নিউইয়র্ক ১০:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুথিদের দাপটে কোণঠাসা সৌদি, মার্কিন অস্ত্রেও মিলছে না সুরক্ষা

  • আপডেটের সময় : ১২:৩৮:৫০ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ২ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জামও কিনেছে দেশটি। তবু ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে।

স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। সামরিক খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের অবস্থান প্রথম দশে। দেশটির হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উন্নত অস্ত্র। কিন্তু এত বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং একাধিক দিক থেকে আসা হামলার হুমকি।

তিন দিক থেকে হামলার ঝুঁকি
সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে ইরান, দক্ষিণ দিক থেকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং উত্তর দিক থেকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল। অন্যদিকে, ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম ভেল পাইপলাইনে হামলার জন্য ড্রোন পাঠিয়েছে। দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়ে কিংবা ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শুধু রাজধানী রিয়াদ বা একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করলেই চলে না। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইনসহ বিশাল এলাকার অসংখ্য লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষিত রাখতে হয়। আকাশপথে আসা হামলা শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হবে তা নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার জন্য হাতে থাকে খুব অল্প সময়। সৌদি আরবের একটি সূত্র জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। তবে কিছু হামলা প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোথায় কীভাবে মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষকে।

কৌশল বদলেছে হুথিরা
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হুথিরা এখন একসঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর এই কৌশল অনেকটা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হামলার ধরনের সঙ্গে মিলে যায়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়ে যায়। ফলে রাডারে এগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। এছাড়া হুথিরা নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে, যেগুলো উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের হাটেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানের তৈরি অস্ত্রের বেশ মিল রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতির এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।

গত বছর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে একটি হুথি ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হেনেছিল। বিশ্লেষক আমির বার শালোম সে সময় বলেছিলেন, প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের এমন নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, হুথিরা ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষার কিছু অস্ত্রও পরিবর্তন করে ব্যবহার করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তেহরানের কথায় চলবে হুথিরা?
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নেতৃত্বাধীন কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে পরিচিত হুথিরা। তবে হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরাকের কয়েকটি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সংঘাতে দুর্বল হয়ে পড়লেও হুথিরা নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করেছে। তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষকৃত্যে যোগ দিতেও হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছিল। তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতে ইয়েমেনের হুথিনিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও পরিবহন অবরোধের প্রভাবও অব্যাহত রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। এর কিছুদিন পরই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। প্রথম দিকে লোহিত সাগরের উপকূলে সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগার এবং কয়েকটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সৌদি আরবের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক শ কোটি ডলারও দাবি করছে তারা।

যুদ্ধ নাকি সমঝোতা, কঠিন সিদ্ধান্তে রিয়াদ হুথিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়লেও সৌদি আরব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। গত সপ্তাহে দেশটির নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পরই রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। রিয়াদের কয়েক জন বাসিন্দা জানিয়েছেন, পরে আবার সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার ফোনে সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে পাওয়া যাচ্ছিল। একই দিন সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনটি ব্যালিস্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব
হুথিদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে। মিশরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতে সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের অস্ত্রভান্ডারেও ঘাটতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে এবং নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি, যদিও সেই সম্ভাবনা নাকচও করেননি। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল কাটনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহা থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, সবচেয়ে কঠিন সময়ে দেশটি তার মিত্রকে পরিত্যাগ করেছে।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের বিমানকর্মীদের নিয়ে ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞা মানবে এয়ার ফ্রান্স

১৫ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

হুথিদের দাপটে কোণঠাসা সৌদি, মার্কিন অস্ত্রেও মিলছে না সুরক্ষা

আপডেটের সময় : ১২:৩৮:৫০ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জামও কিনেছে দেশটি। তবু ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে।

স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। সামরিক খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের অবস্থান প্রথম দশে। দেশটির হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উন্নত অস্ত্র। কিন্তু এত বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং একাধিক দিক থেকে আসা হামলার হুমকি।

তিন দিক থেকে হামলার ঝুঁকি
সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে ইরান, দক্ষিণ দিক থেকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং উত্তর দিক থেকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল। অন্যদিকে, ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম ভেল পাইপলাইনে হামলার জন্য ড্রোন পাঠিয়েছে। দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়ে কিংবা ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শুধু রাজধানী রিয়াদ বা একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করলেই চলে না। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইনসহ বিশাল এলাকার অসংখ্য লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষিত রাখতে হয়। আকাশপথে আসা হামলা শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হবে তা নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার জন্য হাতে থাকে খুব অল্প সময়। সৌদি আরবের একটি সূত্র জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। তবে কিছু হামলা প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোথায় কীভাবে মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষকে।

কৌশল বদলেছে হুথিরা
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হুথিরা এখন একসঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর এই কৌশল অনেকটা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হামলার ধরনের সঙ্গে মিলে যায়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়ে যায়। ফলে রাডারে এগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। এছাড়া হুথিরা নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে, যেগুলো উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের হাটেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানের তৈরি অস্ত্রের বেশ মিল রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতির এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।

গত বছর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে একটি হুথি ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হেনেছিল। বিশ্লেষক আমির বার শালোম সে সময় বলেছিলেন, প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের এমন নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, হুথিরা ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষার কিছু অস্ত্রও পরিবর্তন করে ব্যবহার করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তেহরানের কথায় চলবে হুথিরা?
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নেতৃত্বাধীন কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে পরিচিত হুথিরা। তবে হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরাকের কয়েকটি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সংঘাতে দুর্বল হয়ে পড়লেও হুথিরা নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করেছে। তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষকৃত্যে যোগ দিতেও হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছিল। তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতে ইয়েমেনের হুথিনিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও পরিবহন অবরোধের প্রভাবও অব্যাহত রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। এর কিছুদিন পরই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। প্রথম দিকে লোহিত সাগরের উপকূলে সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগার এবং কয়েকটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সৌদি আরবের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক শ কোটি ডলারও দাবি করছে তারা।

যুদ্ধ নাকি সমঝোতা, কঠিন সিদ্ধান্তে রিয়াদ হুথিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়লেও সৌদি আরব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। গত সপ্তাহে দেশটির নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পরই রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। রিয়াদের কয়েক জন বাসিন্দা জানিয়েছেন, পরে আবার সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার ফোনে সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে পাওয়া যাচ্ছিল। একই দিন সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনটি ব্যালিস্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব
হুথিদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে। মিশরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতে সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের অস্ত্রভান্ডারেও ঘাটতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে এবং নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি, যদিও সেই সম্ভাবনা নাকচও করেননি। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল কাটনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহা থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, সবচেয়ে কঠিন সময়ে দেশটি তার মিত্রকে পরিত্যাগ করেছে।

Share this news as a Photo Card