নিউইয়র্ক ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডাক্তার বলেছে আর মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচব: তানিয়া বৃষ্টি

  • আপডেটের সময় : ১১:৫৯:৪২ পূর্বাহ্ণ, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
  • ৪ সময়-দৃশ্য

ছবি: সংগৃহীত

মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্তকরণ, অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও লাইফ সাপোর্টের চরম সংকট—বিগত দশ মাসে এক ভয়াবহ ও দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন ছোট পর্দার পরিচিত অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি। ভারতের চেন্নাইয়ের চিকিৎসকেরা একপর্যায়ে জানিয়েছিলেন তাঁর আয়ুষ্কাল হয়তো আর মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর।

তবে মৃত্যুর সেই পূর্বাভাস ও কঠিন চিকিৎসা প্রক্রিয়া পেছনে ফেলে ক্রমশ সুস্থতার পথে এগিয়ে চলেছেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় দশ মাসের বিরতি ভেঙে সম্প্রতি আবারও শুটিং সেটে ফিরেছেন এই অভিনেত্রী। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে কাজ শুরু করতে পেরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, এটি তাঁর জন্য এক প্রকার দ্বিতীয় জন্ম।

সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শারীরিক অসুস্থতা, দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া এবং শুটিংয়ে ফেরার অনুভূতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তানিয়া বৃষ্টি। তিনি জানান, সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় বর্তমান শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল। প্রায় দশ মাস পর স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া, হালকা ব্যায়াম ও হাসাহাসির মতো দৈনন্দিন স্বাভাবিকতায় ফিরেছেন। অস্ত্রোপচারের পর মাথার ডান দিকের জটিলতার কারণে বাঁ দিকে পাশ ফিরে শুতে পারতেন না; সঙ্গে ছিল তীব্র শারীরিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও নিয়মিত বমির কষ্ট। তবে রেডিওথেরাপির কঠিন ধাপ অতিক্রম করার পর জীবন এখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে।

দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি ইকসান রনির পরিচালনায় ‘অংশীদার’ নাটকের মাধ্যমে নতুন করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনের বাস্তব প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত এই নাটকে ‘সুমি’ চরিত্রে রূপদান করছেন তিনি, যেখানে বাবার মৃত্যুর পর চাচার সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে তাঁর অভিনীত চরিত্রটি। অভিনেত্রীর মতে, দীর্ঘ দশ মাস কাজের বাইরে থাকায় শুটিং পরিবেশকে তিনি প্রচণ্ড অনুভব করতেন। সহকর্মীরা তাঁর কাছে পরিবারের মতো হওয়ায় শুটিং ফ্লোর মানসিক শান্তির এক বড় আশ্রয়। প্রথম দিনের কাজে পরিচালক, ক্যামেরাম্যান ও প্রযোজনা দলের প্রত্যেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও যত্নবান ছিলেন।

তবে এখনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত না হওয়ায় চিকিৎসকের কড়া পরামর্শ কিছুটা এড়িয়েই অনুরোধ করে শুটিংয়ে ফিরতে হয়েছে তাঁকে। কেমোথেরাপির চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে শুটিংয়ে শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে ভেবে চিকিৎসকেরা শুরুতে অনুমতি দিতে চাননি। কিন্তু ঘরে বসে থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় অনেক অনুনয়-বিনয় করে একটি নাটকের কাজ করার অনুমতি নেন তিনি। এখনও তাঁর দুই মাসের কেমোথেরাপি বাকি রয়েছে। এই কোর্স শেষ হওয়ার পর এমআরআই (MRI) ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে টিউমারের সর্বশেষ পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করবেন চিকিৎসকরা।

অসুস্থতার সূত্রপাত ঘটেছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। সে সময় একটি নাটকের দৃশ্যধারণের সময় তাঁর তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়। টানা চার দিন ব্যথা নিয়েই কাজ চালিয়ে যান তিনি। তবে পঞ্চম দিনে তীব্র বমি শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন পরীক্ষার রিপোর্টে ধরা পড়ে মস্তিষ্কের টিউমার। শুরুতে সাধারণ অস্ত্রোপচারেই সুস্থ হয়ে ওঠার আশা থাকলেও চেন্নাইয়ের এমজিএম হাসপাতালের একজন অনকোলজিস্ট যখন জানান তিনি আর সর্বোচ্চ সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচতে পারেন, তখন মানসিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কা খান তিনি।

