নিউইয়র্ক ০৫:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ব্রাজিলের বিদায় ক্ষমার অযোগ্য’

  • আপডেটের সময় : ০৫:০৪:২০ পূর্বাহ্ণ, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • ১৯ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিল মানেই একসময় ছিল ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল রং। হলুদ জার্সি মানেই ছিল আক্রমণের উৎসব, ড্রিবলের জাদু আর প্রতিপক্ষের জন্য এক অবিরাম আতঙ্ক। কিন্তু সময় বদলেছে। রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সেই সোনালি আকাশে এখন জমেছে হতাশার কালো মেঘ। সেই ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে টানা ব্যর্থতার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে সেলেসাওরা। 

এবার ২০২৬ বিশ্বকাপেও বিদায়ের মধ্য দিয়ে পেলের দেশ টানা ছয় বিশ্বকাপে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ ব্যর্থতার হেক্সা পূরণ করেছে ফুটবলপাগল দেশটি। মার্কিন মুল্লুকে শিরোপার স্বপ্ন তো দূরের কথা, মাঠে ব্রাজিলকে অনেক সময়ই মনে হয়েছে নিজেদের ছায়া।

টানা ব্যর্থতার পর স্বাভাবিকভাবেই ব্রাজিল জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। সাবেক ফুটবলার, বিশ্লেষক, সমর্থক সবাই খুঁজছেন ব্যর্থতার কারণ। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সবচেয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও। তার মতে, ব্রাজিলের ফুটবল দর্শনকে মাঠে ফিরিয়ে আনতে পারেননি আনচেলত্তি। বরং দলের খেলা ছিল প্রাণহীন, ধীরগতির এবং পরিচিত ব্রাজিলিয়ান সৃজনশীলতা থেকে অনেক দূরে। 

রোমারিওর অভিযোগ, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ব্রাজিলকে এমন নিষ্প্রভ দেখা অত্যন্ত হতাশাজনক। খেলোয়াড়দের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দলকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। ম্যাচের ভেতরে প্রয়োজনীয় কৌশলগত পরিবর্তন, আক্রমণে বৈচিত্র্য কিংবা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দ্রুত পরিকল্পনা বদলের ক্ষেত্রেও তিনি আনচেলত্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

নিজের ইউটিউব চ্যানেলে রোমারিও বলেছেন, এবারের ব্যর্থতার পর ব্রাজিলের কোচ পরিবর্তন করা উচিত। ক্ষোভের সুরে রোমারিও বলেন, ‘আমি সিবিএফের সভাপতি হলে চুক্তি বাতিল করতাম। চুক্তি বহাল থাকার কোনো সুযোগই নেই। এটা হতে পারে না, পরিবর্তন করতেই হবে। ম্যাচ শেষে আমি তার কঠোর সমালোচনা করতাম। সভাপতি হিসেবে আমি ড্রেসিংরুমে যেতাম এবং তাদের বলতাম, অসাধারণ, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ, বিদায়। এরপর ছাঁটাই করতাম। যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে তিনি আমাদের ফেলেছেন, যেভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, এরপর আর তার ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্রাজিলের এমন বিদায় ক্ষমার অযোগ্য।’ 

কোচের পাশাপাশি খেলোয়াড়দেরও সমালোচনা করেছে সাবেক এই সুপারস্টার। ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের সেরা তারকা মনে করেন, মূল পরিবর্তন আনতে হবে কোচিং স্টাফে। ৬০ বছর বয়সী রোমারিও মনে করেন না, এই কোচিং স্টাফদের দিয়ে বিশ্বকাপের নতুন চক্র শুরু করা উচিত। শিরোপা ছাড়া বিশ্বকাপের যে কোনো পর্যায় থেকে বিদায় ব্রাজিলের কাছে ব্যর্থতা। এবার সেলেসাওরা শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিলেও কোচের তেমন সমালোচনা হয়নি। রোমারিও মনে করেন, আনচেলত্তি ব্রাজিলিয়ান নন বলেই এবার সুর নরম। এবারের পারফরম্যান্সের পর যে কোনো স্থানীয় কোচ এরই মধ্যে ছাঁটাই হয়ে যেতেন।

১৯৯০ সালের পর প্রথম বার শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়া ব্রাজিলের শিরোপার জন্য অপেক্ষা বেড়েছে আরও। ২০০২ সালে নিজেদের পঞ্চম ও শেষ শিরোপা জিতেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। রোমারিও মনে করেন, ব্রাজিলের জার্সি শুধু একটি দলকে প্রতিনিধিত্ব করে না: এটি একটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, কোটি মানুষের আবেগ। সেই জার্সি পরে মাঠে নেমে যদি লড়াইয়ের আগুনই দেখা না যায়, তাহলে হতাশা আরও গভীর হয়।
রোমারিওর এই মন্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকেই তার সঙ্গে একমত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, দায় শুধু কোচের নয়: খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, দল নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিও সমানভাবে এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী।

বিশ্বকাপ শেষে ব্রাজিল ফুটবলে এখন শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনার নতুন অধ্যায়। প্রশ্ন উঠছে, সাম্বা ফুটবলের ঐতিহ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি এটি কেবল একটি কঠিন সময়, যেখান থেকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেবে পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। একসময় যে দল প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বিশ্বজয় করত, আজ সেই দলই উত্তর খুঁজছে নিজের আয়নায়। আর সেই আয়নায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রেখে দিয়েছেন রোমারিও। ব্রাজিল কি তার আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলছে; নাকি নেতৃত্বের ভুলেই থমকে গেছে সাম্বার সুর?

