নিউইয়র্ক ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীনকে সামলাতে ভারতের মেগা প্রকল্প, ওয়াটার বোম্ব ও অরুণাচলের সহিংসতা

  • আপডেটের সময় : ১২:৫০:৪০ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ৬ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কৌশলগত জবাব হিসেবে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট (এসইউএমপি) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রকল্প কেন্দ্র করে আদিবাসী আদি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি এবং জীবিকা হারানোর চরম আশঙ্কায় দেশটিতে ব্যাপক সহিংসতা দেখা দিয়েছে।

তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত সিয়াং নদী ভারত হয়ে আসামে প্রবেশ করে অন্যান্য নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। চীন ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তিব্বতের মেডোগ কাউন্টিতে প্রায় ১২ লাখ কোটি ইউয়ান ব্যয়ে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ শুরু করেছে, যা ভাটির দেশ ভারতের জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলনিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

ভারত চীনের ৯.২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার লাইভ স্টোরেজের বিপরীতে সিয়াংয়ে ৫.৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার জলাধার তৈরি করে এক ধরনের প্রাক-কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।

অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এই প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে জানান, জরিপ ও ফিজিবিলিটি টেস্টের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ব্যতীত এই প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে না। তিনি পরিস্থিতি স্পষ্ট করে বলেন, ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট ঘিরে ভুল তথ্য ও ভুল ধারণা আমাদের লোকজনের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে।’ এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পেমা খান্ডু ইংকিয়ং পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় বিক্ষোভকারীরা তার কনভয় আটকে দেয়।

স্থানীয় শীর্ষ সংগঠন আদি বানে কেবাং সম্পূর্ণ প্রকল্প বাতিল ও প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট (পিএফআর) প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছে। সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফারমার্স ফোরাম এবং অল আদি ইউথ অ্যাসোসিয়েশন ঐতিহ্যবাহী কেবাং ব্যবস্থার মাধ্যমে আলোচনা ও মামলার প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। সহিংসতার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিআরপিএফ-এর দুই কোম্পানি র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র‌্যাফ) অরুণাচলে পাঠিয়েছে।

আগরতলা-ভিত্তিক সাংবাদিক তোঙ্গাম রিনা পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, ‘সিয়াং নদীর ওপর যেকোনো প্রকল্পের বিরোধিতার ইতিহাস প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো। সাম্প্রতিক প্রকল্প বিশাল বিক্ষোভ তৈরি করেছে যা গত তিন বছরে আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূলত তরুণ জেন জি প্রজন্ম পুলিশি কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছে।’

প্রতিবাদকারীদের মতামত তুলে ধরে রিনা আরও যোগ করেন, ‘স্থানীয়রা মনে করেন তারা সরকারের চেয়ে নদীকে অনেক ভালো চেনেন’ এবং ‘আন্দোলনকারীদের দেশবিরোধী বলে চিহ্নিত করায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।’ এছাড়া তোঙ্গাম রিনা উল্লেখ করেন, ‘মাঠের প্রতিবাদকারীরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছেন এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন চীন যদি ওয়াটার বোম্ব ব্যবহার করে তবে এই বাঁধ তা থামাতে পারবে না।’

চলতি বছরের জুলাই মাসে চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি প্রকাশিত সমীক্ষায় মেডোগ এলাকায় সক্রিয় পাইঝেন ফল্টের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তীব্র ভূকম্পন ঝুঁকির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, যা কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানিও সম্প্রতি নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। 

২০২৫ সালের নভেম্বরে মানোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস তাদের গবেষণাপত্রে এই মেগা বাঁধকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী জল-কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

সৌদি আরবের দুই শহরে জরুরি সতর্কতা

ব্রাজিলে ফিলিস্তিনপন্থি লুলা জেতার পর ট্রাম্প বললেন, নির্বাচনে ‘কারচুপি’ হয়েছে

২৭ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

চীনকে সামলাতে ভারতের মেগা প্রকল্প, ওয়াটার বোম্ব ও অরুণাচলের সহিংসতা

আপডেটের সময় : ১২:৫০:৪০ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কৌশলগত জবাব হিসেবে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট (এসইউএমপি) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রকল্প কেন্দ্র করে আদিবাসী আদি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি এবং জীবিকা হারানোর চরম আশঙ্কায় দেশটিতে ব্যাপক সহিংসতা দেখা দিয়েছে।

তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত সিয়াং নদী ভারত হয়ে আসামে প্রবেশ করে অন্যান্য নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। চীন ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তিব্বতের মেডোগ কাউন্টিতে প্রায় ১২ লাখ কোটি ইউয়ান ব্যয়ে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ শুরু করেছে, যা ভাটির দেশ ভারতের জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলনিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

ভারত চীনের ৯.২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার লাইভ স্টোরেজের বিপরীতে সিয়াংয়ে ৫.৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার জলাধার তৈরি করে এক ধরনের প্রাক-কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।

অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এই প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে জানান, জরিপ ও ফিজিবিলিটি টেস্টের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ব্যতীত এই প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে না। তিনি পরিস্থিতি স্পষ্ট করে বলেন, ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট ঘিরে ভুল তথ্য ও ভুল ধারণা আমাদের লোকজনের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে।’ এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পেমা খান্ডু ইংকিয়ং পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় বিক্ষোভকারীরা তার কনভয় আটকে দেয়।

স্থানীয় শীর্ষ সংগঠন আদি বানে কেবাং সম্পূর্ণ প্রকল্প বাতিল ও প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট (পিএফআর) প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছে। সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফারমার্স ফোরাম এবং অল আদি ইউথ অ্যাসোসিয়েশন ঐতিহ্যবাহী কেবাং ব্যবস্থার মাধ্যমে আলোচনা ও মামলার প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। সহিংসতার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিআরপিএফ-এর দুই কোম্পানি র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র‌্যাফ) অরুণাচলে পাঠিয়েছে।

আগরতলা-ভিত্তিক সাংবাদিক তোঙ্গাম রিনা পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, ‘সিয়াং নদীর ওপর যেকোনো প্রকল্পের বিরোধিতার ইতিহাস প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো। সাম্প্রতিক প্রকল্প বিশাল বিক্ষোভ তৈরি করেছে যা গত তিন বছরে আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূলত তরুণ জেন জি প্রজন্ম পুলিশি কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছে।’

প্রতিবাদকারীদের মতামত তুলে ধরে রিনা আরও যোগ করেন, ‘স্থানীয়রা মনে করেন তারা সরকারের চেয়ে নদীকে অনেক ভালো চেনেন’ এবং ‘আন্দোলনকারীদের দেশবিরোধী বলে চিহ্নিত করায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।’ এছাড়া তোঙ্গাম রিনা উল্লেখ করেন, ‘মাঠের প্রতিবাদকারীরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছেন এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন চীন যদি ওয়াটার বোম্ব ব্যবহার করে তবে এই বাঁধ তা থামাতে পারবে না।’

চলতি বছরের জুলাই মাসে চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি প্রকাশিত সমীক্ষায় মেডোগ এলাকায় সক্রিয় পাইঝেন ফল্টের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তীব্র ভূকম্পন ঝুঁকির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, যা কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানিও সম্প্রতি নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। 

২০২৫ সালের নভেম্বরে মানোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস তাদের গবেষণাপত্রে এই মেগা বাঁধকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী জল-কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

Share this news as a Photo Card