রাজধানীর মুগদা থানার সাইফুল হত্যা মামলায় তথ্য গোপন করে নিম্ন আদালতের একই আদেশের বিপরীতে তিনবার আবেদন করে জামিন নেওয়ার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, একই আসামি-আবেদনকারীদের পক্ষে একই জামিন নামঞ্জুরের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এই আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন দায়ের করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ন্যায়বিচার মূল ভিত্তির পরিপন্থি।
বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ লিখিত আদেশে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) আদেশের অনুলিপি সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে।
আদেশে বলা হয়েছে, আমরা এ বিষয়ে আমাদের সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশ করছি যে, একই আসামি-আবেদনকারীদের পক্ষে একই জামিন নামঞ্জুরের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এই আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন দায়ের করা, বিশেষ করে যখন অন্য একটি ডিভিশন বেঞ্চ থেকে ইতোমধ্যে জামিনের আদেশ আদায় করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আচরণের যথার্থতা, সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অন্য আবেদনগুলোর বিচারাধীন থাকার বিষয়টি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ন্যায়বিচার মূল ভিত্তির পরিপন্থি।
আদালত বলেন, এই আদালতের দ্বারস্থ হওয়া প্রত্যেক বিচারপ্রার্থীর জন্য অত্যন্ত সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে আবেদন করা এবং প্রার্থিত প্রতিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদালতের কাছে প্রকাশ করা অপরিহার্য।
বিশেষ করে, অন্য বেঞ্চে একই বিষয়ে দায়ের করা আবেদনগুলোর অস্তিত্ব গোপন রেখে এই আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চে সমান্তরালভাবে একাধিক আবেদন দায়েরের বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ ধরনের আচরণের ফলে আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বিচারিক আদেশ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং, সংশ্লিষ্ট আসামি-আবেদনকারী, তাদের পক্ষে করা পৃথক আবেদনগুলোর হলফকারী এবং তাদের আইনজীবীদের আচরণ যথাযথ বিচারিক পর্যালোচনার দাবি রাখে।
এ কারণে আমরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি আমলে নিতে এবং কী পরিস্থিতিতে উল্লিখিত একাধিক আবেদন দায়ের করা হয়েছে ও জামিনের আদেশ আদায় করা হয়েছে, তা অনুসন্ধানের জন্য রুল জারি করতে আগ্রহী। একই জামিন নামঞ্জুরের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এই আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন দায়ের এবং অন্যান্য আবেদন বিচারাধীন থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে জামিনের আদেশ আদায়ের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, এই মর্মে রুল জারি করা হলো। আসামি মিল্লাত ওরফে মিল্লাত হোসেন, লিপি ওরফে লিপি আক্তার, শরীফ ওরফে মো. শরীফ, টনিক ওরফে আনোয়ার হোসেন টনিক, জনি ওরফে আরিফুর রহমান জনি, জামিন আবেদনগুলোর হলফকারী মোহাম্মদ সেলিম রেজা, মো. মোশাররফ হোসেন, রিপন আহমেদ, আসামিদের আইনজীবী আন্না খাতুন, মোহাম্মদ রহিম উদ্দিন ও এস. এম. আবদুল বাতেন শাকিলকে ১০ দিনের মধ্যে আদালতে রুলের জবাব দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আদালত আদেশে বলেছেন, রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন সংশ্লিষ্ট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে (সিএমএম) উল্লিখিত মামলায় জামিনের বিষয়ে নতুন কোনো আবেদন গ্রহণ না করার নির্দেশ দেওয়া হলো।
একইসঙ্গে তিন আইনজীবীকে তাদের নিজ নিজ ব্যাখ্যা বা জবাব ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হলো। পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৫ (পনেরো) দিনের জন্য তাদের এই আদালতে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করা থেকে বিরত রাখা হলো।
আদালত আরও বলেন, হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ কর্তৃক গত ১ নভেম্বর দেওয়া জামিনের আদেশটি এখনো ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সংশ্লিষ্ট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়নি। সে কারণে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উক্ত জামিনের আদেশটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সংশ্লিষ্ট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো থেকে এই আদালতের ক্রিমিনাল সেকশনের অফিসকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো।
এর আগে গত বুধবার রাজধানীর মুগদা থানার সাইফুল হত্যা মামলায় তথ্য গোপন করে নিম্ন আদালতের একই আদেশের বিপরীতে তিনবার আবেদন করে জামিন নেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় ১১ জনকে শোকজ করেন হাইকোর্ট। ১৫ দিনের মধ্যে তাদেরকে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এই ১১ জনের মধ্যে তিনজন আইনজীবী, ৫ জন আসামি ও তিনজন মামলার তদবিরকারক।


