প্রথমবার ঢাকায় অস্ত্রোপচারে যাওয়ার আগে তিনি মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন; পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের কাছ থেকেও বিদায়ের ভঙ্গিতে কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন রূপ নেয় এবং তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়। জ্ঞান ফেরার পর আইসিইউর চারপাশের পরিবেশ দেখে শিউরে উঠলেও মনে ভরসা জুগিয়েছিল মা ও বোনের উপস্থিতি। বাবা না থাকায় অসুস্থতার পুরোটা সময় রাত জেগে মায়ের সেবা এবং পরিবারের প্রার্থনাই তাঁর বেঁচে থাকার অন্যতম প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া সহকর্মী মোশাররফ করিম, নিলয় ও প্রযোজক আলী বশীরসহ নাট্যাঙ্গনের অনেকেই নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন।

অসুস্থতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপমৃত্যুর গুজবকে পেছনে ফেলে এখন ইতিবাচকভাবেই জীবনকে দেখছেন তানিয়া বৃষ্টি। ২০১২ সালে কেবল ভালোবাসার জায়গা থেকেই অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি; এবারও সেই একই উদ্দীপনা নিয়ে ক্যারিয়ারকে নতুন করে সাজাতে চান।

ক্যানসার ও জটিল রোগের সঙ্গে লড়াইরত রোগীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে তিনি জানান, রোগের নাম শুনে মনোবল হারানো চলবে না। দৃঢ় মানসিক শক্তি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসকের কঠোর নির্দেশনা মানা এবং পরিবারের সঙ্গে ইতিবাচক সময় কাটানো এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

দিল্লির ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাসা থেকে কাজের নির্দেশ

এপিস্টাইনকাণ্ডে আইনি লড়াইয়ে বড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

০১ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.usbdjournal24.com

ডাক্তার বলেছে আর মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচব: তানিয়া বৃষ্টি

আপডেটের সময় : ১১:৫৯:৪২ পূর্বাহ্ণ, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্তকরণ, অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও লাইফ সাপোর্টের চরম সংকট—বিগত দশ মাসে এক ভয়াবহ ও দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন ছোট পর্দার পরিচিত অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি। ভারতের চেন্নাইয়ের চিকিৎসকেরা একপর্যায়ে জানিয়েছিলেন তাঁর আয়ুষ্কাল হয়তো আর মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর।

তবে মৃত্যুর সেই পূর্বাভাস ও কঠিন চিকিৎসা প্রক্রিয়া পেছনে ফেলে ক্রমশ সুস্থতার পথে এগিয়ে চলেছেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় দশ মাসের বিরতি ভেঙে সম্প্রতি আবারও শুটিং সেটে ফিরেছেন এই অভিনেত্রী। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে কাজ শুরু করতে পেরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, এটি তাঁর জন্য এক প্রকার দ্বিতীয় জন্ম।

সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শারীরিক অসুস্থতা, দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া এবং শুটিংয়ে ফেরার অনুভূতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তানিয়া বৃষ্টি। তিনি জানান, সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় বর্তমান শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল। প্রায় দশ মাস পর স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া, হালকা ব্যায়াম ও হাসাহাসির মতো দৈনন্দিন স্বাভাবিকতায় ফিরেছেন। অস্ত্রোপচারের পর মাথার ডান দিকের জটিলতার কারণে বাঁ দিকে পাশ ফিরে শুতে পারতেন না; সঙ্গে ছিল তীব্র শারীরিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও নিয়মিত বমির কষ্ট। তবে রেডিওথেরাপির কঠিন ধাপ অতিক্রম করার পর জীবন এখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে।

দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি ইকসান রনির পরিচালনায় ‘অংশীদার’ নাটকের মাধ্যমে নতুন করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনের বাস্তব প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত এই নাটকে ‘সুমি’ চরিত্রে রূপদান করছেন তিনি, যেখানে বাবার মৃত্যুর পর চাচার সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে তাঁর অভিনীত চরিত্রটি। অভিনেত্রীর মতে, দীর্ঘ দশ মাস কাজের বাইরে থাকায় শুটিং পরিবেশকে তিনি প্রচণ্ড অনুভব করতেন। সহকর্মীরা তাঁর কাছে পরিবারের মতো হওয়ায় শুটিং ফ্লোর মানসিক শান্তির এক বড় আশ্রয়। প্রথম দিনের কাজে পরিচালক, ক্যামেরাম্যান ও প্রযোজনা দলের প্রত্যেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও যত্নবান ছিলেন।

তবে এখনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত না হওয়ায় চিকিৎসকের কড়া পরামর্শ কিছুটা এড়িয়েই অনুরোধ করে শুটিংয়ে ফিরতে হয়েছে তাঁকে। কেমোথেরাপির চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে শুটিংয়ে শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে ভেবে চিকিৎসকেরা শুরুতে অনুমতি দিতে চাননি। কিন্তু ঘরে বসে থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় অনেক অনুনয়-বিনয় করে একটি নাটকের কাজ করার অনুমতি নেন তিনি। এখনও তাঁর দুই মাসের কেমোথেরাপি বাকি রয়েছে। এই কোর্স শেষ হওয়ার পর এমআরআই (MRI) ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে টিউমারের সর্বশেষ পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করবেন চিকিৎসকরা।

অসুস্থতার সূত্রপাত ঘটেছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। সে সময় একটি নাটকের দৃশ্যধারণের সময় তাঁর তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়। টানা চার দিন ব্যথা নিয়েই কাজ চালিয়ে যান তিনি। তবে পঞ্চম দিনে তীব্র বমি শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন পরীক্ষার রিপোর্টে ধরা পড়ে মস্তিষ্কের টিউমার। শুরুতে সাধারণ অস্ত্রোপচারেই সুস্থ হয়ে ওঠার আশা থাকলেও চেন্নাইয়ের এমজিএম হাসপাতালের একজন অনকোলজিস্ট যখন জানান তিনি আর সর্বোচ্চ সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচতে পারেন, তখন মানসিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কা খান তিনি।

প্রথমবার ঢাকায় অস্ত্রোপচারে যাওয়ার আগে তিনি মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন; পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের কাছ থেকেও বিদায়ের ভঙ্গিতে কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন রূপ নেয় এবং তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়। জ্ঞান ফেরার পর আইসিইউর চারপাশের পরিবেশ দেখে শিউরে উঠলেও মনে ভরসা জুগিয়েছিল মা ও বোনের উপস্থিতি। বাবা না থাকায় অসুস্থতার পুরোটা সময় রাত জেগে মায়ের সেবা এবং পরিবারের প্রার্থনাই তাঁর বেঁচে থাকার অন্যতম প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া সহকর্মী মোশাররফ করিম, নিলয় ও প্রযোজক আলী বশীরসহ নাট্যাঙ্গনের অনেকেই নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন।

অসুস্থতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপমৃত্যুর গুজবকে পেছনে ফেলে এখন ইতিবাচকভাবেই জীবনকে দেখছেন তানিয়া বৃষ্টি। ২০১২ সালে কেবল ভালোবাসার জায়গা থেকেই অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি; এবারও সেই একই উদ্দীপনা নিয়ে ক্যারিয়ারকে নতুন করে সাজাতে চান।

ক্যানসার ও জটিল রোগের সঙ্গে লড়াইরত রোগীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে তিনি জানান, রোগের নাম শুনে মনোবল হারানো চলবে না। দৃঢ় মানসিক শক্তি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসকের কঠোর নির্দেশনা মানা এবং পরিবারের সঙ্গে ইতিবাচক সময় কাটানো এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

Share this news as a Photo Card