নিউইয়র্ক ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থাকলে অপরাধের মোটিভ প্রমাণ আবশ্যক নয়

  • আপডেটের সময় : ০১:৫৩:৩৩ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
  • ৬ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ভুক্তভোগীর আপনজনের সাক্ষ্য শুধু আপনজন হওয়ার কারণে অবিশ্বাস করা যাবে না মর্মে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আদালত বলেছে, আপনজনের সাক্ষ্য সরাসরি ও বিশ্বাসযোগ্য হলে তা গ্রহণ করা যায়। কারণ আপনজন সাধারণত আসল অপরাধীকে ছেড়ে নির্দোষ কাউকে ফাঁসাতে চায় না। ‘মো. হুমায়ুন কবির বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ এ পর্যবেক্ষণ দেয়। আদালত সিদ্ধান্ত দেয়, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থাকলে অপরাধের মোটিভ প্রমাণ করা আবশ্যক নয়।

রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, একজন বিচারক শুধু এটা নিশ্চিত করার জন্য ফৌজদারি বিচার পরিচালনা করেন না যে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান। একই সঙ্গে তার দায়িত্ব হলো কোনো অপরাধীও যেন শাস্তি এড়িয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। নির্দোষকে রক্ষা করা এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা উভয়ই বিচারকের জনস্বার্থমূলক দায়িত্ব। তাই বিচারকার্যে কোনো পক্ষপাত বা অনুকম্পার স্থান নেই। আইনের কাছে একমাত্র বিবেচ্য হলো শুধুই সত্য।

২০০৯ সালের ৬ মার্চ। রাত ১১টায় কাউলা সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটে আসাদুজ্জামান সঞ্জু তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন। তর্কের একপর্যায়ে হুমায়ুন তাকে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় সঞ্জুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে ভিকটিম তার বাবা ও সহকর্মীদের কাছে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে ভিকটিম আসামি হুমায়ুনের নাম প্রকাশ করেন। পরদিন ভোরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মোহাম্মদ আলী বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।

২০১০ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ আসামি হুমায়ুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠায় বিচারিক আদালত। হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স খারিজ এবং আসামির আপিল আংশিক মঞ্জুর করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেন। জরিমানা করেন ২০ হাজার টাকা। এ রায় বাতিল চেয়ে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে আসামি।

গত বছর লিভ টু আপিলে কয়েকটি আইনগত প্রশ্নের ওপর শুনানি হয়। এগুলো হচ্ছে শোনা সাক্ষী এবং মৃত্যুকালীন জবানবন্দির নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু? ভিকটিমের নিকটাত্মীয় বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা প্রদান করা আইনগতভাবে সঠিক কিনা? দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার অধীনে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে আদালতের বিচারিক বিবেচনার মূলনীতিগুলো কী?

আসামি পক্ষের কৌঁসুলি দাবি করেন, প্রসিকিউশন এই মামলায় নিরপেক্ষ সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। উপস্থিত সব সাক্ষীই ভিকটিমের নিকটাত্মীয়। শোনা সাক্ষীর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই না করেই আদালত সাজা প্রদান করেছে, যা আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, ভিকটিম ঘটনার পর পরই আসামির নাম প্রকাশ করেন। প্রসিকিউশন সাক্ষীদের মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণে কোনো অসংগতি নেই।

উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করে পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো—অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে নির্দোষ হিসেবে গণ্য করতে হবে। আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রসিকিউশনের। শুধু সন্দেহ বা আংশিক প্রমাণ যথেষ্ট নয়। প্রসিকিউশনকে অভিযোগটি সম্পূর্ণ ও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে হবে।

রায়ে বলা হয়, ভিকটিম ঘটনার পর পরই তার বাবা ও সহকর্মীদের কাছে আসামির নাম প্রকাশ করেছিলেন। যা মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হিসেবে অত্যন্ত শক্তিশালী সাক্ষ্য। আসামিপক্ষ সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারেনি। মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন সাজা প্রদানের মাধ্যমে সঠিক ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত দেওয়ায় হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ করার মতো আইনগত কোনো ভুল নেই।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