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

পরাশক্তিগুলো এখন নিজেদের সীমা বুঝতে শুরু করেছে: জাতিসংঘ মহাসচিব

ইরানকে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের আমন্ত্রণ

২৫ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

‘ব্রাজিলের বিদায় ক্ষমার অযোগ্য’

আপডেটের সময় : ০৫:০৪:২০ পূর্বাহ্ণ, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

ব্রাজিল মানেই একসময় ছিল ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল রং। হলুদ জার্সি মানেই ছিল আক্রমণের উৎসব, ড্রিবলের জাদু আর প্রতিপক্ষের জন্য এক অবিরাম আতঙ্ক। কিন্তু সময় বদলেছে। রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সেই সোনালি আকাশে এখন জমেছে হতাশার কালো মেঘ। সেই ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে টানা ব্যর্থতার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে সেলেসাওরা। 

এবার ২০২৬ বিশ্বকাপেও বিদায়ের মধ্য দিয়ে পেলের দেশ টানা ছয় বিশ্বকাপে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ ব্যর্থতার হেক্সা পূরণ করেছে ফুটবলপাগল দেশটি। মার্কিন মুল্লুকে শিরোপার স্বপ্ন তো দূরের কথা, মাঠে ব্রাজিলকে অনেক সময়ই মনে হয়েছে নিজেদের ছায়া।

টানা ব্যর্থতার পর স্বাভাবিকভাবেই ব্রাজিল জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। সাবেক ফুটবলার, বিশ্লেষক, সমর্থক সবাই খুঁজছেন ব্যর্থতার কারণ। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সবচেয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও। তার মতে, ব্রাজিলের ফুটবল দর্শনকে মাঠে ফিরিয়ে আনতে পারেননি আনচেলত্তি। বরং দলের খেলা ছিল প্রাণহীন, ধীরগতির এবং পরিচিত ব্রাজিলিয়ান সৃজনশীলতা থেকে অনেক দূরে। 

রোমারিওর অভিযোগ, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ব্রাজিলকে এমন নিষ্প্রভ দেখা অত্যন্ত হতাশাজনক। খেলোয়াড়দের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দলকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। ম্যাচের ভেতরে প্রয়োজনীয় কৌশলগত পরিবর্তন, আক্রমণে বৈচিত্র্য কিংবা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দ্রুত পরিকল্পনা বদলের ক্ষেত্রেও তিনি আনচেলত্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

নিজের ইউটিউব চ্যানেলে রোমারিও বলেছেন, এবারের ব্যর্থতার পর ব্রাজিলের কোচ পরিবর্তন করা উচিত। ক্ষোভের সুরে রোমারিও বলেন, ‘আমি সিবিএফের সভাপতি হলে চুক্তি বাতিল করতাম। চুক্তি বহাল থাকার কোনো সুযোগই নেই। এটা হতে পারে না, পরিবর্তন করতেই হবে। ম্যাচ শেষে আমি তার কঠোর সমালোচনা করতাম। সভাপতি হিসেবে আমি ড্রেসিংরুমে যেতাম এবং তাদের বলতাম, অসাধারণ, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ, বিদায়। এরপর ছাঁটাই করতাম। যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে তিনি আমাদের ফেলেছেন, যেভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, এরপর আর তার ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্রাজিলের এমন বিদায় ক্ষমার অযোগ্য।’ 

কোচের পাশাপাশি খেলোয়াড়দেরও সমালোচনা করেছে সাবেক এই সুপারস্টার। ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের সেরা তারকা মনে করেন, মূল পরিবর্তন আনতে হবে কোচিং স্টাফে। ৬০ বছর বয়সী রোমারিও মনে করেন না, এই কোচিং স্টাফদের দিয়ে বিশ্বকাপের নতুন চক্র শুরু করা উচিত। শিরোপা ছাড়া বিশ্বকাপের যে কোনো পর্যায় থেকে বিদায় ব্রাজিলের কাছে ব্যর্থতা। এবার সেলেসাওরা শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিলেও কোচের তেমন সমালোচনা হয়নি। রোমারিও মনে করেন, আনচেলত্তি ব্রাজিলিয়ান নন বলেই এবার সুর নরম। এবারের পারফরম্যান্সের পর যে কোনো স্থানীয় কোচ এরই মধ্যে ছাঁটাই হয়ে যেতেন।

১৯৯০ সালের পর প্রথম বার শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়া ব্রাজিলের শিরোপার জন্য অপেক্ষা বেড়েছে আরও। ২০০২ সালে নিজেদের পঞ্চম ও শেষ শিরোপা জিতেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। রোমারিও মনে করেন, ব্রাজিলের জার্সি শুধু একটি দলকে প্রতিনিধিত্ব করে না: এটি একটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, কোটি মানুষের আবেগ। সেই জার্সি পরে মাঠে নেমে যদি লড়াইয়ের আগুনই দেখা না যায়, তাহলে হতাশা আরও গভীর হয়।
রোমারিওর এই মন্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকেই তার সঙ্গে একমত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, দায় শুধু কোচের নয়: খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, দল নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিও সমানভাবে এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী।

বিশ্বকাপ শেষে ব্রাজিল ফুটবলে এখন শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনার নতুন অধ্যায়। প্রশ্ন উঠছে, সাম্বা ফুটবলের ঐতিহ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি এটি কেবল একটি কঠিন সময়, যেখান থেকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেবে পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। একসময় যে দল প্রতিপক্ষকে নাচিয়ে বিশ্বজয় করত, আজ সেই দলই উত্তর খুঁজছে নিজের আয়নায়। আর সেই আয়নায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রেখে দিয়েছেন রোমারিও। ব্রাজিল কি তার আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলছে; নাকি নেতৃত্বের ভুলেই থমকে গেছে সাম্বার সুর?

Share this news as a Photo Card