাত ধরে কেজিপ্রতি গড়ে প্রায় ৭৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়।

সংলাপে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফারুক আল কবীর গবেষণার বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন। পরে অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম গুনতে হয়।

গবেষণার পর্যবেক্ষণের জবাবে প্রধান অতিথির বক্তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উত্পাদন পরিকল্পনায় এখনো তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো বছর কোনো পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়, আবার কোনো বছর অতিরিক্ত উত্পাদন হয়। এতে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়।

তিনি আরো বলেন, দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ লজিস্টিক ব্যয়। বিশ্বে যেখানে গড়ে জিডিপির ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয়, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। এই ব্যয় কমানো গেলে খাদ্যপণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এছাড়া উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারব্যবস্থার বিভিন্ন অসঙ্গতি রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ও কমাতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজি একটি বাস্তব সমস্যা। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।

সংলাপে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।

Share this news as a Photo Card