নিউইয়র্ক ০৬:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে দরকষাকষির সক্ষমতা হারাচ্ছে ইরান?

  • আপডেটের সময় : ০৯:৫৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ০ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

সামরিক শক্তিতে না পেরে এবার নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপে ইরানকে কোণঠাসা করার পথ ধরেছে যুক্তরাষ্ট্র । বিশ্ব জ্বালানি বাজার কাঁপানো যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর তেহরানের বিরুদ্ধে এই কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান জোরদার করেছে ওয়াশিংটন।

দীর্ঘদিন ধরে নানা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে টিকে থাকলেও, বর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ইতিহাসের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে তেহরান। মার্কিন নৌ অবরোধ ও নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে কমে গেছে । এতে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে চরম টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতেই ওয়াশিংটন এই কৌশল নিয়েছে ।

মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, নজিরবিহীন এই অর্থনৈতিক চাপ ইরানের ওপর যতটুকু প্রভাব ফেলেছে তার বিপরীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেহরান ততটা চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না। তেল রপ্তানি থমকে যাওয়ায় তেহরান সরকারের রাজস্ব আয় তলানিতে ঠেকেছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়ার আশা তেহরান করেছিল, তা পুরোপুরি সফল হয়নি । কারণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার
পরিপর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে আর বিকল্প উৎসগুলো তাদের সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।

ইরান বিষয়ক মার্কিন বিশ্লেষক আরাশ আজিজি বলেন, ‘ক্ষমতার ভারসাম্য কিছুটা হলেও ইরানের বিপক্ষে চলে গেছে। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারায় এই রুটে ইরানের দরকষাকষির ক্ষমতা কমছে । মার্কিন নৌ অবরোধ প্রকৃতপক্ষে ইরানকে চরম আঘাত হানছে । তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়ে ওয়াশিংটনকে দরকষাকষির টেবিলে ফেরাতে চেয়েছিল তেহরান, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই কৌশলকে নৌ অবরোধ ও ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার সমন্বয়ে ‘জোড়া আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন । মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে তিনি বলেন, ‘এই কৌশল কাজ করবে আর আমরা এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাব।’ তবে অর্থনৈতিক চাপে নতিস্বীকারের স্পষ্ট কোনো আলামত এখনো দেখায়নি ইরান। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশের ব্যাংকে আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোর স্বীকৃতির মতো মৌলিক দাবিগুলো এখনো ধরে রেখেছে তেহরান।

ওয়াশিংটন আশা করছে, এই চাপ ইরানের ভেতরে গণঅসন্তোষ বাড়াবে। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে তেহরান সব সময়ই কঠোর। ইরানি নেতারাও আশঙ্কা করছেন, দ্রুত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশ জুড়ে ফের বড় ধরনের গণঅসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে । এমনকি গম ও জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের চরম ঘাটতি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রস সতর্ক করে বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী ও কট্টরপন্থিরা মনে করতে পারে তারা এই সংকট সহ্য করে টিকে থাকতে পারবে এবং নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের’ জ্যেষ্ঠ গবেষক বুরচু ওজচেলিক বলেন, ‘অর্থনৈতিক সংকট ঝুঁকি বাড়ালেও, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে ইরানি জনগণের মধ্যে আপাতত একধরনের জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও ধৈর্য কাজ করছে।’ এদিকে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থা নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন একটি সমঝোতা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে । ডেনিস রস মনে করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ফি বা টোল আদায়ের ইস্যুতে সমঝোতা হলে সংকট নিরসনের পথ বের হতে পারে। ইরান বাধ্যতামূলক ‘টোল’ না নিয়ে যদি নিরাপত্তা বা পরিবেশগত সেবার জন্য যৌক্তিক ফি গ্রহণের রূ পরেখা মেনে নেয়, তবে উভয় পক্ষই জয় দাবি করতে পারবে ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোভাব ইঙ্গিত করে ডেনিস রস বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি আবার বাণিজ্যিকভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হলে, ট্রাম্প নিশ্চয়ই চুক্তিতে সই করবেন।’

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

গাড়ি নয়, ইসরায়েলের সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করবে ভক্সওয়াগন

ইয়েমেনের কারাগারে সৌদি বিমান হামলার অভিযোগ, শিশুসহ ৭ নিহতের দাবি

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে দরকষাকষির সক্ষমতা হারাচ্ছে ইরান?

