মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রায় ১০৮ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ। আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিতিশীলতা এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে সীমান্তে বাংলাদেশ সরকারের এটিই হবে প্রথম কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ প্রকল্প।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু হলে কয়েক লাখ মানুষ রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় শহর কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকেই এই সীমান্ত অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
গত মাসে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনার কথার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালান’ প্রতিরোধ করা।
রাখাইনে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি রাজ্যটির অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা আসে। এর ফলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্তের নির্বাচিত ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রায় ১০৮ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন কোন এলাকায় এই অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
বিজিবির ভাষ্য, অননুমোদিত সীমান্ত পারাপার, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানবপাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কার্যক্রম দমনে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিক্কেই এশিয়াকে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের বিপরীত পাশে আগের মতো কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো আর নেই। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ শহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে যোদ্ধা হিসেবে যোগ দিতে রাখাইন রাজ্যে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে পাচার হচ্ছে।’
তার মতে, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি টহল সড়ক তৈরি হলে নজরদারি আরও কার্যকর হবে এবং অবৈধ পারাপার অনেকটাই কমে আসবে।
তিনি আরও জানান, মিয়ানমার ২০০৯-১০ সালের দিকে নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্তে প্রায় ১২০ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করলেও প্রায় ৭০ কিলোমিটার নির্মাণের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চল মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের অন্যতম সক্রিয় রুট হিসেবে পরিচিত।
শহিদুল হকের মতে, বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্তে বেড়া নির্মাণ। এরপর নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবানের পার্বত্য সীমান্তেও একই ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, কারণ এসব এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচলের পথ হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী মংডু ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও সীমান্ত এলাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখন আর নেই। এই প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে জেলেদের অপহরণ, অস্ত্র ও মাদক পাচার, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং স্থলমাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকি বেড়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকা থেকে ৪২৬ জনের বেশি বাংলাদেশি জেলেকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৪ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও বাকিরা এখনো অপহরণকারীদের কবলে রয়েছেন।
সাব্বির আলম সুজন বলেন, এসব পরিস্থিতির কারণে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সীমান্তবর্তী জনগণের সুরক্ষা বজায় রাখা বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আরাকান আর্মির সদস্য বলে ধারণা করা সশস্ত্র ব্যক্তিরা সীমান্ত এলাকার জেলেসহ সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আরাকান আর্মি তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ জোগাতে জেলেদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং মাদক ও অস্ত্র পাচারের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত। রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এসব তৎপরতা আরও বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


