রিয়াদ ও মদিনায় চার ড্রোন ভূপাতিত করেছে সৌদি

মার্কিন দূতাবাসের কিছু কর্মীকে পরিবারসহ সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ

২২ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থাকলে অপরাধের মোটিভ প্রমাণ আবশ্যক নয়

আপডেটের সময় : ০১:৫৩:৩৩ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ভুক্তভোগীর আপনজনের সাক্ষ্য শুধু আপনজন হওয়ার কারণে অবিশ্বাস করা যাবে না মর্মে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আদালত বলেছে, আপনজনের সাক্ষ্য সরাসরি ও বিশ্বাসযোগ্য হলে তা গ্রহণ করা যায়। কারণ আপনজন সাধারণত আসল অপরাধীকে ছেড়ে নির্দোষ কাউকে ফাঁসাতে চায় না। ‘মো. হুমায়ুন কবির বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ এ পর্যবেক্ষণ দেয়। আদালত সিদ্ধান্ত দেয়, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থাকলে অপরাধের মোটিভ প্রমাণ করা আবশ্যক নয়।

রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, একজন বিচারক শুধু এটা নিশ্চিত করার জন্য ফৌজদারি বিচার পরিচালনা করেন না যে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান। একই সঙ্গে তার দায়িত্ব হলো কোনো অপরাধীও যেন শাস্তি এড়িয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। নির্দোষকে রক্ষা করা এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা উভয়ই বিচারকের জনস্বার্থমূলক দায়িত্ব। তাই বিচারকার্যে কোনো পক্ষপাত বা অনুকম্পার স্থান নেই। আইনের কাছে একমাত্র বিবেচ্য হলো শুধুই সত্য।

২০০৯ সালের ৬ মার্চ। রাত ১১টায় কাউলা সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটে আসাদুজ্জামান সঞ্জু তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন। তর্কের একপর্যায়ে হুমায়ুন তাকে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় সঞ্জুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে ভিকটিম তার বাবা ও সহকর্মীদের কাছে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে ভিকটিম আসামি হুমায়ুনের নাম প্রকাশ করেন। পরদিন ভোরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মোহাম্মদ আলী বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।

২০১০ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ আসামি হুমায়ুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠায় বিচারিক আদালত। হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স খারিজ এবং আসামির আপিল আংশিক মঞ্জুর করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেন। জরিমানা করেন ২০ হাজার টাকা। এ রায় বাতিল চেয়ে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে আসামি।

গত বছর লিভ টু আপিলে কয়েকটি আইনগত প্রশ্নের ওপর শুনানি হয়। এগুলো হচ্ছে শোনা সাক্ষী এবং মৃত্যুকালীন জবানবন্দির নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু? ভিকটিমের নিকটাত্মীয় বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা প্রদান করা আইনগতভাবে সঠিক কিনা? দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার অধীনে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে আদালতের বিচারিক বিবেচনার মূলনীতিগুলো কী?

আসামি পক্ষের কৌঁসুলি দাবি করেন, প্রসিকিউশন এই মামলায় নিরপেক্ষ সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। উপস্থিত সব সাক্ষীই ভিকটিমের নিকটাত্মীয়। শোনা সাক্ষীর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই না করেই আদালত সাজা প্রদান করেছে, যা আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, ভিকটিম ঘটনার পর পরই আসামির নাম প্রকাশ করেন। প্রসিকিউশন সাক্ষীদের মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণে কোনো অসংগতি নেই।

উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করে পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো—অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে নির্দোষ হিসেবে গণ্য করতে হবে। আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রসিকিউশনের। শুধু সন্দেহ বা আংশিক প্রমাণ যথেষ্ট নয়। প্রসিকিউশনকে অভিযোগটি সম্পূর্ণ ও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে হবে।

রায়ে বলা হয়, ভিকটিম ঘটনার পর পরই তার বাবা ও সহকর্মীদের কাছে আসামির নাম প্রকাশ করেছিলেন। যা মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হিসেবে অত্যন্ত শক্তিশালী সাক্ষ্য। আসামিপক্ষ সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারেনি। মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন সাজা প্রদানের মাধ্যমে সঠিক ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত দেওয়ায় হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ করার মতো আইনগত কোনো ভুল নেই।

Share this news as a Photo Card