আপডেটের সময় : ০৯:৫৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সামরিক শক্তিতে না পেরে এবার নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপে ইরানকে কোণঠাসা করার পথ ধরেছে যুক্তরাষ্ট্র । বিশ্ব জ্বালানি বাজার কাঁপানো যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর তেহরানের বিরুদ্ধে এই কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান জোরদার করেছে ওয়াশিংটন।

দীর্ঘদিন ধরে নানা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে টিকে থাকলেও, বর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ইতিহাসের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে তেহরান। মার্কিন নৌ অবরোধ ও নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে কমে গেছে । এতে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে চরম টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতেই ওয়াশিংটন এই কৌশল নিয়েছে ।

মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, নজিরবিহীন এই অর্থনৈতিক চাপ ইরানের ওপর যতটুকু প্রভাব ফেলেছে তার বিপরীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেহরান ততটা চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না। তেল রপ্তানি থমকে যাওয়ায় তেহরান সরকারের রাজস্ব আয় তলানিতে ঠেকেছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়ার আশা তেহরান করেছিল, তা পুরোপুরি সফল হয়নি । কারণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার
পরিপর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে আর বিকল্প উৎসগুলো তাদের সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।

ইরান বিষয়ক মার্কিন বিশ্লেষক আরাশ আজিজি বলেন, ‘ক্ষমতার ভারসাম্য কিছুটা হলেও ইরানের বিপক্ষে চলে গেছে। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারায় এই রুটে ইরানের দরকষাকষির ক্ষমতা কমছে । মার্কিন নৌ অবরোধ প্রকৃতপক্ষে ইরানকে চরম আঘাত হানছে । তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়ে ওয়াশিংটনকে দরকষাকষির টেবিলে ফেরাতে চেয়েছিল তেহরান, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই কৌশলকে নৌ অবরোধ ও ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার সমন্বয়ে ‘জোড়া আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন । মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে তিনি বলেন, ‘এই কৌশল কাজ করবে আর আমরা এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাব।’ তবে অর্থনৈতিক চাপে নতিস্বীকারের স্পষ্ট কোনো আলামত এখনো দেখায়নি ইরান। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশের ব্যাংকে আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোর স্বীকৃতির মতো মৌলিক দাবিগুলো এখনো ধরে রেখেছে তেহরান।

ওয়াশিংটন আশা করছে, এই চাপ ইরানের ভেতরে গণঅসন্তোষ বাড়াবে। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে তেহরান সব সময়ই কঠোর। ইরানি নেতারাও আশঙ্কা করছেন, দ্রুত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশ জুড়ে ফের বড় ধরনের গণঅসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে । এমনকি গম ও জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের চরম ঘাটতি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রস সতর্ক করে বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী ও কট্টরপন্থিরা মনে করতে পারে তারা এই সংকট সহ্য করে টিকে থাকতে পারবে এবং নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের’ জ্যেষ্ঠ গবেষক বুরচু ওজচেলিক বলেন, ‘অর্থনৈতিক সংকট ঝুঁকি বাড়ালেও, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে ইরানি জনগণের মধ্যে আপাতত একধরনের জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও ধৈর্য কাজ করছে।’ এদিকে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থা নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন একটি সমঝোতা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে । ডেনিস রস মনে করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ফি বা টোল আদায়ের ইস্যুতে সমঝোতা হলে সংকট নিরসনের পথ বের হতে পারে। ইরান বাধ্যতামূলক ‘টোল’ না নিয়ে যদি নিরাপত্তা বা পরিবেশগত সেবার জন্য যৌক্তিক ফি গ্রহণের রূ পরেখা মেনে নেয়, তবে উভয় পক্ষই জয় দাবি করতে পারবে ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোভাব ইঙ্গিত করে ডেনিস রস বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি আবার বাণিজ্যিকভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হলে, ট্রাম্প নিশ্চয়ই চুক্তিতে সই করবেন।’

Share this news as a Photo Card